গণভোটের রায় বাস্তবায়নে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের আহ্বান

নাগরিক ঐক্যের ১৪তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আলোচনা সভায় অংশ নেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারাছবি: প্রথম আলো

গণভোটে জনগণ রাষ্ট্র সংস্কারের পক্ষে রায় দিলেও সরকার তা বাস্তবায়নের পথে এগোচ্ছে না বলে অভিযোগ করেছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা। তাঁরা বলেন, জনগণের প্রত্যাশা পূরণে দ্রুত সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করে গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করতে হবে।

শনিবার রাজধানীর কাকরাইলে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনের মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি মিলনায়তনে নাগরিক ঐক্যের ১৪তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আলোচনা সভায় অংশ নিয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা এসব কথা বলেন।

এ সময় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে দলীয়করণ এবং জাতীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে সংসদের কার্যকর ভূমিকা নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন বিভিন্ন দলের নেতারা।

আলোচনা সভায় বাংলাদেশের রাজনীতিবিদদের ধৈর্য নেই বলে মন্তব্য করেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আবদুল মঈন খান। তিনি বলেন, বাংলাদেশের রাজনীতি পরিচালনা সহজ নয়। এ দেশের মানুষ অত্যন্ত আবেগপ্রবণ এবং কোনো সংকট দেখা দিলে দ্রুত ধৈর্য হারিয়ে ফেলেন। ফলে রাজনৈতিক নেতৃত্বের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হচ্ছে ধৈর্য, সংলাপ ও সমন্বয়ের মাধ্যমে সংকট মোকাবিলা করা।

মঈন খান বলেন, ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের আগে দীর্ঘদিন বিভিন্ন রাজনৈতিক দল একসঙ্গে আন্দোলন করেছে। সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে রাজনৈতিক দলগুলো যদি পারস্পরিক আস্থা ও সমন্বয়ের মাধ্যমে এগোয়, তাহলে দেশের সংকট মোকাবিলা সহজ হবে।

সভাপতির বক্তব্যে নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, নাগরিক ঐক্য প্রতিষ্ঠার পর থেকেই একটি কল্যাণ রাষ্ট্র গড়ার লক্ষ্য নিয়ে রাজনীতি করছে। ক্ষমতায় যাওয়া নয়, মানুষের মর্যাদাপূর্ণ জীবন নিশ্চিত করাই রাজনীতির মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত। তিনি বলেন, কল্যাণ রাষ্ট্র সেই রাষ্ট্র, যেখানে জনগণের কল্যাণই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পাবে। মানুষের জীবনে যদি স্বস্তি না আসে, তাহলে রাজনৈতিক পরিবর্তনেরও কোনো অর্থ থাকে না।

জুলাই সনদ অক্ষরে অক্ষরে পালন করার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন বাংলাদেশ বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক। তিনি বলেন, গণভোটের ব্যাপারে আপনারা ক্যাম্পেইন করেছেন, ‘হ্যাঁ’ এর জন্য ক্যাম্পেইন করেছেন। সংবিধান সংস্কার পরিষদ হবে; বিল আকারে আইন হবে। তারপরে দেখলাম, সেটাকে আপনারা প্রত্যাহার করে নিলেন।

বাংলাদেশ বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সতর্ক করে বলেন, ‘এটার অভিঘাত এখনই বোঝা যাবে না, আগামী কয়েক মাস পরে বোঝা যাবে। ফলে বিএনপিকে, যেটা আপনারা বলেছেন, আমরা বিশ্বাস রাখতে চাই—জুলাই সনদ অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন করবেন।’

চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডরের মতো জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সংসদে আলোচনা ও অনুমোদনের মাধ্যমেই সিদ্ধান্ত হওয়া উচিত বলে মনে করেন সাইফুল হক। তিনি বলেন, একইভাবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তিও সংসদে উত্থাপন করে জনসমক্ষে আলোচনা করা প্রয়োজন। বাংলাদেশ কোনো পরাশক্তির দিকে ঝুঁকে পড়তে পারে না। জাতীয় স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব ও মর্যাদা রক্ষার ভিত্তিতেই পররাষ্ট্রনীতি পরিচালিত হওয়া উচিত।

গণভোট প্রসঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও সংসদ সদস্য রফিকুল ইসলাম খান বলেন, গণভোটে ৭০ শতাংশ মানুষ সংস্কারের পক্ষে রায় দিলেও সরকার পরে গণভোট-সংক্রান্ত অধ্যাদেশ বাতিল করেছে। জনগণের এই রায় একসময় বাস্তবায়ন করতেই হবে।

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদস্যসচিব ও সংসদ সদস্য আখতার হোসেন বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় রাজনৈতিক দলগুলো রাষ্ট্র সংস্কার নিয়ে ঐকমত্য কমিশনে আলোচনা করেছিল। পরে গণভোটে অধিকাংশ মানুষ পরিবর্তনের পক্ষে রায় দিলেও সরকার ক্ষমতায় এসে সেই রায় বাস্তবায়নের পরিবর্তে তা উপেক্ষা করেছে।

আখতার হোসেন বলেন, বাংলাদেশের প্রতে৵ক নাগরিক, যাঁরা গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে ভোট দিয়েছেন, তাঁরা এখন সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের অপেক্ষায় আছেন। জনগণের রায় বাস্তবায়নের মধ্য দিয়েই কাঙ্ক্ষিত রাষ্ট্রসংস্কার সম্পন্ন করতে হবে।