শোকবইয়ে খালেদা জিয়াকে নিয়ে নেতা-কর্মী ও সাধারণ মানুষের স্মৃতিচারণা

বিএনপির নেতা-কর্মী, সমর্থক ও সাধারণ মানুষ শোকবইয়ে খালেদা জিয়াকে নিয়ে নানা ঘটনার স্মৃতিচারণা করছেন। বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়, নয়াপল্টন, ঢাকা। ১ জানুয়ারি ২০২৫ছবি: খালেদ সরকার

সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে শোকবই খোলা হয়েছে। সেখানে ‘মহাকালের সমাপ্তি’ শিরোনামে খালেদা জিয়ার একটি ছবি টানানো। বিএনপির নেতা–কর্মী, সমর্থক ও সাধারণ মানুষ শোকবইয়ে তাঁকে নিয়ে নানা কথা–স্মৃতিচারণা করছেন। তাঁর জন্য দোয়া করছেন।

বৃহস্পতিবার নয়াপল্টনে দোয়া মাহফিল বা অন্য কোনো কর্মসূচি আছে কি না, তা দেখার জন্য যাত্রাবাড়ী থেকে এসেছিলেন মো. শিমুল। এসে দেখেন, শোকবইয়ে মানুষ নিজেদের মনের কথা লিখছেন।

শিমুল প্রথম আলোকে বলেন, তিনি কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে জড়িত নন। নয়াপল্টনে একজনের কাছে জানতে চান, দলীয় লোক ছাড়া শোকবইয়ে লেখা যায় কি না। তিনি জানান, লেখা যায়। নিজে লিখলে বানান ভুল হতে পারে। আবার সব শব্দ ঠিকমতো লিখতেও পারেন না। সে কারণে ওই ব্যক্তিকে তাঁর হয়ে লিখে দেওয়ার অনুরোধ করেন শিমুল। এ সময় তিনি শিমুলকে বলেন, বানান ভুল হলেও কোনো সমস্যা নেই।

এরপর শিমুল শোকবইয়ে লেখেন, ‘বেগম খালেদা জিয়ার মিতুতে (পড়ুন মৃত্যুতে) আমারা (আমরা) গভির ভাবে (গভীরভাবে) শোক পোকাশ (প্রকাশ) করছি এবং দোয়া তিনি জেন (যেন) আমাদেরকে জেই (যে) আদর্স (আদর্শ) শিখিয়েছেন তা জেনো (যেন) না ভুলি এবং তার জোন্য (জন্য) দোয়া করি (।) তিনি জে (যে) ভালো বাসা বাংলাদেশের মানুষের জ্যন (জন্য) দিয়েছেন তা আমরা সব সময় মনে কোরে রাখবো।’

‘কমলালেবু খেতে দিয়েছিলেন’

১৯৮৮ সালে চাঁপাইনবাবগঞ্জে ফাঁরাক্কা বাঁধের লং মার্চে গিয়ে মো. কামরুজ্জামান মুক্তাকে নিজ হাতে কমলালেবু খেতে দিয়েছিলেন খালেদা জিয়া। তখন কামরুজ্জামান অষ্টম শ্রেণিতে পড়তেন। সেই ঘটনার পর কামরুজ্জামান ছাত্রদলের রাজনীতিতে যোগ দিয়েছিলেন।

নিজ হাতে কমলালেবু খেতে দেওয়ার বিষয়টি শোকবইয়ে উল্লেখ করেছেন কামরুজ্জামান। বর্তমানে তিনি চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌর বিএনপির জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি।
খালেদা জিয়ার মৃত্যুর সংবাদ শুনে কিশোরগঞ্জ থেকে ঢাকায় আসেন মো. মামুন মিয়া। তিনি কিশোরগঞ্জ জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক। তিনি শোকবইয়ে মনের কথা লিখেছেন। খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে তিনি গভীরভাবে শোকাহত, সেই কথাই তিনি শোকবইয়ে লিখেছেন বলে জানান।

‘নেতাকে ফোনে না পেলে আমাকে কল দিতেন’

শোকবইয়ে চট্টগ্রাম উত্তর জেলা বিএনপির সাবেক দপ্তর সম্পাদক মনজুরুল ইসলাম লিখেছেন, ‘হে গণতন্ত্রের মা, আপনি আজ আমাদের ছেড়ে না ফেরা দেশে পাড়ি দিয়েছেন। আজ আমরা যারা গণতন্ত্রের জন্য যুদ্ধ করেছিলাম আপনার ডাকে, আপনি তাদের ছেড়ে চলে গেছেন মহান রাব্বুল আলামিনের ডাকে। আপনি সেখানে ভালো থাকুন। যাতে মহান আল্লাহপাক আপনাকে জান্নাতের বাগানে মেহমান করে রাখেন।’
মনজুরুল ইসলাম আরও লেখেন, ‘সেই ২০১৪ সালের আন্দোলনে আপনি আমার নেতাকে যখন ফোনে পেতেন না, তখন আমাকে কল দিয়ে নির্দেশনা দিতেন। আমি গুলশান অফিসে গেলে আমার কাছে কী তথ্য আছে, তা জানার জন্য ওপরে নিয়ে কথা বলতেন। আপনার মতো একজন অভিভাবক আমরা হারালাম।’

নোয়াখালীর তাজুল ইসলাম নামের একজন শোকবইয়ে লেখেন, ‘প্রিয় দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া, আপনার বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি। আল্লাজ যেন আপনাকে পরপারে বেহেস্ত নসিব করেন, আমিন।’

মোনাজাত ধরে কাঁদছিলেন বৃদ্ধ

খালেদা জিয়ার মৃত্যুর দিন থেকে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে কোরআন তিলাওয়াত করা হচ্ছে, তা বৃহস্পতিবার অব্যাহত ছিল। দুপুরে একদিকে শোকবইয়ে লেখা চলছিল, অন্যদিকে কোরআন তিলাওয়াত হচ্ছিল। তখন বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের ফটকের পাশে বসে মোনাজাত ধরে কাঁদছিলেন সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলা থেকে আসা বৃদ্ধ মো. আবদুল সাত্তার।

অশ্রুসিদ্ধ সাত্তার প্রথম আলোকে বলেন, জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়া চলে গেছেন। এখানে বসে তিনি তাঁদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করছেন। তিনি আরও বলেন, সারা পৃথিবীতেই শান্তি ফিরে আসুক। বাংলাদেশেও আল্লাহ শান্তির লগ্ন ফিরিয়ে দিক। মানবতা ফিরে আসুক।