৩ দলের ইশতেহারে পরিবেশ
২৫ কোটি গাছ রোপণ, প্লাস্টিকের বোতলের বিনিময়ে গাছের চারা, সিসার ব্যবহার কমানোসহ আর যা আছে
গ্রামীণ পর্যায়ে জনগণকে সম্পৃক্ত করে আগামী ৫ বছরে ২৫ কোটি গাছের চারা রোপণ করতে চায় বিএনপি। কার্বন ট্রেডিং মার্কেটের এক বিলিয়ন ডলারের সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে সবুজ অর্থনীতির সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে চায় দলটি।
এদিকে পরিবেশ রক্ষায় তিন ‘শূন্য’ নীতির কথা বলেছে জামায়াতে ইসলামী—শূন্য বর্জ্য, পরিবেশের শূন্য অবক্ষয় ও শূন্য বন্যাঝুঁকি। অন্যদিকে নদীদূষণ বন্ধে কঠোর হওয়ার অঙ্গীকার করে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) বলেছে, তারা নদীতীরভিত্তিক ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা তৈরি করে নদীভিত্তিক অর্থনীতি চাঙা করতে চায়।
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে নির্বাচনী ইশতেহারে পরিবেশ ও প্রকৃতি রক্ষায় এই অঙ্গীকারগুলো করেছে নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী প্রধান তিনটি দল বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপি।
বিএনপির ইশতেহারের ২৫ নম্বর পৃষ্ঠায় ‘পরিবেশ সংরক্ষণ ও টেকসই উন্নয়ন’ শীর্ষক অধ্যায়কে চার ভাগে ভাগ করা হয়েছে। প্রথম ভাগে অঙ্গীকার আছে ৯টি। এর মধ্যে ২৫ কোটি গাছের চারা রোপণ, ১০ হাজার নার্সারি উদ্যোক্তা সৃষ্টি—এ দুটির মধ্য দিয়ে মোট ৬ লাখ কর্মসংস্থানের কথা বলা হয়েছে।
এসব গাছ রোপণের পর সংরক্ষণের অংশ হিসেবে ট্রি মনিটরিং অ্যাপ চালুর কথা আছে প্রথম ভাগে। এ ছাড়া দ্বীপ ও চরাঞ্চলে বিশেষায়িত ড্রোন ব্যবহার করে বৃক্ষরোপণে কর্মসূচি নেওয়া, শহরগুলোতে পার্ক, ফুটপাত ও খেলার মাঠের পাশে বৃক্ষরোপণের কথা বলছে দলটি।
শহরের ভবনে ছাদবাগানকে উৎসাহ দিতে কর-প্রণোদনা দেওয়া, ভবন নির্মাণ বিধিমালায় ‘সবুজ পরিমাপক মানদণ্ড’কে যুক্ত করে ভবনগুলোকে গ্রিন সার্টিফিকেশনের আওতায় আনতে চায় বিএনপি। বিদ্যুৎ উৎপাদনে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমিয়ে ২০৩০ সালের মধ্যে অন্তত ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদনের অঙ্গীকার এসেছে দলটির ইশতেহারে।
কৃষিতে পানিসাশ্রয়ী ও মিথেন গ্যাস নির্গমন কমানোর প্রযুক্তি অল্টারনেট ওয়েটিং অ্যান্ড ড্রায়িং পদ্ধতি চালু, কার্বন ট্রেডিং মার্কেটে বাংলাদেশের এক বিলিয়ন ডলারের সম্ভাবনা আছে বলে এক প্রাক্কলনে জানিয়েছিল বিশ্বব্যাংক। বিএনপি সে সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে কার্বন ট্রেডিং মার্কেট গড়তে চায়।
পরিবেশ সংরক্ষণের অধ্যায়ের দ্বিতীয় ভাগে আছে ‘বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও দূষণ নিয়ন্ত্রণ’। এখানে অঙ্গীকার আছে পাঁচটি। বিএনপি ক্ষমতায় গেলে প্রতি বিভাগে একটি করে ই-বর্জ্য পুনর্ব্যবহার প্ল্যান্ট চালু করে মূল্যবান ধাতু সংগ্রহ করতে চায়। এ খাতে দুই লাখ কর্মসংস্থান হবে বলে ধারণা দিয়েছে দলটি।
