১৬ জেলায় হামলার অভিযোগ জামায়াতের, খোঁজ নিয়ে যা জানা গেল
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোট গ্রহণের পর থেকে দেশের বিভিন্ন স্থানে জামায়াতে ইসলামী এবং তাদের মিত্ররা আক্রান্ত হচ্ছে বলে অভিযোগ করে আসছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। ভোটে জয়ী বিএনপির নেতা–কর্মীরা এই হামলা চালাচ্ছেন বলে দলটির অভিযোগ।
গত বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসনে বিজয়ী হয়েছে বিএনপি। জামায়াত এককভাবে ৬৮টি আসনে জয়ী হয়েছে, তাদের মিত্ররা জিতেছে আরও ৯টি আসনে।
গতকাল শনিবার জামায়াতের ফেসবুক পেজে এক পোস্টে ভোট গ্রহণের পর ১৬ জেলার ২১টি স্থানে ১১-দলীয় নির্বাচনী ঐক্যভুক্ত দলগুলোর নেতা-কর্মীদের ওপর হামলার অভিযোগ তোলা হয়। এই হামলায় অনেকে আহত হওয়ার পাশাপাশি বাড়িঘর ভাঙচুর ও লুটপাট হয় বলে দাবি করা হয়।
স্থানীয় পর্যায়ে খোঁজ নিয়ে এই অভিযোগের অনেকটির সত্যতা পাওয়া গেছে, তবে কয়েকটি ক্ষেত্রে সত্যতা মেলেনি। দু-একটি ক্ষেত্রে জামায়াতের স্থানীয় নেতারাও হামলার খবর জানেন না বলে জানিয়েছেন।
খুলনা
জামায়াতে ইসলামীর দাবি অনুযায়ী, খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) উপাচার্যের (ভিসি) ওপর ছাত্রদল কর্মীরা হামলা চালান।
খবর নিয়ে জানা যায়, গত শুক্রবার রাতে কুয়েট উপাচার্য অধ্যাপক মো. মাকসুদ হেলালীকে ক্যাম্পাসে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেন একদল শিক্ষার্থী। তাঁর বাসভবনের ফটকে তালা দেওয়ার চেষ্টাও হয়। খবর পেয়ে পুলিশ গিয়ে উপাচার্যের বাসভবনের সামনে অবস্থানকারী ব্যক্তিদের সরিয়ে দেয়।
উপাচার্যের বাসভবনের সামনে একটি ব্যানার টাঙানো হয়েছিল, যেখানে লেখা ছিল ‘সাধারণ শিক্ষার্থীবৃন্দ’। ক্যাম্পাসের একাধিক সূত্র জানায়, কুয়েটে ছাত্রদলের কোনো কমিটি নেই, তবে ছাত্রদল বা বিএনপির সমর্থক শিক্ষার্থীরা ব্যানার টাঙানোর কাজটি করেন।
উপাচার্য অধ্যাপক মাকসুদ হেলালী সাংবাদিকদের বলেন, শুক্রবার রাত সাড়ে আটটার দিকে কয়েকজন শিক্ষার্থী তাঁর বাসভবনের সামনে এসে প্রধান ফটকে তালা দেওয়ার চেষ্টা করেন। তাঁকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করে ক্যাম্পাস ছাড়ারও আহ্বান জানান। বিষয়টি পুলিশকে জানালে তারা এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
খানজাহান আলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হাওলাদার সানওয়ার হুসাইন মাসুম প্রথম আলোকে বলেন, ‘খবর পেয়ে শুক্রবার রাত সাড়ে আটটার দিকে আমরা সেখানে যাই। গিয়ে দেখতে পাই ১০ থেকে ১৫ জন শিক্ষার্থী হ্যান্ডমাইকে উপাচার্য মহোদয়কে বলছেন, “স্যার, আমরা আপনাকে ডাকছি, আপনি তো আসলেন না। আমরা প্যানা দিয়ে গেলাম—আপনাকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করলাম।” এরপর তাঁরা সেখান থেকে চলে যান।’
