জামায়াত স্বৈরাচারের সঙ্গে রাতের বেলা আপস করে দিনের বেলা রাস্তায় নামেনি: শফিকুর রহমান

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের শহীদ পরিবার ও জুলাই যোদ্ধাদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমানছবি: প্রথম আলো

১১ জন শীর্ষ নেতাসহ ১ হাজার নেতা-কর্মীকে ঠান্ডা মাথায় হত্যা করা, বাড়িঘর ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান দখলের পরও জামায়াতে ইসলামী বিগত সরকারের সঙ্গে কোনো আপস করেনি বলে মন্তব্য করেছেন বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান।

জামায়াত আমির বলেন, ‘আমরা কারও সঙ্গে তলেতলে রাতের বেলা আপস করি নাই। আর দিনের বেলায় গিয়ে রাস্তায় নেমে চিৎকার দেই নাই এবং আমরা স্বৈরাচারের পারমিশন নিয়াও রাস্তায় নামি নাই। ওই পারমিশনের তোয়াক্কাও আমরা করি নাই। আমাদের যেটুকু সামর্থ্য ছিল, দফায় দফায় তাই নিয়ে স্বৈরশাসনের প্রতিবাদ আমরা করেছি।’

আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের শহীদ পরিবার ও জুলাই যোদ্ধাদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে শফিকুর রহমান এ কথা বলেন।

রাজধানীর কাকরাইলের ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশের (আইডিইবি) কাউন্সিল হলে এই সভার আয়োজন করে জামায়াতের ঢাকা মহানগরী উত্তর ও দক্ষিণ শাখা।

সভায় জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান বলেন, ‘২০২৪ সালের জুলাই মাসে আন্দোলনের শুরু থেকেই জামায়াতের পূর্ণ সমর্থন ছিল। তবে সরকার যখন জামায়াত নিষিদ্ধ করে, এরপরই দলের পক্ষ থেকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, হয় মরতে হবে নয়তো বাঁচার মতো বাঁচতে হবে। কোনো কোনো দলের শীর্ষ নেতারা সে সময় বলেছিলেন, আন্দোলনের সঙ্গে তাদের কোনো সম্পর্ক নেই। একই দিনে জামায়াত দলীয় নেতা-কর্মীসহ দেশবাসীকে তরুণ সমাজের পাশে দাঁড়াতে আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ার আহ্বান জানিয়েছিল।’

তরুণ সমাজের নেতৃত্বে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান সফল হওয়ার পরে আজ পর্যন্ত জামায়াত তার কৃতিত্ব নিতে চায়নি উল্লেখ করে দলটির আমির বলেন, জামায়াতের এতজন শহীদ হয়েছে, দলের কেউ আন্দোলনের মাস্টারমাইন্ড ছিল—এ কথা জামায়াত বলেনি। জামায়াত ৬ আগস্ট থেকে নির্বাচন চায়নি।

২০২৪ সালের ৬ আগস্ট থেকে একদল লোক চাঁদাবাজিতে ঝাঁপিয়ে পড়েছে উল্লেখ করে শফিকুর রহমান বলেন, তখন জামায়াত তাদের শীর্ষস্থানীয় দুজন নেতাকে নিয়ে এ বিষয়ে আলোচনার জন্য বসে। জামায়াতের পক্ষ থেকে চাঁদাবাজি থামাতে তাদের অনুরোধ করা হয়। কিন্তু জামায়াতের কথা তাদের ভালো লাগেনি। শর্ষের মধ্যে ভূত থাকলে তাড়ানো যায় না।

যে কোটার বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু হয়েছিল, সে কোটা এখন নিকৃষ্টভাবে বাস্তবায়ন হচ্ছে উল্লেখ করে জামায়াত আমির বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, জেলা পরিষদের প্রশাসক, ব্যাংক, বীমা কর্পোরেশন, সরকারি-বেসরকারি-আধা সরকারি—সব প্রতিষ্ঠানে নির্লজ্জ দলীয়করণ শুরু হয়েছে। দুর্নীতির স্বর্গরাজ্য কায়েম করতে যোগ্য লোকদের সরিয়ে বাছাই করে অসৎ ও দুর্নীতিপরায়ণদের প্রধান প্রধান পদে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে।’

বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, জুলাই যোদ্ধারা সিস্টেম পরিবর্তনের জন্য জীবন দিয়েছিলেন। এখন দেশ আবার অন্ধকার গলির দিকে ঢুকে যাচ্ছে। জামায়াত সেই অন্ধকার গলিতে হাঁটবে না। তারা সংসদে শহীদদের হয়ে, জনগণের হয়ে কথা বলবে।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের শহীদদের হত্যার বিচারের দাবি জানিয়ে জামায়াত আমির বলেন, এ দেশে কোনো হত্যার বিচার ২১ বছর, ৫০ বছর পরও হয়েছে। গণ-অভ্যুত্থানের হত্যার বিচারও যত সময় লাগুক, হতেই হবে।

অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলায় জুলাই যোদ্ধা ও জামায়াতের নেতা-কর্মীদের ওপর হামলা হচ্ছে দাবি করে শফিকুর রহমান বলেন, আক্রমণ করতে করতে কে কোথায় পালাবে আর ডুববে, সেটি আল্লাহ ভালো জানেন।

সভায় বিশেষ অতিথির বক্তব্যে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, জুলাই সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়নে তিল পরিমাণ ছাড়া হবে না। সংসদে এর সমাধান না হলে শহীদ পরিবার ও জুলাই যোদ্ধাদের দিয়ে রাজপথে আন্দোলন গড়ে তোলা হবে।

প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী দিলারা চৌধুরী বলেন, গণভোটকে ধারণ করুন। তাহলে বিএনপি দেশের রাজনীতিতে একটি স্থায়ী অবস্থান করে নেবে। জাতীয় ঐক্যের প্রথম ধাপ হবে গণভোটের রায় বাস্তবায়ন।

সাবেক কূটনীতিক সাকিব আলী বলেন, ২০২৪ সালের জুলাই হলো জাতির জন্য শ্রেষ্ঠতম সময়। কারণ, ওই সময় কেউ পালিয়ে যুদ্ধ করেনি, বুক চিতিয়ে যুদ্ধ করেছিল। একাত্তর সালে বুক চিতিয়ে যুদ্ধ করতে দেখিনি, যেটা ২০২৪ সালে দেখেছি।

সংরক্ষিত নারী আসনের এমপি ও জুলাই শহীদ জাবির ইব্রাহিমের মা রোকেয়া বেগম বলেন, ট্রাইব্যুনালের অভাবে জুলাই গণহত্যার বিচার ত্বরান্বিত হচ্ছে না। ট্রাইব্যুনালে লোকবলেরও অভাব আছে। সে জন্য ট্রাইব্যুনালের সংখ্যা বাড়াতে হবে।

জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, যারা জুলাইকে মুছে দিতে চায়, তাদের ইতিহাস থেকে মুছে দিতে হবে। সে জন্য সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।

সভায় জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আহত যোদ্ধাদের পাশে দাঁড়াতে সরকারি দল ও বিরোধী দলের প্রতি আহ্বান জানান শহীদ মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধের বাবা মীর মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি বলেন, সরকারকে বিগত দিনের ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা করতে হবে। নইলে তাদেরও আগের মতো একই পরিণতি ভোগ করতে হবে।

আন্দোলনের সময় মাকে লেখা শহীদ শাহরিয়ার খান আনাসের চিঠি পড়ে শোনান তাঁর নানা মো. সাঈদুর রহমান। এ সময় তিনি বলেন, ‘যে ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য আনাস জীবন দিয়েছিল, সেই ন্যায় এখনো বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠিত হয়নি।’

সভায় সভাপতিত্ব করেন জামায়াতের ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের আমির নূরুল ইসলাম বুলবুল। সঞ্চালক ছিলেন ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সেক্রেটারি শফিকুল ইসলাম মাসুদ, ঢাকা মহানগর উত্তরের সহকারী সেক্রেটারি দেলোয়ার হোসেন ও ফখরুদ্দিন মানিক।

মতবিনিময় সভায় আরও বক্তব্য দেন মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান, সাবেক সচিব মাহবুবুল হক, আইনজীবী এ এস এম শাহরিয়ার কবির, জামায়াতের ঢাকা মহানগরী উত্তরের আমির মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন, ডিইউজের সভাপতি শহীদুল ইসলাম, রাষ্ট্র সংলাপ ফোরামের কেন্দ্রীয় সদস্যসচিব আল নূর মোহাম্মদ আয়াস।