সময়ের সঙ্গে রাষ্ট্রপতির বক্তব্যও পাল্টে যায়

ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরুর দিনে ভাষণ দেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। ১২ মার্চ, ২০২৬ছবি: পিআইডি

রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন সম্ভবত এক বিরল উদাহরণ। তিনি তিন বছরের মধ্যে তিনটি ভিন্ন সরকারের রাষ্ট্রপতি এবং তিন সরকারের সময়েই তাদের প্রশংসা করে বক্তব্য দিয়েছেন। অথচ সরকারগুলো একই রাজনৈতিক ধারার নয়।

মো. সাহাবুদ্দিনকে রাষ্ট্রপতি করেছিল শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার। পরে রক্তক্ষয়ী আন্দোলন ও গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে সেই স্বৈরাচারী সরকারের পতন ঘটে। এরপর অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও সাংবিধানিক ধারাবাহিকতায় রাষ্ট্রপতির দায়িত্বে ছিলেন তিনি। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধানসহ উপদেষ্টাদের শপথ পড়িয়েছিলেন তিনি। এমনকি ফ্যাসিবাদী সরকারের পতনের আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া ছাত্রনেতাদের মধ্যে যাঁরা অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা হন, তাঁদের শপথও পড়িয়েছিলেন। অথচ এই ছাত্রনেতারা শুরু থেকেই তাঁর অপসারণ দাবি করে আসছিলেন।

রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন যখন ফ্যাসিবাদী সরকারের কথা বলছিলেন, তখন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানসহ বিএনপির সংসদ সদস্যদের টেবিল চাপড়ে সমর্থন করতে দেখা যায়। তবে রাষ্ট্রপতির ভাষণের সময় জামায়াত ও এনসিপি ওয়াকআউট করে বেরিয়ে যায়।

গত ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিপুল জয়ের মাধ্যমে সরকার গঠন করেছে বিএনপি। সংসদে বিরোধী আসনে বসেছে জামায়াতে ইসলামী ও জুলাই অভ্যুত্থানে নেতৃত্বদানকারী ছাত্রদের দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। তিন বছর আগে যে দল মো. সাহাবুদ্দিনকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত করেছিল, সেই আওয়ামী লীগের কার্যক্রম এখন নিষিদ্ধ।

এই নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্যেই ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশনে রাষ্ট্রপতির ভাষণ আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে।

২০২৩ সালের ২০ মে বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন গণ–অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা
ফাইল ছবি

যে রাষ্ট্রপতিকে দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগ সরকারের অনুগত হিসেবেই দেখা হয়েছে, তাঁর ভাষণে এবার ভিন্ন সুর। তিনি জিয়াউর রহমানকে স্বাধীনতার ঘোষক বলেছেন এবং গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে বেগম খালেদা জিয়ার আপসহীন ভূমিকাকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেছেন।

একসময় শেখ হাসিনা সরকারের প্রশংসায় যাঁকে সক্রিয় দেখা যেত, সেই রাষ্ট্রপতি এবার ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানকে দেশের গণতন্ত্রের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। শেখ হাসিনার শাসনকে ফ্যাসিবাদী হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, তৎকালীন ফ্যাসিস্ট সরকারের পতন ঘটে এবং হাজারো শহীদের রক্তের বিনিময়ে নতুন গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের সূচনা হয়েছে। দীর্ঘ দেড় দশকের শাসনামলে গুম, খুন, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড এবং ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে নির্যাতন-নিপীড়নের কথাও উল্লেখ করেছেন ভাষণে।

রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন যখন ফ্যাসিবাদী সরকারের কথা বলছিলেন, তখন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানসহ বিএনপির সংসদ সদস্যদের টেবিল চাপড়ে সমর্থন করতে দেখা যায়। তবে রাষ্ট্রপতির ভাষণের সময় জামায়াত ও এনসিপি ওয়াকআউট করে বেরিয়ে যায়।

২০২৪ সালের বিতর্কিত ওই নির্বাচন সম্পর্কে তখন রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন বলেছিলেন, জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের কারণেই নির্বাচন সফল হয়েছে এবং সরকার ও নির্বাচন কমিশনের পদক্ষেপ সার্থক হয়েছে। তখন তিনি বক্তৃতা শেষ করেছিলেন, ‘জয় বাংলা’ বলে। এবার শেষ করেছেন ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’ বলে।