এরপর আছে ‘প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ’। এখানে অঙ্গীকার আছে ছয়টি। ইশতেহারের এ অংশে বন উজাড়, বন দখল, পাহাড় কাটা, বন্য প্রাণী হত্যা, ম্যানগ্রোভ বনের ক্ষতির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার অঙ্গীকার করা হয়েছে। বন এলাকায় শিল্পকারখানা স্থাপনকে নিরুৎসাহিত করা, বন্য প্রাণীর অভয়ারণ্য সংরক্ষণ করা, খাল ও নদীতীরে ‘গ্রিন ক্যানেল ব্যাংক মডেল’ প্রবর্তন করা হবে। এ মডেলের মাধ্যমে বৃক্ষরোপণ, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও ইকোট্যুরিজমের মাধ্যমে নতুন সবুজ অর্থনীতি চালু করার কথা বলা হয়েছে।
উত্তরাঞ্চল ও দক্ষিণাঞ্চলে বন্যা, মরুকরণ রোধ ও পানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তিস্তা ও পদ্মা ব্যারেজ নির্মাণের বিষয়টি এসেছে পরিবেশ সংরক্ষণ অধ্যায়ের শেষ অংশে। এ ব্যারাজ দুটি বাস্তবায়ন করে ৭৫ লাখ হেক্টর জমি চাষের আওতায় আনা ও ৫ কোটি মানুষকে বন্যার হাত থেকে রক্ষা করা যাবে বলে আশা ব্যক্ত করা হয়েছে।
দক্ষিণাঞ্চলের নদীগুলোতে পানিপ্রবাহ বাড়িয়ে লবণাক্ততা হ্রাস করা এবং পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়ে যৌথ নদী কমিশনকে শক্তিশালী করার কথা বলা হয়েছে ইশতেহারের এ অংশে। এ ছাড়া নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের কর্মসংস্থান অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নেওয়ার কথা বলা হয়েছে ইশতেহারে।
পরিবেশ ও প্রকৃতি সংরক্ষণে বৈচিত্র্যময় অঙ্গীকারের দেখা মিললেও ঢাকা শহরসহ সারা দেশের বায়ুদূষণ নিয়ে কোনো কিছুর উল্লেখ নেই বিএনপির ইশতেহারে। বায়ুদূষণ ঢাকা শহরে একটি স্বাস্থ্যজনিত ভয়াবহ সমস্যা। শুষ্ক মৌসুমে ঢাকা প্রায়ই বায়ুদূষণে বৈশ্বিক শহরগুলোর মধ্যে শীর্ষে থাকে।
প্লাস্টিকের বোতল দিলে গাছের চারা দেবে জামায়াত
পরিবেশ সংরক্ষণে জামায়াতে ইসলামী তিন শূন্য ভিশনের কথা বলছে। বৃক্ষরোপণের অঙ্গীকার আছে জামায়াতের ইশতেহারেও। কী পরিমাণ বৃক্ষরোপণ করবে, সে সংখ্যা উল্লেখ না করলেও তিন শূন্য বাস্তবায়নের মাধ্যমে সবুজ বাংলাদেশ গড়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে দলটি।
নাগরিকেরা প্লাস্টিকের বোতল দিলে বিনিময়ে গাছের চারা দেওয়ার অঙ্গীকার আছে ইশতেহারে। এর বাইরে পলিথিন ব্যাগের পরিবর্তে পরিবেশবান্ধব ব্যাগের উৎপাদন ও এর ব্যবহার বাড়াতে পদক্ষেপ নেওয়া, সব কারখানায় বর্জ্যশোধন যন্ত্র ইটিপি স্থাপন নিশ্চিত করা, বুড়িগঙ্গা, তুরাগ ও কর্ণফুলী নদীর দূষণ বন্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
বন্যার ঝুঁকি মোকাবিলায় বিতর্কিত ডাচ্-ডেলটা মডেল ফলো করতে চায় জামায়াত। এ মডেল ফলো করে বানানো কংক্রিটের বাঁধ দেশের নদ-নদীর পলিপ্রবাহ থেকে নদীতীরকে বঞ্চিত করা হয়েছে। একই সঙ্গে জামায়াতে ইসলামী বলছে, তারা দুর্যোগ মোকাবিলায় ভারতের তামিলনাড়ু রাজ্যের দুর্যোগ প্রস্তুতির মডেল অনুসরণ করবে।
