একটি দল নারীদের ঘরের ভেতর আটকে রাখতে চায় বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, ‘একটি রাজনৈতিক দল বাংলাদেশের অর্ধেক নারী গোষ্ঠীকে ঘরে আটক রাখতে চায়, সেই কথা তারা বলেছে। একটি রাজনৈতিক দলের নেতা পরিষ্কার বলে দিয়েছেন, তারা কোনোভাবেই নারীর নেতৃত্বে বিশ্বাস করে না।’
গতকাল দুপুরে খুলনা নগরের খালিশপুরের প্রভাতি স্কুল মাঠে নির্বাচনী জনসভায় তারেক রহমান এ কথা বলেন। জামায়াতকে ইঙ্গিত করে কথাগুলো বলা হলেও তিনি দলটির নাম উল্লেখ করেননি।
দীর্ঘ ২২ বছর পর খুলনায় এলেন বিএনপির চেয়ারম্যান। গতকাল দুপুর সাড়ে ১২টায় তিনি খালিশপুরের প্রভাতি স্কুল মাঠে পৌঁছান। মঞ্চে উঠলে নেতা-কর্মী ও সমর্থকেরা করতালি দিয়ে তাঁকে স্বাগত জানান। তারেক রহমান হাত নেড়ে শুভেচ্ছার জবাব দেন। প্রায় ২৭ মিনিট বক্তব্য দেন তিনি।
কারও নাম উল্লেখ না করে জনসভায় তারেক রহমান বলেন, ‘আমরা দেখেছি, একটি রাজনৈতিক দলের নেতা দুই দিন আগে পরিষ্কারভাবে বলেছেন, যে সকল মহিলা, যে সকল মা-বোন কর্মসংস্থানের জন্য যান, আপনাদের সামনে বলতে রীতিমতো লজ্জা হচ্ছে, এমন একটি শব্দ মা-বোনদের জন্য ব্যবহার করেছেন, যা এ দেশের জন্য কলঙ্কস্বরূপ।’
বিএনপির চেয়ারম্যান আরও বলেন, ‘আমরা খেয়াল করছি, একটা মহল বলার চেষ্টা করছে এবার ভোট গণনায় অনেক সময় লাগবে। ষড়যন্ত্র কিন্তু আবার শুরু করেছে। এই যে যাদের কথা বলেছি, প্রথমে যারা জনগণের সামনে সকাল-বিকেল মিথ্যে কথা বলছে, যারা দেশের নারী সমাজকে হেয়প্রতিপন্ন করছে। এরাই আবার ষড়যন্ত্র শুরু করেছে বিভিন্নভাবে। কারণ, তারা জানে, তাদের এসব কথাবার্তা, কাজকর্ম এসব ফাঁকিজুঁকি মানুষ ধরে ফেলেছে। সে জন্য তারা বিভিন্ন ছলচাতুরীর চেষ্টা করছে। সে জন্য দল-মত-ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে আমাদের সতর্ক থাকতে হবে।’
বর্তমানে একমাত্র বিএনপির দেশ পরিচালনার অভিজ্ঞতা রয়েছে উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, ‘যেহেতু বিএনপির দেশ পরিচালনার অভিজ্ঞতা আছে, বিএনপির পক্ষেই সম্ভব বাংলাদেশকে সঠিক পথে পরিচালনা করার। একই সঙ্গে বিএনপির আরেকটি অভিজ্ঞতা আছে কীভাবে দেশকে দুর্নীতির করাল গ্রাস থেকে বের করে নিয়ে আসতে হয়।’
প্রশ্ন রেখে তারেক রহমান বলেন, ‘বাংলাদেশের লাখ লাখ নারী পোশাকশিল্পে কাজ করে দেশের অর্থনীতি সচল রেখেছেন। নিম্নমধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারের নারীরা দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে সংসার চালাতে স্বামীর পাশাপাশি বিভিন্ন কাজ করছেন। অথচ তাঁদেরই আজ অসম্মানিত করা হয়েছে।’
এ সময় তারেক রহমান মহানবী (সা.)-এর স্ত্রী হজরত বিবি খাদিজা (রা.) একজন সফল ব্যবসায়ী ছিলেন বলে উল্লেখ করেন বিএনপির চেয়ারপারসন। তিনি বলেন, ‘যে দলটি নির্বাচনের আগে দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠীকে ঘরের মধ্যে বন্দী করতে চায়, অসম্মানজনকভাবে কথা বলে, নির্বাচনে যদি কোনোভাবে তারা সুযোগ পায়, নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে তাদের আচরণ তাহলে কী হতে পারে!’