জামায়াতের ফেসবুক পোস্টে বলা হয়েছে, খুলনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীর বাড়িতে আগুন দেওয়া এবং তাঁর মা-বোনকে পিটিয়ে আহত করার মতো ঘটনা ঘটেছে। ওই শিক্ষার্থীকে প্রাণনাশের হুমকিও দেওয়া হয়েছে।
বিষয়টি নিয়ে পুলিশ কিছু জানাতে পারেনি। খুলনার পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘এ ধরনের কোনো খবর আমাদের কাছে আসেনি।’
জামায়াতের কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরা সদস্য, খুলনা অঞ্চলের ১৪টি নির্বাচনী আসনের পরিচালক শফিকুল আলম প্রথম আলোকে বলেন, 'এই মুহূর্তে এ ধরনের খবর আমার কাছে নেই। বিষয়টি যাচাই করে দেখছি।’
গোপালগঞ্জ
গোপালগঞ্জে বিএনপি নেতার নেতৃত্বে জামায়াত নেতার বাড়িতে হামলার অভিযোগ করা হয় ফেসবুক পোস্টে। এ বিষয়ে গোপালগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিএসবি) মুহাম্মদ সরোয়ার হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, এ ধরনের কোনো ঘটনা গোপালগঞ্জের ঘটেনি, এটা ফেসবুকে গুজব ছড়িয়েছে।
জেলা বিএনপির আহ্বায়ক শরীফ রাফিকুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমার জানামতে এ ধরনের ঘটনা ঘটেনি। এ ধরনের ঘটনা ঘটলে আমাদের নেতা-কর্মীরাসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জানত। একটা শ্রেণি গুজব ছড়াচ্ছে।’
জেলা জামায়াতের সাবেক আমির ও গোপালগঞ্জ-১ (মুকসুদপুর ও কাশিয়ানীর একাংশ) জামায়াতের প্রার্থী মুহাম্মাদ আবদুল হামীদ প্রথম আলোর জিজ্ঞাসায় বলেন, গোপালগঞ্জে এ ধরনের কোনো ঘটনা ঘটেনি।
পঞ্চগড়
পঞ্চগড়ে বিএনপির কর্মীদের হাতে সাধারণ মানুষের ঘরবাড়ি ও দোকানপাট ভাঙচুর এবং অনেক আহত হওয়ার অভিযোগ এসেছে জামায়াতের ফেসবুক পোস্টে। অভিযোগটি করা হয়েছে পঞ্চগড়-১ আসনে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যের প্রার্থী জাতীয় নাগরিক পার্টের কেন্দ্রীয় মুখ্য সংগঠক সারজিস আলমের বরাতে।
সারজিস আলম এক ফেসবুক পোস্টে অভিযোগ করেন, নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পর থেকে ৩০টির বেশি স্থানে তাঁর দলের নেতা-কর্মীদের বাড়িঘর ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা চালান বিএনপির নেতা-কর্মীরা।
পঞ্চগড়ের পুলিশ সুপার মো. রবিউল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, বিভিন্ন এলাকা থেকে এ ধরনের ‘ছোট ছোট’ ঘটনার খবর পেয়ে সেখানে পুলিশ পাঠানো হচ্ছে। ‘বড়’ ধরনের কোনো ঘটনা পাওয়া যায়নি। তাঁর ভাষ্যে, এগুলোর বেশির ভাগই গ্রামের ভিন্ন ভিন্ন প্রতীকের সমর্থকদের মধ্যে ঝগড়াঝাটির মতো। এসব ঘটনার বিষয়ে কেউ থানায় লিখিত অভিযোগ দেননি।
