জুলাই আন্দোলনের ‘ট্রফি’ লন্ডনে গিয়ে বিএনপিকে দিয়ে আসেন অধ্যাপক ইউনূস: স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী

সংসদে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া

দেশের আন্দোলন-সংগ্রামে বিএনপিকে বিজয়ী দল হিসেবে তুলে ধরলেন স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম। তিনি বলেছেন, ১৯৭১, ১৯৯০ ও ২০২৪ তিনটি আন্দোলনের ‘ট্রফি’ই বিএনপির ঘরে। এর মধ্যে ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের ‘ট্রফি’ লন্ডনে গিয়ে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল।

আজ মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে এ কথা বলেন শাহে আলম। সকাল সাড়ে ১০টায় স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে সংসদের অধিবেশন শুরু হয়।

বগুড়া থেকে নির্বাচিত হয়ে আসা মীর শাহে আলম আন্দোলন-সংগ্রামে বিএনপির অবদান তুলে ধরতে গিয়ে বলেন, ‘১৯৭১, ১৯৯০ এবং জুলাই-আগস্ট, তিনটি আন্দোলনের ট্রফিই আমাদের ঘরে। এ রকম ট্রফি শুধু বিএনপির ঘরে, অন্য কোনো রাজনৈতিক দল দেখাতে পারবে না। আওয়ামী লীগ একাত্তর ও নব্বইয়ের কথা বলতে পারবে। কিন্তু জুলাই-আগস্টের ট্রফি তাদের নেই। বিরোধী দলের বন্ধুরা জুলাই-আগস্ট বলতে পারবে, কিন্তু একাত্তর ও নব্বইয়ের কথা বলতে পারবে না।’

এ সময় বিরোধীদলীয় সদস্যরা হইচই শুরু করলে প্রতিমন্ত্রী বলেন, বিরোধী দলের এমপিরা হইচই করতে পারেন, তাঁরা নব্বইয়ের কথা বলতে পারেন। ১৯৮৬ সালের নির্বাচনে ঢাকঢোল পিটিয়ে তাঁরাই আওয়ামী লীগের সঙ্গে নির্বাচনে গিয়েছিলেন।

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে বিএনপি বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন করে। সংসদে বিরোধী দলের আসন নিয়েছে জামায়াতে ইসলামী এবং জুলাই গণ–অভ্যুত্থানে সামনের কাতারে থাকা তরুণদের গড়া দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। দল দুটি একই মোর্চার হয়ে নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল।

প্রতিমন্ত্রী শাহে আলম বলেন, এনসিপির এক নেতা বাইরে বলেছিলেন, ‘জুলাই আন্দোলনে ছাত্র-জনতা খেলেছে, আর ট্রফি নিয়েছে বিএনপি।’

এ সময় বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা আরও হইচই করতে থাকলে শাহে আলমের বক্তব্য না দেওয়ার অনুরোধ জানান স্পিকার।

বিরোধীদলীয় নেতা, জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান এ সময় প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যের কিছু বক্তব্য ‌‘অসত্য’ দাবি করে তা সংসদের কার্যবিবরণী থেকে বাদ (এক্সপাঞ্জ) দেওয়ার আহ্বান জানান।

এ পর্যায়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে ছাত্র-জনতার সঙ্গে আমরা সবাই ছিলাম। ট্রফি আমরা কারও কাছে নিতে যাইনি। ক্যাপ্টেন কে? সেটা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনূস ছিলেন। এ কারণে উনি লন্ডনে গিয়ে আমাদের ক্যাপ্টেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে ট্রফি দিয়ে নির্বাচনের তারিখ নিয়ে আসেন। এতে প্রমাণিত হয়, ছাত্র-জনতার আন্দোলনের নেতৃত্বে মূল ভূমিকা কোন দলের ছিল, কোন নেতার ছিল।’

প্রতিমন্ত্রী শাহে আলম আরও বলেন, ‘আমরা সবাই আন্দোলন করেছি, এটা অস্বীকার করার সুযোগ নাই। কিন্তু ক্যাপ্টেন একজনই থাকেন, সে ক্যাপ্টেনের কাছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান লন্ডনে গিয়ে আলোচনা করে নির্বাচনের তারিখ নিয়ে আসছেন বলেই এ দেশে একটি অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচন হয়েছে।’

সংসদ অধিবেশন পরিচালনাকারী খেতাবপ্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা হাফিজ উদ্দিন আহমদের উদ্দেশে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘আপনাকে দেখলে এখানে অনেকের ভালো লাগবে, কারও কারও ভালো লাগবে না। কিন্তু আপনি ১৯৭১ সালকে প্রতিনিধিত্ব করছেন। এই ক্রেডিট বিএনপির। কারণ, স্বাধীনতার ঘোষক রাষ্ট্রপতি শহীদ জিয়াউর রহমান।’

এ পর্যায়ে শাহে আলম সরকারি দলের বেঞ্চে উপস্থিত থাকা কয়েকজনের নাম উল্লেখ করে বলেন, যেটি বিরোধী দলের বেঞ্চের মধ্যে খুঁজে পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