প্রসঙ্গত, জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমানের এক্স পোস্টে কর্মজীবী নারীদের নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। তবে জামায়াতের দাবি, শফিকুরের এক্স অ্যাকাউন্ট হ্যাক করে ওই পোস্ট দেওয়া হয়েছে। এ ঘটনায় দলটি শনিবার দিবাগত রাতে রাজধানীর হাতিরঝিল থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছে।
বিএনপির চেয়ারম্যান বলেন, ‘যখন নারী সমাজে তীব্র সমালোচনা শুরু হলো, সমাজের প্রত্যেকটি মানুষের কাছ থেকে সমালোচনা শুরু হলো, তখন তারা বলছে, তাদের আইডি হ্যাক হয়ে গিয়েছিল। এই বিষয়ের বিশেষজ্ঞ পরিষ্কারভাবে বলেছে—আইডি এভাবে হ্যাক হতে পারে না।...এদের একটাই পরিচয়, এরা মিথ্যাবাদী। এরা নিজেদের প্রয়োজনে নিজেদের স্বার্থে এরা মিথ্যা কথা বলে। এরা আর যা-ই হোক দেশদরদি হতে পারে না।’
জামায়াতে ইসলামীর উদ্দেশে তারেক রহমান আরও বলেন, ‘এরা (জামায়াতে ইসলামী) শুধু নিজের স্বার্থের কথা বোঝে। এরা ধর্মকে ব্যবহার করে নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করার জন্য। যেখানে প্রয়োজন সেখানে তারা তাদের মতো করে ধর্মকে ব্যবহার করে। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের জনসংখ্যা প্রায় ২০ কোটি। এর মধ্যে অন্তত ১০ কোটি নারী। এই বিশাল নারী সমাজকে পেছনে রেখে যত বড় পরিকল্পনাই করা হোক না কেন, দেশকে সামনে নেওয়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়। বিএনপি সরকার গঠন করলে প্রত্যেক গৃহিণীর কাছে “ফ্যামিলি কার্ড” পৌঁছে দেবে। এই কার্ডের মাধ্যমে নারীদের ধীরে ধীরে স্বাবলম্বী করে তোলা হবে, যাতে নারী সমাজ কারও মুখাপেক্ষী হয়ে না থাকে।’
খুলনা অঞ্চলের উন্নয়ন প্রসঙ্গে বিএনপির চেয়ারম্যান বলেন, বিএনপি সরকার গঠন করলে এই অঞ্চলকে আবার জীবন্ত শিল্পনগরীতে রূপান্তর করা হবে, নারী-পুরুষ উভয়ের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা হবে।
জনসভার শেষ পর্যায়ে খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরার ১৪ জন বিএনপির প্রার্থীর হাতে ধানের শীষ তুলে দিয়ে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান তারেক রহমান।
‘আপনাদের অত্যন্ত সতর্ক ও সজাগ থাকতে হবে’
খুলনায় জনসভায় ভাষণ দেওয়ার পর যশোরে আসেন তারেক রহমান। যশোর উপশহর ডিগ্রি কলেজ মাঠে আয়োজিত নির্বাচনী জনসভায় তিনি বলেন, ‘নির্বাচনকে বিতর্কিত ও বাধাগ্রস্ত করতে একটি রাজনৈতিক দল উঠেপড়ে লেগেছে। আপনাদের অত্যন্ত সতর্ক ও সজাগ থাকতে হবে।’
জনসভায় তারেক রহমান এ অঞ্চলের সাত জেলার বিএনপির ২২ জন প্রার্থীকে পরিচয় করিয়ে দিয়ে ধানের শীষে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান।
বেলা আড়াইটায় মঞ্চে ওঠেন বিএনপির এই শীর্ষ নেতা। তখন স্লোগান আর মুহুর্মুহু করতালিতে সভাস্থল প্রকম্পিত হয়ে ওঠে। জনতার উদ্দেশে হাত নেড়ে তিনি অভিবাদন গ্রহণ করেন। ৩২ মিনিট ভাষণ দেন তারেক রহমান।
এ জনসভায় দেওয়া ভাষণেও তারেক রহমান জামায়াতের আমিরের এক্স অ্যাকাউন্টে দেওয়া নারী অবমাননাকর পোস্টের উল্লেখ করে সমালোচনা করেন। উপস্থিত জনতার উদ্দেশে তারেক রহমান আরও বলেন, ‘যারা দেশের মানুষের কাছে মিথ্যা কথা বলে, তারা বিকাশ নম্বর নিচ্ছে। এটাই তাদের ক্যারেক্টার (চরিত্র)। তাদের বিষয়ে সজাগ থাকতে হবে। তাদের ভূমিকার কারণে একাত্তর সালে লাখ লাখ মা-বোন ইজ্জত হারিয়েছে। জনগণকে সঙ্গে নিয়ে তাদের ষড়যন্ত্র রুখে দিতে হবে।’
জামায়াতে ইসলামীকে ইঙ্গিত করে বিএনপির চেয়ারম্যান বলেছেন, ‘তারা বলে সৎ লোকের শাসন কায়েম করবে। আরে ভাই, এটাই তো অসৎ প্রস্তাব। কীভাবে আপনারা মনে করেন যে অসৎ প্রস্তাব দিয়ে সৎ লোকের শাসন কায়েম করবেন।’