দিনাজপুর
দিনাজপুরে জামায়াতের পোলিং এজেন্ট হওয়ায় ছেলের ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে বাবাকে মারধর ও বাড়ি পোড়ানোর হুমকি দেওয়ার একটি অভিযোগ করা হয় জামায়াতের ফেসবুক পোস্টে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ঘটনাটি দিনাজপুর জেলার বিরামপুর উপজেলার। প্রথম আলোর প্রতিনিধি জানান, শুক্রবার সকাল সাতটার দিকে বিরামপুর উপজেলার ৪ নম্বর দিওড় ইউনিয়নের ধানঘরা গ্রামে দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের পোলিং এজেন্ট মহিদুল ইসলামের বাবা মিজানুর রহমানের (৫৬) ওপর হামলা হয়। দেশি অস্ত্র দিয়ে তাঁর হাত ও পা ভেঙে দেওয়া হয়েছে। হামলার অভিযোগ উঠেছে বিএনপির বিরামপুর উপজেলা শাখার যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ইব্রাহিম আলী বাবুর ছেলে রাহাদুজ্জামান পরাগ ও রিফাত হোসেনের বিরুদ্ধে।
কুড়িগ্রাম
কুড়িগ্রামে ভোট নিয়ে তর্কের জেরে জামায়াত নেতাকে কুপিয়ে জখমের অভিযোগ করা হয়েছে জামায়াতের ফেসবুক পোস্টে। কুড়িগ্রামের রাজারহাট থানার ওসি আবদুল ওয়াদুদ প্রথম আলোকে বলেন, কুড়িগ্রামে ভোট দেওয়া নিয়ে তর্কের জেরে জামায়াত নেতাকে কুপিয়ে জখমের খবর নজরে এলে পুলিশ উপজেলার ঘড়িয়ালডাঙ্গা চেতনা গ্রামে গিয়েছিল। সেখানে স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানতে পারে যে ঘটনাটি ভোটসংক্রান্ত নয়, বরং জমিতে পানি দেওয়া নিয়ে পারিবারিক কলহে কথা–কাটাকাটির এক পর্যায়ে সংঘর্ষ হলে একজন অসুস্থ হয়ে রংপুর মেডিকেলে ভর্তি হন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে কুড়িগ্রাম জেলা জামায়াতের আমির মো. আজিজুর রহমান সরকার প্রথম আলোকে বলেন, জামায়াতের রাজারহাট উপজেলার সেক্রেটারি আহম্মদ আলীর শ্বশুরের ওপর ভোটের দিন হামলা হয়েছিল। পরদিন শুক্রবার আহম্মদ আলী শ্বশুরকে দেখতে ঘড়িয়ালডাঙ্গা গেলে সেখানে তাঁর ওপর ধারালো অস্ত্র দিয়ে প্রতিপক্ষের লোকজন হামলা চালান। পরে তাঁকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
লালমনিরহাট
লালমনিরহাটের পাটগ্রামে বিএনপির নেতাদের নেতৃত্বে বাড়িতে ঢুকে মালামাল লুটপাটের অভিযোগ করা হয় জামায়াতের ফেসবুক পোস্টে।
ভোটের দিন পাটগ্রামে দুটি সহিংসতার ঘটনার খবর পাওয়া গেলেও থানায় গতকাল পর্যন্ত কেউ কোনো অভিযোগ করেননি বলে জানান পাটগ্রাম থানার ওসি মো. নাজমুল হক। তিনি এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, শুক্রবার বুড়িমারীর একটি চায়ের দোকানে তর্কবিতর্কের এক পর্যায়ে হামলা ও ভাঙচুর হয়েছে, তবে কেউ আহত হননি। ক্ষতিগ্রস্ত চায়ের দোকানমালিককে লিখিত অভিযোগ দিতে বলা হয়েছে। তবে যত দূর জানা গেছে, বিষয়টি স্থানীয়ভাবে মীমাংসা করা হয়েছে। জোংরায় পূর্বশত্রুতার জেরে দুই পক্ষের মধ্যে মারামারির ঘটনা ঘটে। সেখানে উভয় পক্ষেই বিএনপির সমর্থক রয়েছে।