রাষ্ট্রপতির এই বক্তব্যের সঙ্গে দুই বছর আগের অবস্থানের তীব্র বৈপরীত্য রয়েছে। তিনি ২০২৪ সালের ৩০ জানুয়ারি দ্বাদশ সংসদের প্রথম অধিবেশনে ভাষণ দিয়েছিলেন। তখন তিনি ৭ জানুয়ারির নির্বাচন বর্জনকারী দলগুলোর তীব্র সমালোচনা করেছিলেন। বিএনপি ও জামায়াতকে ইঙ্গিত করে বলেছিলেন, একটি মহল সহিংসতা সৃষ্টি করে গণতন্ত্রের যাত্রাপথে বাধা দেওয়ার অপচেষ্টা চালিয়েছে।

২০২৪ সালের বিতর্কিত ওই নির্বাচন সম্পর্কে তখন রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন বলেছিলেন, জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের কারণেই নির্বাচন সফল হয়েছে এবং সরকার ও নির্বাচন কমিশনের পদক্ষেপ সার্থক হয়েছে। তখন তিনি বক্তৃতা শেষ করেছিলেন, ‘জয় বাংলা’ বলে। এবার শেষ করেছেন ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’ বলে।

রাষ্ট্রপতির ভাষণ নিয়ে বিতর্কের একটি কারণ হলো, এর প্রকৃতি। সাধারণত এই ভাষণ রাষ্ট্রপতি নিজে লেখেন না; এটি সরকার বা মন্ত্রিসভা প্রস্তুত করে। রাষ্ট্রপতি সংসদে তা পাঠ করেন এবং পরে সেই ভাষণের ওপর সংসদে আলোচনা হয়; কিন্তু এবারের সংসদ গঠিত হয়েছে এক ভিন্ন রাজনৈতিক বাস্তবতায়। বহু প্রাণের বিনিময়ে ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসান ঘটেছে। রাষ্ট্রের মৌলিক পরিবর্তনের প্রত্যাশা নিয়ে এই সংসদের যাত্রা।

সংসদ নেতা তারেক রহমানও বলেছেন, জাতীয় সংসদ হবে রাষ্ট্রের সব কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু। ফলে প্রশ্ন উঠছে, রাষ্ট্রপতির ভাষণ কি কেবল সরকারের লেখা বক্তব্যই থাকবে, নাকি সেখানে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদধারীর নিজস্ব অবস্থানের প্রতিফলনও থাকবে?

রাষ্ট্রপতির ভাষণ নিয়ে বিতর্কের একটি কারণ হলো, এর প্রকৃতি। সাধারণত এই ভাষণ রাষ্ট্রপতি নিজে লেখেন না; এটি সরকার বা মন্ত্রিসভা প্রস্তুত করে। রাষ্ট্রপতি সংসদে তা পাঠ করেন এবং পরে সেই ভাষণের ওপর সংসদে আলোচনা হয়; কিন্তু এবারের সংসদ গঠিত হয়েছে এক ভিন্ন রাজনৈতিক বাস্তবতায়।

মো. সাহাবুদ্দিনকে রাষ্ট্রপতি করা নিয়ে শুরু থেকেই আলোচনা-সমালোচনা ছিল। তিনি ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল দেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন। এর আগে ২০০৬ সালে জেলা ও দায়রা জজ পদ থেকে অবসরে যান এবং ২০১১ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কমিশনার ছিলেন।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসকে শপথ পড়ান রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। ৮ মার্চ, ২০২৪
ফাইল ছবি

দুদকে দায়িত্ব পালনকালে তাঁর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ছিল। পরে তিনি দেশে আর্থিক খাতে কেলেঙ্কারির জন্য বহুল আলোচিত এস আলম গ্রুপ-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান জেএমসি বিল্ডার্সের প্রতিনিধি হিসেবে ইসলামী ব্যাংকের পরিচালক ও ভাইস চেয়ারম্যান হন। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর জেএমসি বিল্ডার্সের শেয়ার বাংলাদেশ ব্যাংক জব্দ করে রেখেছে। এ ছাড়া তিনি এস আলম-সংশ্লিষ্ট এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংকেরও উপদেষ্টা ছিলেন।