এ সময় বিরোধী দলের সদস্যরা আবার প্রতিবাদমুখর হয়ে ওঠেন।

তখন স্পিকার বলেন, ‘বিরোধী দলের বেঞ্চেও মুক্তিযোদ্ধা রয়েছেন। আমি নিজেও মাঠে থেকে দেখেছি, গাজী নজরুল ইসলাম (সাতক্ষীরা-৩) একজন মুক্তিযোদ্ধা।’

এরপর জামায়াতের উদ্দেশে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘বেগম খালেদা জিয়া বিরোধী দলের এমপিদের গাড়িতে পতাকা দিয়ে দায়মুক্তি দিয়ে সরকারের অংশ করে জাতির কাছে সম্মানিত করেছে। সে কথা তো একবারও বলেন না।’

২০০১ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারে জামায়াতের তৎকালীন আমির মতিউর রহমান নিজামী ও সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মো. মুজাহিদকে মন্ত্রী করা হয়েছিল। তাঁরা দুজনই আওয়ামী লীগ সরকার আমলে একাত্তরের যুদ্ধাপরাধের বিচারে দোষী সাব্যস্ত হয়ে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হন।

বিএনপির সংসদ সদস্য শাহে আলম বলেন, ‘২০১৪ সালের পর আপনাদের আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। দীর্ঘদিন যাবৎ আমরা চারদলীয় জোট, ২০–দলীয় জোটে একসঙ্গে ছিলাম। একে অপরকে বহুভাবে চিনি। একই মিটিংয়ে বসে আন্দোলন, লড়াই করেছি, সমাবেশ করেছি। কিন্তু কোনো এক অজানা কারণে আপনারা গুপ্ত হয়ে জুলাই-আগস্টের পরে প্রকাশ্য এসে জাতির সামনে বারবার জুলাই-আগস্টকে ধারণ করে ভুল বোঝাতে চাচ্ছেন। আপনারা জুলাই-আগস্টকে এমনভাবে ধারণ করতে চান, মনে হয় ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ হয়নি, নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন হয়নি।’

২০২৫ সালের জুন মাসে তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে ডরচেস্টার হোটেলে তারেক রহমানের বৈঠক হয়েছিল
ফাইল ছবি: তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং

প্রতিমন্ত্রী ২০১৪ সালের পর জামায়াতকে খুঁজে পাওয়া যায়নি বললেও ২০১৮ সালে একাদশ সংসদ নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের হয়ে অংশ নিয়েছিলেন বর্তমান বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমানসহ জামায়াতের নেতারা। তখন জামায়াতের নিবন্ধন বাতিল ছিল বলে তাঁরা নির্বাচন করেছিলেন বিএনপির ধানের শীষ প্রতীকে।

বক্তব্যের শেষ দিকে সরকার পরিচালনায় বিরোধী দলের সহযোগিতা চেয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা ঐক্যবদ্ধভাবে দেশকে এমন পর্যায়ে নিয়ে যেতে চাই, যাতে মানুষ মনে করে একসময়কার জোটবদ্ধ বিএনপি-জামায়াত যদিও আজকে আলাদা আলাদা, কিন্তু তারা আবার ভেতরে ভেতরে এক হয়ে দেশকে ভালো জায়গায়, সুন্দর জায়গায় নিয়ে গেছে।’

প্রতিমন্ত্রী অসত্য তথ্য দিয়েছেন: বিরোধীদলীয় নেতা

প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্য শেষে বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান বক্তব্য দিতে দাঁড়ান। তিনি বলেন, ‘আমরা প্রথম দিনই অঙ্গীকার করেছি, এই বিরোধী দল গতানুগতিক বিরোধী দল হবে না। ন্যায়সংগত সব কাজে সহযোগিতা এবং অন্যায়, জন–অধিকার হরণকারী সব পদক্ষেপে কণ্ঠ থাকবে আপসহীন।’

প্রতিমন্ত্রী শাহে আলমের বক্তব্যের প্রসঙ্গে শফিকুর রহমান বলেন, ‘আজকে মাননীয় সংসদ সদস্য (মীর শাহে আলম) রাষ্ট্রপতিকে ধন্যবাদ জানাতে গিয়ে আমাদের জেরবার করে ফেলেছেন। অসংখ্য অসত্য তথ্য এখানে এসেছে। দুই-একটার প্রতিবাদ আপনি (স্পিকার) নিজেও করেছেন। আমাদের দাবি, অসত্য কোনো তথ্য যাতে সংসদে কেউ পরিবেশন না করেন।’

প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যের কিছু অংশ শফিকুর রহমান কার্যপ্রণালি থেকে বাদ দেওয়ার আহ্বান জানালে স্পিকার বলেন, ‘আমি বক্তব্য পরীক্ষা করে দেখব। সেখানে কোনো অসংসদীয় এবং অসত্য তথ্য থাকলে এক্সপাঞ্জ করা হবে।’

এরপর জামায়াতের নেতা শাহজাহান চৌধুরী বক্তব্য দিতে দাঁড়ালে স্পিকার অতীত ভুলে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, এ বিষয়ে আলোচনার জন্য আরও ৫০ ঘণ্টা সময় রয়েছে, যেখানে সদস্যরা তাঁদের পাল্টাপাল্টি যুক্তি উপস্থাপনের সুযোগ পাবেন।