ইশতেহারে পানি সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করার কথা বলছে জামায়াত। এ জন্য বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে চায় দলটি। জলবায়ুর বৈশ্বিক আলোচনায় দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশকে নেতৃত্বের আসনে নিয়ে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে জামায়াতে ইসলামী। জলবায়ু আলোচনায় প্যারিস চুক্তির সঙ্গে সাযুজ্য রেখে জলবায়ু সুবিচার নিশ্চিত করা, জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে উপযোগী ফসল নিশ্চিত করা এবং ক্ষতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে শিল্পোন্নত দেশ থেকে বরাদ্দপ্রাপ্তি বাড়ানোর পদক্ষেপ নেওয়ার কথা গুরুত্বের সঙ্গে এসেছে জামায়াতের ইশতেহারে।
এ ছাড়া তিস্তা প্রকল্প বাস্তবায়ন ও পদ্মা ব্যারেজ নির্মাণে সমীক্ষা চালানো, নদীর পানিপ্রবাহ ফিরিয়ে আনতে পরিবেশসম্মত ও টেকসই নদী ব্যবস্থাপনা, আন্তর্জাতিক নদীর পানির হিস্যা আদায়ে কূটনৈতিক, আইনগত ও আঞ্চলিক সহযোগিতাভিত্তিক প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণের কথাও আছে তাদের ইশতেহারে।
সিসার ব্যবহার কমানো, নদী-খাল রক্ষার অঙ্গীকার এনসিপির
শিল্পদূষণ বন্ধে প্রতিটি শিল্পকারখানায় বর্জ্য শোধনাগার বা ইটিপি (এফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট) স্থাপন নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে এনসিপি। এ জন্য শিল্পাঞ্চলভিত্তিক ক্লাস্টার ইটিপি স্থাপন করে প্রথম দুই থেকে তিন বছরের জন্য সরকার আংশিক ব্যয় বহন করবে। এর পর থেকে শিল্পমালিকেরা ব্যয়ভার বহন করবে। স্বচ্ছ পরিবেশ অডিট, ইটিপি অকার্যকর থাকলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা, প্রথম ছয় মাসের শোধিত পানির গুণগত মান বৈশ্বিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা এবং সর্বোপরি একটা এনভায়রনমেন্টাল কমপ্লায়েন্সের ইকোসিস্টেম গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে এনসিপি।
শিশুদের স্বাস্থ্য রক্ষায় খেলনায়, রঙে সিসার ব্যবহার বন্ধের কথা আছে এনসিপির ইশতেহারে। এ ছাড়া ভোক্তাসামগ্রীতেও সিসার ব্যবহার বন্ধ করা হবে বলে বলছে দলটি।
দখল হয়ে যাওয়া নদী ও খালের পুনরুদ্ধারে হাইড্রোগ্রাফিক ডেটা, স্যাটেলাইট ইমেজ ও কমিউনিটিভিত্তিক ম্যাপিং ব্যবহার করে খনন করবে এনসিপি, নদীর স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ ফিরিয়ে আনতে উপনদীর সঙ্গে নদীর সংযোগ স্থাপন, প্লাবনভূমি সংরক্ষণ ও বন্যা সমভূমিতে অপরিকল্পিত উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ করার প্রতিশ্রুতি এসেছে এনসিপির ইশতেহারে।