পাটগ্রাম উপজেলা জামায়াতের সেক্রেটারি মনোয়ার হোসেন লিটনের সঙ্গে গতকাল বিকেলে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি জামায়াতের সমর্থকদের ওপর প্রতিপক্ষের হামলার অভিযোগ করেন। তবে তিনি বিস্তারিত কিছু বলতে পারেননি। লালমনিরহাট জেলা জামায়াতের আমির ও লালমনিরহাট-৩ আসনের প্রার্থী মো. আবু তাহের বলেন, পাটগ্রামে কিছু সমস্যা হওয়ার কথা তিনি শুনেছেন, তবে বিস্তারিত কিছু তিনিও জানাতে পারেননি। লালমনিরহাট-১ আসনের জামায়াতের প্রার্থী মো. আনোয়ারুল ইসলামের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলে বিপরীত দিক তিনি সাড়া দেননি।
বগুড়া
বগুড়ার সারিয়াকান্দি উপজেলায় ছাত্রদল ও ছাত্রলীগের যৌথ হামলায় শিবিরের কর্মী আহত হয়েছেন বলে অভিযোগ করা হয় জামায়াতের ফেসবুক পোস্টে।
সারিয়াকান্দি উপজেলা জামায়াতের সেক্রেটারি কাজী জহুরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, নির্বাচনের দিন বেশকিছু কেন্দ্রে বিএনপির নেতা–কর্মীরা দাঁড়িপাল্লার নেতা-কর্মীদের ওপর হামলা করেন। দাঁড়িপাল্লার পক্ষে ভোট করায় বিএনপি, ছাত্রদল এবং ছাত্রলীগ একজোট হয়ে হত্যার উদ্দেশ্যে শিবিরের কর্মী সাহাবুলের ওপর হামলা চালিয়েছেন।
এদিকে বগুড়া-১ আসনে বিজয়ী বিএনপির প্রার্থী কাজী রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘যত দূর জেনেছি, হাটশেরপুর ইউনিয়নে দাঁড়িপাল্লার একজন কর্মীর ওপর হামলায় জড়িত ব্যক্তিরা বিএনপির কেউ নন।’
সারিয়াকান্দি থানার ওসি আ ফ ম আসাদুজ্জামান বলেন, সাহাবুল এবং তাঁর ওপর হামলাকারী কয়েকজন একসময় ছাত্রলীগ (বর্তমানে নিষিদ্ধ) করতেন। বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত নির্বাচনে সাহাবুল দাঁড়িপাল্লা এবং তাঁর প্রতিপক্ষের লোকজন ধানের শীষের পক্ষে ছিলেন। আগের বিরোধের জেরে তাঁর প্রতিপক্ষের লোকজন শুক্রবার রাতে সাহাবুলের ওপর হামলা করেন।
সুনামগঞ্জ
সুনামগঞ্জের দিরাই পৌর শহরে জামায়াত নেতার ওপর শারীরিক আক্রমণের অভিযোগ করা হয় ফেসবুক পোস্টে। তবে দিরাই উপজেলা জামায়াতের প্রচার বিভাগের সম্পাদক এমরান হোসাইন প্রথম আলোকে বলেন, দিরাই পৌর শহরে নির্বাচনের পর কোনো জামায়াত নেতা আক্রমণে শিকার হয়েছেন বলে তাঁর জানা নেই।
দিরাই থানার ওসি এনামুল হক চৌধুরী বলেন, এ রকম কোনো ঘটনা ঘটেনি। থানায় কেউ কোনো অভিযোগও করেননি।
নোয়াখালী
নোয়াখালীর সেনবাগে জামায়াত নেতার ওপর ছাত্রদল কর্মীদের অতর্কিত হামলা হয় বলে অভিযোগ করা হয় জামায়াতের ফেসবুক পোস্টে।
