নির্বাচনে মাত্র ৪ শতাংশ নারী প্রার্থী কেন, দলগুলোর জবাবদিহি চান নারী অধিকারকর্মীরা

নারীর রাাজনৈতিক অধিকার ফোরাম আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে নারী অধিকারকর্মীরা। ডিআরইউর সাগর-রুনি মিলনায়তন, ঢাকা। ১২ জানুয়ারি ২০২৬ছবি: প্রথম আলো।

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন ২ হাজার ৫৬৮ জন প্রার্থী। এর মধ্যে মাত্র ১০৯ জন নারী, অর্থাৎ ৪ শতাংশের সামান্য বেশি। এত কমসংখ্যক নারী প্রার্থীদের মনোনয়ন দেওয়ার বিষয়ে জনগণের সামনে রাজনৈতিক দলগুলোর ব্যাখ্যা ও জবাবদিহি চেয়েছেন নারী অধিকারকর্মীরা।

আজ সোমবার নারীর রাজনৈতিক অধিকার ফোরাম আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ দাবি করা হয়। এ সময় নির্বাচন কমিশনের কাছে এবং রাজনৈতিক দলগুলোর জবাবদিহির দাবি করা হয়।

রাজধানীর সেগুনবাগিচায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) সাগর–রুনি মিলনায়তনে ‘নারী প্রার্থী মনোনয়নের সংকট: রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবায়নের ব্যবধান এবং নির্বাচন কমিশনের জবাবদিহি’ শিরোনামে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, জাতীয় ঐকমত্য কমিশন প্রণীত জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫-এর ধারা ২২(খ)-(ঘ) অনুযায়ী, প্রতিটি রাজনৈতিক দলকে এবারের সংসদীয় নির্বাচনে ন্যূনতম ৫ শতাংশ নারী প্রার্থী মনোনয়ন নিশ্চিত করতে হবে। পরবর্তী নির্বাচনগুলোতে তা ধাপে ধাপে বাড়িয়ে ৩৩ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারিত হয়েছে। অথচ আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী ৫১টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে ৩০টিরই কোনো নারী প্রার্থী নেই।

লিখিত বক্তব্যে আরও বলা হয়, এই পরিসংখ্যান এক বিশাল ভারসাম্যহীনতা তুলে ধরছে। ন্যূনতম ৫ শতাংশ নারী প্রার্থী মনোনয়ন কোনো গ্রহণযোগ্য মানদণ্ড নয়। নারীর ন্যায্য প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে সাধারণ আসনে অন্তত ৩৩ শতাংশ নারী প্রার্থী মনোনয়ন বাধ্যতামূলক করার দাবি ধারাবাহিকভাবে জানিয়ে আসছে নারীর রাজনৈতিক অধিকার ফোরাম। যে দলগুলো জুলাই সনদের ন্যূনতম ৫ শতাংশ নারী মনোনয়নসংক্রান্ত অঙ্গীকার করেও তা বাস্তবায়ন করতে পারেনি, জনসমক্ষে তাদের এই ব্যর্থতার ব্যাখ্যা ও জবাবদিহি প্রয়োজন। ন্যূনতম শর্তও যখন মানা হয় না, তখন জন–আস্থা প্রশ্নের মুখে পড়ে।

নারীর রাাজনৈতিক অধিকার ফোরামে যুক্ত রয়েছে ১২টি সংগঠন। সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন প্রকাশক মাহরুখ মহিউদ্দিন, নারীগ্রন্থ প্রবর্তনার পরিচালক সীমা দাস, ক্ষুব্ধ নারী সমাজের আহ্বায়ক ঋতু সাত্তার, নারীপক্ষের সদস্য সাদাফ সায্‌ সিদ্দিকী ও বহ্নিশিখার পরিচালক সামিনা ইয়াসমিন।

বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে মাহরুখ মহিউদ্দিন বলেন, নারী অধিকারকর্মীরা ৫ শতাংশ মনোনয়নের বিষয়টি নিয়ে বরাবরই আপত্তি জানিয়ে এসেছিল। সবশেষ রাজনৈতিক দলগুলো ৫ শতাংশ থেকে মনোনয়ন যেন বাড়ায় সে লক্ষ্য গত বছরের ৯ অক্টোবর একটি বড় সমাবেশ করেছিল নারী সংগঠনগুলো। ফলে নারী আন্দোলন যথেষ্ট চাপ সৃষ্টি করতে পারেনি উল্লেখ করে দায় চাপিয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই।

মাহরুখ মহিউদ্দিন আরও বলেন, নারীরা জিতে আসবেন কি না, সেই প্রশ্ন করা হয়। দলগুলোর কাছে জিজ্ঞাসা, তারা কি নারীদের জিতিয়ে আনার জন্য সহায়তা দিচ্ছে? তারা তো পুরুষদের জন্য ঠিকই সহায়তা করছে। নির্বাচনে নারীর জন্য সমক্ষেত্র প্রস্তুত করা হয়েছে কি না, সে প্রশ্নও থেকে যায়।

নারীদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গায় নিয়ে আসার লক্ষ্য থাকতে হবে রাজনৈতিক দলগুলোর উল্লেখ করে সাদাফ সায্‌ সিদ্দিকী বলেন, অনেক নারী নির্বাচনে প্রার্থী হতে আগ্রহী, কিন্তু তাঁদের সুযোগ দেওয়া হয় না। প্রক্রিয়া যদি শুরু হয়, তাহলে অনেক নারী আসবেন। তিনি প্রশ্ন করেন, রাজনৈতিক দলগুলো ৫ শতাংশ মনোনয়ন দেওয়ার ন্যূনতম প্রতিশ্রুতিও রাখেনি, তাহলে তাদের নির্বাচনী ইশতেহারের ওপর কেন আস্থা রাখবে জনগণ?

অনুষ্ঠানে চারটি দাবি তুলে ধরা হয়। এগুলো হলো জুলাই সনদে নারীর মনোনয়নের ক্ষেত্রে ন্যূনতম ঐকমত্যে রাজনৈতিক দলগুলো পৌঁছেছিল, তাতে কেন সব রাজনৈতিক দল ব্যর্থ হলো, সে বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের কাছে সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দলগুলোকে জবাবদিহি করতে হবে। নারীর রাজনৈতিক অধিকার নিশ্চিতে যেকোনো নির্বাচনী নীতিমালা লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনকে আরও শক্তিশালী ও জোরালো ভূমিকা রাখতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোকে নারী প্রার্থী মনোনয়নকে কোনো অনুগ্রহ বা প্রতীকী উদ্যোগ হিসেবে না দেখে জুলাই সনদে দেওয়া ন্যূনতম প্রতিশ্রুতি লঙ্ঘনের দায় নিতে হবে। দলের ভেতরে নারীর রাজনৈতিক অধিকার নিশ্চিত করতে দলগুলোকে গণতান্ত্রিক দায়িত্ব ও সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা হিসেবে বিবেচনা করে দলীয় কার্যক্রম, মনোনয়নপ্রক্রিয়া ও নেতৃত্ব বিকাশে বাস্তব ও কাঠামোগত পরিবর্তন আনতে হবে।