তিস্তা ব্যারাজ প্রকল্পকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে উল্লেখ করে ইশতেহার বলছে, এ প্রকল্পের পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন ও জলবায়ু সহনশীল উপযোগী করে তিস্তা ব্যারাজকে নির্মাণ করা হবে। তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যা পেতে আন্তর্জাতিক নদী কূটনীতির জন্য পদক্ষেপ নেওয়ার অঙ্গীকার আছে দলটির।
এ ছাড়া মাছের প্রজনন বাড়াতে প্রজনন ক্ষেত্রকে সংরক্ষণের আওতায় আনা ও নদীগুলোতে মাছের স্টক অ্যাসেসমেন্ট (কোনো কিছুর মজুত ও ঘাটতি বিশ্লেষণ) করা হবে বলে উল্লেখ আছে তাদের ইশতেহারে। জেলেদের দক্ষতা উন্নয়ন, বাজার–সংযোগ সহজ করা, ইকোট্যুরিজম, ছোট পরিবহন সহজলভ্য করা ও নদীতীরভিত্তিক ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা তৈরির মধ্য দিয়ে নদীভিত্তিক অর্থনীতিকে বহুমাত্রিক রূপ দেওয়ার অঙ্গীকার করেছে এনসিপি।
এ ছাড়া আর্সেনিকের সমস্যার সমাধান করা, বায়ুদূষণের উৎস ইটভাটা, পুরোনো যানবাহন তুলে নেওয়া এবং আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদন করার কথা বলছে দলটি।
জামায়াত ও এনসিপি জোট যদি ক্ষমতায় যায়, তাহলে এনসিপি তার ইশতেহারে থাকা অঙ্গীকার কীভাবে বাস্তবায়ন করবে—জানতে চাইলে এনসিপির কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সম্পাদক মনিরা শারমিন প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা বিশ্বাস করি, সরকার গঠন করলে পরিবেশ নিয়ে আমাদের যে অঙ্গীকার, সেটা আমরা পুশ করতে পারব।’
মনিরা শারমিন বলেন, সুনীল অর্থনীতি নিয়ে অনেক সম্ভাবনা আছে, তাতে তাঁরা গুরুত্ব দিচ্ছেন। এ ছাড়া জলবায়ু ক্ষতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে ক্ষতিপূরণ আদায়ে শক্তিশালী দর–কষাকষি করতে পারার মতো ‘ক্লাইমেট লিডারশিপ’ তৈরি করবেন তাঁরা।
‘আমরা যদি বিরোধী দলেও থাকি, তাহলে এসব বিষয়ে সরকার যেন পদক্ষেপ নেয়, সে জন্য চাপ তৈরি করার কাজও অব্যাহত রাখব,’ বলেন শারমিন।
পরিবেশ সংরক্ষণ নিয়ে কাজ করা সংগঠন ‘ধরিত্রী রক্ষায় আমরা’র (ধরা) সদস্যসচিব শরীফ জামিল দলগুলোর নির্বাচনী ইশতেহার নিয়ে প্রথম আলোকে বলেন, ‘সবারটার মধ্যে কমবেশি ভালো জিনিস আছে। তিস্তা ও পদ্মা ব্যারেজের কথা বলছে সব দল। আমরা অবাধ প্রবাহের নদী চাই। আমরা সকল ব্যারেজের বিপক্ষে। এগুলো নদীকে নষ্ট করে দিচ্ছে।’
‘ডাচ্–ডেলটা আর বাংলাদেশ ডেলটা এক নয়। বাংলাদেশে অনেক পলি আসে। সেটা বিবেচনায় নিতে হবে,’ বলেন শরীফ জামিল।
শরীফ জামিল বলেন, ইশতেহারে পরিবেশ নিয়ে যেটুকু বলা হয়েছে, সেটা একটা গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আগের ইশতেহারের তুলনায়। আগের ইশতেহারে এত বিস্তারিত পরিবেশের বিষয়টি আসেনি। প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন হচ্ছে কি না, সেটার জন্য দলগুলো নিজেদের উদ্যোগে স্বাধীন একটা কমিটি গঠন করলে পরিবেশ নিয়ে তাদের আন্তরিকতা সম্পর্কে মানুষ সাধুবাদ জানাবে।