প্রথম আলোর প্রতিনিধি জানান, সেনবাগ উপজেলার অন্তত তিনটি স্থানে জামায়াতের কর্মীদের ওপর ছাত্রদলের হামলার ঘটনা ঘটেছে। ভোটের পরদিন শুক্রবার সকালে সেনবাগ পৌরসভার বিন্নাগনি গ্রামের বাসিন্দা জামায়াতের কর্মী জসিম উদ্দিনকে (৬০) কিল-ঘুষি দিয়ে রক্তাক্ত করেন উপজেলা ছাত্রদলের নেতা সানাউল্যাহ। এ ছাড়া একটি স্থানে জামায়াতের কর্মীদের দুটি বাড়িতে ইটপাটকেল ছোড়া হয়।
শুক্রবার দুপুরে জুমার আগে ডমরুয়া ইউনিয়ন জামায়াতের সেক্রেটারি ও স্থানীয় মসজিদের খতিব আবদুল হালিমসহ (৫০) তাঁর ছেলেদের ওপর হামলা চালান স্থানীয় ছাত্রদলের কর্মীরা। ওই ঘটনায় পাঁচজন আহত হয়েছেন।
গতকাল সকালে বীজবাগ ইউনিয়নের শ্যামের গাঁও গ্রামে জামায়াতের কর্মী আবদুল্লাহর (৩০) নাক ফাটিয়ে দেন স্থানীয় ছাত্রদলের কর্মীরা। তাঁকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছে।
ফেনী
ফেনীর ফুলগাজীতে ছাত্রদল নেতার নেতৃত্বে জামায়াত নেতার দোকানে হামলা এবং মুন্সীরহাটে জামায়াতের কর্মীদের চারটি দোকান ভাঙচুর করা হয়েছে বলে জামায়াতের ফেসবুক পোস্টে অভিযোগ করা হয়।
স্থানীয় যুবদল নেতাদের বিরুদ্ধে এই অভিযোগ তুলেছেন ফেনী-১ আসনে জামায়াতের প্রার্থী এস এম কামাল উদ্দিন। ফেনী জেলা জামায়াতের আমির মুফতি আবদুল হান্নান প্রথম আলোকে বলেন, নির্বাচনের পর ফেনীর বিভিন্ন উপজেলায় তাঁদের কর্মীর ওপর হামলা হয়েছে, বাড়িঘর-দোকানপাট ভাঙচুর হয়েছে। এ ঘটনায় তিনটি মামলা হয়েছে।
ফেনীর পুলিশ সুপার শফিকুর রহমান বলেন, ফুলগাজীসহ বিভিন্ন এলাকায় কিছু অপ্রীতিকর ঘটনার কথা পুলিশের নজরে এসেছে। পুলিশ সব ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে দোষী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেবে।
জেলা বিএনপির আহ্বায়ক শেখ ফরিদ বাহার এই বিষয়ে বলেন, ‘গত তিন দিনে ছোটখাটো কিছু ঘটনা সংঘটিত হয়েছে বলে আমরা জানতে পেরেছি। প্রশাসনকে বলা হয়েছে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য। আমরা নিজেরাও দলীয়ভাবে তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত নেব।’
চট্টগ্রাম
চট্টগ্রামের সন্দ্বীপে জামায়াতের কর্মীর বাড়িতে হামলার অভিযোগ করা হয়েছে জামায়াতের ফেসবুক পোস্টে। বলা হচ্ছে, যাঁদের বাড়িঘরে হামলা হয়েছে, তাঁরা ভোটের দিন দাঁড়িপাল্লার পক্ষে কাজ করেছিলেন।
ভোটের দিন ১২ ফেব্রুয়ারি উপজেলার মুছাপুর ৭ নম্বর ওয়ার্ডে হামলার ঘটনাটি ঘটে বলে খবর নিয়ে জানা গেছে। জামায়াতের কর্মীদের অভিযোগ, ভোটের দিন সকাল থেকেই বিএনপির কর্মীরা তাঁদের ওপর হামলা চালাতে থাকেন। তখন প্রশাসন তাঁদের নিবৃত্ত করলেও রাতে সংঘবদ্ধ হয়ে বসতঘরে হামলা করেন। হামলায় আবদুর রহমান (২৫) ও লুৎফর রহমান (২৫) নামের দুজন আহত হন।
