জকসু নির্বাচন তো হলো, কিন্তু নির্বাচিতরা বসবেন কোথায়
প্রতিষ্ঠার পর প্রথম ছাত্র সংসদ নির্বাচন হলো জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে, তাতে যে প্রতিনিধিরা নির্বাচিত হলেন, তাঁরা কোথায় বসে দায়িত্ব পালন করবেন, তা নিয়ে স্পষ্ট কোনো নির্দেশনা নেই প্রশাসনের। ফলে জকসুর কার্যকর সূচনা নিয়েই অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।
পুরান ঢাকায় ১৮৬৮ সালে প্রতিষ্ঠিত জগন্নাথ কলেজকে ২০০৫ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্নীত করে সরকার। কলেজ থাকাকালে ছাত্র সংসদ নির্বাচন হলেও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় হওয়ার পর ৬ জানুয়ারি প্রথম ছাত্র সংসদ নির্বাচন হয়। ফল প্রকাশের পর ১০ জানুয়ারি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদে (জকসু) নির্বাচিত প্রতিনিধিদের প্রজ্ঞাপন জারি করে প্রশাসন।
নির্বাচিত প্রতিনিধিরা যখন দায়িত্ব গ্রহণের প্রস্তুতি নিচ্ছেন, তখন প্রশ্ন আসছে, তাঁরা কোথায় বসবেন, কোথায় থেকে কার্যক্রম পরিচালনা করবেন? কারণ অন্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদের কোনো ভবন নেই।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, জকসু ভবন বা নির্দিষ্ট কোনো কার্যালয় এখনো প্রস্তুত নয়। অতীতে জকসুর কার্যক্রম পরিচালনার জন্য আলাদা ভবন বা নির্ধারিত কক্ষ থাকলেও দীর্ঘদিন নির্বাচন না থাকায় সেসব স্থাপনা অব্যবহৃত বা অন্য কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। ফলে নতুন করে জকসুর কার্যালয় নির্ধারণ প্রশাসনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, অবকাশ ভবনের দ্বিতীয় তলার যে কক্ষটি ছাত্র সংসদের জন্য বরাদ্দ ছিল, সেটি এখন অপরিচ্ছন্ন অবস্থায় পড়ে আছে। টেবিল–চেয়ার আছে ছড়িয়ে–ছিটিয়ে। কক্ষটির আকারও নির্বাচিত ২১ প্রতিনিধির একসঙ্গে বসার জন্য যথেষ্ট নয়।
ছাত্র সংসদের পুরোনো কক্ষ এখন বেহাল
কলেজ থাকাকালে সর্বশেষ ১৯৮৭ সালে জকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সে সময় ক্যাম্পাসের অবকাশ ভবনের ২০১ নম্বর কক্ষকে ছাত্র সংসদের অফিস হিসেবে ব্যবহার করা হতো। জকসু কার্যকর না থাকায় ওই কক্ষ ছাত্রলীগের (বর্তমানে নিষিদ্ধ সংগঠন) নেতারা তাঁদের কার্যালয় হিসেবে ব্যবহার করতেন।
সরেজমিনে দেখা যায়, অবকাশ ভবনের দ্বিতীয় তলার যে কক্ষটি ছাত্র সংসদের জন্য বরাদ্দ ছিল, সেটি এখন অপরিচ্ছন্ন অবস্থায় পড়ে আছে। টেবিল–চেয়ার আছে ছড়িয়ে–ছিটিয়ে। কক্ষটির আকারও নির্বাচিত ২১ প্রতিনিধির একসঙ্গে বসার জন্য যথেষ্ট নয়। ভিপি, জিএস, এজিএসদের জন্য নিজস্ব কক্ষ তৈরি করার মতো জায়গা সেখানে নেই। এ ছাড়া নিজস্ব ডেস্ক, কম্পিউটার ও গোলটেবিল বৈঠক করার মতোও ব্যবস্থা করা সম্ভব নয়।
প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি, এ বিষয়ে স্পষ্ট কোনো কিছু বলেনিজকসুর নবনির্বাচিত ভিপি রিয়াজুল ইসলাম
নির্বাচিত প্রতিনিধিরা বলছেন, দ্রুত একটি স্থায়ী কার্যালয় নির্ধারণ না হলে জকসুর কার্যক্রম কার্যত স্থবির হয়ে পড়বে। তাঁদের ভাষ্য, শিক্ষার্থীদের সমস্যা শোনা, প্রশাসনের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা ও বিভিন্ন দাপ্তরিক কাজের জন্য একটি কেন্দ্রীয় কার্যালয় অপরিহার্য। অস্থায়ী কোনো কক্ষে বসে এসব দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করা কঠিন হবে।
শিক্ষার্থী ও নির্বাচিত প্রতিনিধিরা যা বলছেন