ফলে তাঁকে রাষ্ট্রপতি করার পর কোনো কোনো মহলে এমন আলোচনাও ছিল যে ‘এটা এস আলমের রাষ্ট্রপতি’। তাঁকে রাষ্ট্রপতি করাটা তখন আওয়ামী লীগের নেতা–মন্ত্রীদের জন্যও বিরাট বিস্ময় ছিল। আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতারাও রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের বিষয়ে অন্ধকারে ছিলেন। পরে আওয়ামী লীগের ভেতরে আলোচনা ছিল, মো. সাহাবুদ্দিন দুই বোন—শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানার পছন্দে রাষ্ট্রপতি হয়েছেন।

সাংবিধানিক ধারাবাহিকতার কারণে মো. সাহাবুদ্দিন এখনো রাষ্ট্রপতির দায়িত্বে আছেন। তবে তাঁকে বিএনপি সরকার কত দিন রাখবে, সে প্রশ্নও উঠেছে। সংসদ বসার আগেই এনসিপি তাঁর অভিশংসনের দাবি তুলেছিল।

রাষ্ট্রপতির ভাষণ সাধারণত সংসদের আনুষ্ঠানিক সূচনা; কিন্তু এবারের ভাষণ রাজনৈতিক বিতর্কেরও কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। প্রশ্ন উঠছে, রাষ্ট্রপতির ভাষণ কেবল আনুষ্ঠানিকতা হয়েই থাকবে? রাষ্ট্রপতির ভাষণের এই ধারা কি চলতেই থাকবে? এতে কি মহান জাতীয় সংসদের মর্যাদা বাড়ে?

গতকাল সংসদে এনসিপির আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেন, কোনো ফ্যাসিস্ট বা তাঁর দোসর যেন বক্তব্য দিয়ে সংসদকে কলুষিত করতে না পারেন।
তবে এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিন্ন প্রতিক্রিয়াও দেখা গেছে। গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব আব্দুন নূর তুষার গতকাল ফেসবুকে এক পোস্টে রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনের কাছে উপদেষ্টা হিসেবে নাহিদ ইসলাম ও আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া শপথ নেওয়ার ছবি দিয়ে লিখেছেন, ‘উপদেষ্টা হবার কালে-দোসর ভালো লাগে-এখন লাগে না।’

স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ রাষ্ট্রপতিকে ভাষণ প্রদানের জন্য আমন্ত্রণ জানালে বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা প্রতিবাদী বক্তব্যসংবলিত প্ল্যাকার্ড হাতে নিয়ে বিক্ষোভ করেন। ১২ মার্চ, ২০২৬
ছবি: বিটিভির সৌজন্যে

জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান এই রাষ্ট্রপতিকে ‘ফ্যাসিস্টের দোসর’ ও ‘খুনির দোসর’ হিসেবে আখ্যায়িত করে বলেছিলেন, তিনি ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিয়েছিলেন। সেই ভাষণে তিনি বলেছিলেন যে তৎকালীন ফ্যাসিস্ট প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করেছেন এবং তিনি তা মঞ্জুর করেছেন। পরবর্তী সময়ে দুইটা গণমাধ্যমে সাক্ষাৎকারে তিনি তা অস্বীকার করেছেন। নতুন গল্প সামনে নিয়ে এসেছেন। তিনি জাতির সামনে মিথ্যাবাদী হিসেবে সাব্যস্ত হয়েছেন।

রাষ্ট্রপতির ভাষণ সাধারণত সংসদের আনুষ্ঠানিক সূচনা; কিন্তু এবারের ভাষণ রাজনৈতিক বিতর্কেরও কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। প্রশ্ন উঠছে, রাষ্ট্রপতির ভাষণ কেবল আনুষ্ঠানিকতা হয়েই থাকবে? রাষ্ট্রপতির ভাষণের এই ধারা কি চলতেই থাকবে? এতে কি মহান জাতীয় সংসদের মর্যাদা বাড়ে?