দাঁড়িপাল্লার প্রার্থীর পক্ষে কাজ করেছেন জানিয়ে আবদুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ভোট শেষে সন্ধ্যা সাতটায় মুছাপুর ৭ নম্বর ওয়ার্ডের বিএনপির একদল কর্মী তাঁর বাড়ির গেটে জড়ো হন। তাঁরা গেট ভেঙে ভেতরে ঢোকার চেষ্টা প্রবেশ করার চেষ্টা শুরু করলে তিনি প্রতিহতের চেষ্টা করেও সফল হননি। হামলাকারী ব্যক্তিরা ভেতরে ঢুকে তাঁর চাচা লুৎফর রহমানকেও পিটিয়ে আহত করেন। হামলার একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে সোশ্যাল মিডিয়ায়। আবদুর রহমান জানান, তাঁর বাড়ির সিসি টিভি ক্যামেরায় ওই ভিডিও ধারণ করা হয়েছিল।
কক্সবাজার
কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলায় জামায়াতের নেতার বাড়িতে বিএনপির কর্মীরা দফায় দফায় হামলা চালান বলে অভিযোগ করা হয় জামায়াতের ফেসবুক পোস্টে।
প্রথম আলোর কক্সবাজার প্রতিনিধি জানান, শুক্রবার উপজেলার হারবাং ইউনিয়নের করমুহুরী পাড়া এলাকায় ছয়টি বসতঘরে ভাঙচুর চালানো হয়। এ সময় গিয়াসউদ্দিন (৫৫) নামের একজন জামায়াতের কর্মীকে কুপিয়ে জখম করা হয়। মোহাম্মদ আতিক (২৭) নামের ইসলামী ছাত্রশিবিরের এক কর্মীকে ব্যাপক মারধর করা হয়। এ ঘটনায় মোহাম্মদ জুরাত ওরফে লাদেন নামের বিএনপির এক কর্মীকে ধরে পুলিশে দিয়েছে সেনাবাহিনী।
আহত গিয়াসউদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমার বসতঘরসহ আশপাশের ছয়টি বসতঘরে ভাঙচুর ও লুটপাট চালান বিএনপির নেতা-কর্মীরা। করমুহুরী পাড়া স্টেশনে প্রকাশ্যে আমাকে কুপিয়ে জখম করা হয়েছে।’ এই আসনে জামায়াতের প্রার্থী আবদুল্লাহ আল ফারুক বলেন, ‘বিএনপির সন্ত্রাসীরা জামায়াতের লোকজনকে ধরে ধরে মারছেন। বাড়িঘরে লুটপাট চালাচ্ছেন। এসব ঘটনায় আইনি প্রতিকার চাই আমি।’
বিষয়টি নিয়ে চকরিয়া থানার উপপরিদর্শক (এসআই) ফরিদ হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, হারবাংয়ে হামলার ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। আটক ব্যক্তিকে ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে।
বাগেরহাট
বাগেরহাট-৪ আসনে আল-আমিন নামের এক যুবককে পিটিয়ে গুরুতর আহত করা হয়েছে বলে জামায়াতের ফেসবুক পোস্টে অভিযোগ করা হয়। এ ছাড়া হামলায় জামায়াত-শিবিরের ২০ জন নেতা–কর্মী জখম হন বলেও দাবি করা হয়েছে।
এ বিষয়ে প্রথম আলোর বাগেরহাট প্রতিনিধি জানান, বাগেরহাট-৪ (মোরেলগঞ্জ-শরণখোলা) আসনে বিএনপির নেতা–কর্মীদের হামলায় জামায়াতের অন্তত ১০ জন এবং জামায়াতের নেতা–কর্মীদের হামলায় বিএনপির অন্তত ১২ জন আহত হয়েছেন। এ ছাড়া বিভিন্ন এলাকায় হুমকিসহ উত্তেজনা বিরাজ করছে।