জকসুর কার্যালয়–সংকটটি সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যেও আলোচনা তৈরি করেছে। অনেক শিক্ষার্থী আশা করছেন, দ্রুত জকসুর কার্যক্রম শুরু হবে এবং নির্বাচিত প্রতিনিধিরা তাঁদের দাবিদাওয়া তুলে ধরবেন। কিন্তু অফিস ও বসার জায়গা নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকলে সেই প্রত্যাশা পূরণে বিলম্ব হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তাঁরা।
ইতিহাস বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী সাইফুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, জকসুর জন্য স্থায়ী অবকাঠামো নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। জকসু শুধু একটি প্রতিনিধি পরিষদ নয়; এটি শিক্ষার্থীদের গণতান্ত্রিক চর্চার কেন্দ্র। সাধারণ শিক্ষার্থীরা যাতে তাঁদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে সমস্যাগুলো জানাতে পারেন, সে জন্য সুসংগঠিত অফিস, সভাকক্ষ ও প্রশাসনিক সহায়তা থাকা জরুরি।
সংগীত বিভাগের শিক্ষার্থী চয়ন শিকদার ফেসবুকে লিখেছেন, বৃত্তি ও জকসুর জন্য আন্দোলন করেছিলাম সবাই, জকসু তো হয়ে গেল। বৃত্তির কী খবর? ৭ তারিখের মধ্যে তালিকা প্রকাশ করার কথা ছিল? যাদেরকে শিক্ষার্থীরা প্রতিনিধি হিসেবে গ্রহণ করেছে, এবার আপনাদের পালা। অতিদ্রুত বৃত্তি বাস্তবায়ন করুন। দায়িত্ব নেওয়ার পর এটাই আপনাদের প্রথম কাজ হতে হবে।
কার্যালয় নিয়ে অনিশ্চয়তায় রয়েছেন জকসুর নবনির্বাচিত ভিপি রিয়াজুল ইসলামও। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি, এ বিষয়ে স্পষ্ট কোনো কিছু বলেনি।’
সুনির্দিষ্ট কক্ষ না থাকলে কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার শঙ্কার কথা জানিয়ে রিয়াজুল ইসলাম বলেন, ‘নির্বাচিত হওয়ায় শিক্ষার্থী ও সাংবাদিকেরা আসবেন, তাঁদের সঙ্গে বসে কোথায় কথা বলব, আমরা জানি না। শিক্ষার্থীদের বেশ কিছু দাবিদাওয়া এই মুহূর্তে ঝুলে আছে, এসব সমস্যার সমাধান না হলে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের দায়িত্ব নিয়ে কথা বলা শুরু হবে। আমরা যৌক্তিক সমাধান চাই, কাজ করার সুযোগ দেওয়া হোক।’
যেহেতু এটি প্রথম ছাত্র সংসদ নির্বাচন, তাই তাদের জন্য পূর্বনির্ধারিত বসার কোনো স্থান নেই। আমরা নতুন করে তাদের বসার ব্যবস্থা করব। বিশ্ববিদ্যালয় খুললে আমরা সবাই বসে তাদের জন্য অবকাশ ভবন কিংবা অন্য কোনো জায়গায় বসার ব্যবস্থা করা যায়, সেটা দেখব।উপাচার্য মো. রেজাউল করিম
প্রশাসন যা ভাবছে
নির্বাচন সম্পন্ন হলেও জকসুর কার্যকর যাত্রা এখন অনেকটা প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল। কোথায় বসবেন নির্বাচিত প্রতিনিধিরা, এই প্রশ্নের দ্রুত সমাধান না হলে জকসুর ভূমিকা শুরুতেই প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে বলে শঙ্কা ভোটে জয়ী প্রতিনিধিদের।
উপাচার্য মো. রেজাউল করিম প্রথম আলোকে বলেন, ‘যেহেতু এটি প্রথম ছাত্র সংসদ নির্বাচন, তাই তাদের জন্য পূর্বনির্ধারিত বসার কোনো স্থান নেই। আমরা নতুন করে তাদের বসার ব্যবস্থা করব। বিশ্ববিদ্যালয় খুললে আমরা সবাই বসে তাদের জন্য অবকাশ ভবন কিংবা অন্য কোনো জায়গায় বসার ব্যবস্থা করা যায়, সেটা দেখব।’
বিষয়টি নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, জকসু নির্বাচনের পরপরই অফিস স্পেস নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। ক্যাম্পাসে জায়গার সংকট রয়েছে। তবে শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিত্বশীল এই প্রতিষ্ঠানকে কার্যকর করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এখন অস্থায়ীভাবে কোনো ভবনে কক্ষ বরাদ্দ দেওয়া হতে পারে, পরে স্থায়ী সমাধানের দিকে যাওয়া হবে।