বাগেরহাট সদর উপজেলার মান্দা গ্রামে ভোটের রাতে পাঁচ থেকে ছয়টি বাড়িঘর ভাঙচুর করা হয়েছে। যাঁদের বাড়িঘরে প্রথমে হামলা করা হয়, তাঁরা স্থানীয় জামায়াতের নেতা। হামলার জন্য দায়ী করা হয়েছে বিএনপিকে। এর জেরে পরদিন বিএনপির এক নেতার বাড়িসহ সাত থেকে আটটি বাড়িতে পাল্টা হামলা হয়। সেই হামলার জন্য জামায়াতকে দায়ী করা হচ্ছে।
কুষ্টিয়া
কুষ্টিয়ায় জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতার বাড়িতে হামলার অভিযোগ করা হয় জামায়াতের ফেসবুক পোস্টে। তবে কুষ্টিয়ায় এমন কোনো ঘটনা ঘটেনি বলে প্রথম আলোকে জানান এনসিপির যুগ্ম সমন্বয়কারী কে এম আর শাহিন। কুষ্টিয়া মডেল থানার ওসি কবির হোসেন মাতুব্বর প্রথম আলোকে বলেন, তিনিও এ রকম কোনো সংবাদ পাননি।
সিরাজগঞ্জ
সিরাজগঞ্জে জামায়াতের জেলা আমিরের বাড়িতে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে বলে দলটির ফেসবুক পোস্টে অভিযোগ করা হয়। জেলা জামায়াতের আমির হারুন অর রশিদ প্রথম আলোকে বলেন, প্রতিপক্ষের লোকজন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ভয়ভীতি দেখানোর জন্য এমন আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটিয়েছিলেন। তত্ক্ষণাৎ প্রতিবেশীরা বিষয়টি দেখতে পেয়ে দ্রুত পানি ঢেলে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে।
সলঙ্গা থানার ওসি ইমাম জাফর প্রথম আলোকে বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে বিষয়টি জেনে ঘটনাস্থলে পুলিশ যায়, তবে সেখানে গিয়ে অগ্নিসংযোগের চিহ্ন পায়নি। ওই জামায়াতের নেতার বাড়ি থেকে ২০–২৫ মিটার দূরে একটি বাঁশঝাড়ের মধ্যে জমা করে রাখা শর্ষে গাছের গাদায় আগুন দেওয়া হয়েছিল। তবে ভুক্তভোগী ব্যক্তিকে থানায় অভিযোগ দিতে বলা হলেও এখনো তিনি কোনো অভিযোগ দেননি।
জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি জাহিদুল ইসলাম বলেন, নির্বাচন নিয়ে ব্যস্ততার কারণে এখনো কোনো অভিযোগ দেওয়া হয়নি।
বরিশাল
বরিশালে বাবার রাজনৈতিক (জামায়াত) পরিচয়ের জেরে ছেলের গাড়িতে হামলার অভিযোগ করা হয়েছে জামায়াতের ফেসবুক পোস্টে, তবে খোঁজ নিয়ে এমন কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। বরিশাল জেলা পুলিশ সুপার ফারজানা ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘এ ধরনের কোনো ঘটনার খবর আমার কাছে আসেনি।’
জানতে চাইলে বরিশাল মহানগর জামায়াতের আমির জহির উদ্দিন মুহাম্মদ বাবর প্রথম আলোকে বলেন, ‘বরিশালের কোন জায়গায়, সেটি আমি নিশ্চিত করে বলতে পারব না। খোঁজ নিয়ে নিশ্চিত হয়ে জানাতে পারব, তবে বরগুনার পাথরঘাটা ও ঝালকাঠির রাজাপুরে বেশ কিছু ঘটনা ঘটেছে।’
[প্রতিবেদনটি তৈরিতে সহযোগিতা করেছেন প্রথম আলোর জেলা প্রতিনিধিরা]