জিয়াউর রহমান মুক্তিযুদ্ধের অনিবার্য চরিত্র: প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আজ শুক্রবার বিকেলে মহান স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে রাজধানীর রমনায় ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেনছবি: বাসস

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম অনিবার্য চরিত্র শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। আমরা দেখেছি, অতীতে যেভাবে শহীদ জিয়াউর রহমানকে, তাঁর অবদানকে, তাঁর কাজকে খাটো করার চেষ্টা করা হয়েছে, এর থেকে প্রমাণ হয়েছে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান অবশ্যই বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের অনিবার্য চরিত্র।’

তরুণ প্রজন্মের দৃষ্টি আকর্ষণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান প্রথম জীবনে অবশ্যই একজন রাজনৈতিক কর্মী ছিলেন না, একজন সামরিক সৈনিক ছিলেন। তবে সচেতনভাবেই তিনি স্বাধীনতার চিন্তাচেতনা ধারণ করতেন। একটি স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্ন নিজের মনের মধ্যে গভীরভাবে ধারণ করতেন।’

মহান স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে আজ শুক্রবার বিকেলে রাজধানীর রমনায় ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এ কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সভায় সভাপতিত্ব করেন বিএনপির মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হঠাৎই কিন্তু স্বাধীনতার ঘোষণা দেননি। স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য তাঁর একটি দীর্ঘ মানসিক প্রস্তুতি ছিল। তিনি ছিলেন শুধু অপেক্ষায়।

তারেক রহমান বলেন, ‘শহীদ জিয়া সম্পর্কে আমি যে কথাগুলো বললাম, এগুলো আমার নিজের কথা নয়, কিংবা নিজের মনগড়া বিশ্লেষণ নয়। স্বাধীনতা এবং মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়ার নিজের লেখা “একটি জাতির জন্ম” শীর্ষক নিবন্ধটি এর বড় প্রমাণ।’

তারেক রহমান বলেন, ‘১৯৭২ সালের ২৬ মার্চ বাংলাদেশের প্রথম স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে অধুনালুপ্ত দৈনিক বাংলা পত্রিকার বিশেষ ক্রোড়পত্রে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়ার লেখা নিবন্ধটি প্রকাশিত হয়েছিল। বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান কীভাবে দীর্ঘদিন থেকে মানসিক প্রস্তুতি নিয়েছিলেন, এর বিস্তারিত এবং ধারাবাহিক একটি বর্ণনা প্রকাশিত নিবন্ধে লেখা রয়েছে।’

জিয়ার নিজের লেখা ‘একটি জাতির জন্ম’ নিবন্ধটির শেষ প্যারার কিছু অংশ তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান লিখেছেন—‘তখন রাত ২টা বেজে ১৫ মিনিট। ২৬ মার্চ। ১৯৭১ সাল। রক্তের আখরে আখরে বাঙালির হৃদয়ে লেখা একটি দিন। বাংলাদেশের জনগণ চিরদিন স্মরণ রাখবে এই দিনটিকে; স্মরণ রাখবে, ভালোবাসবে। এই দিনটিকে তারা কোনো দিন ভুলবে না, কোনো দিন না।’

তারেক রহমান বলেন, ‘১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ রাত ২টা বেজে ১৫ মিনিটে কী ঘটেছিল? কিসের পরিপ্রেক্ষিতে তখন কী হয়েছিল? স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস গবেষকদের জন্য এই তথ্যসূত্র ইতিহাসের অনেক বিতর্কের অবসান ঘটাতে পারে বলে আমি বিশ্বাস করি। ১৯৭২ সালে শহীদ জিয়ার লেখা “একটি জাতির জন্ম” নিবন্ধটি যখন প্রকাশিত হয়েছিল, তখন মাত্র মুক্তিযুদ্ধ শেষ হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যক্ষ সাক্ষী প্রায় সবাই বেঁচে ছিলেন। একজন শহীদ জিয়া যিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন, যিনি অস্ত্র হাতে রণাঙ্গনে যুদ্ধ করেছিলেন, তাঁর নিজের অভিজ্ঞতা থেকে তাঁর নিজের লেখা “একটি জাতির জন্ম” লেখাটি আমাদের মুক্তিযুদ্ধের একটি অনন্য দলিল হতে পারে বলে আমি বিশ্বাস করি। কারণ, যুদ্ধ শেষের পর এই প্রবন্ধটি প্রকাশিত হওয়ার পরে কারও পক্ষ থেকে আমরা এমন কোনো আপত্তি পাইনি, যা এ প্রবন্ধটিকে খণ্ডন করে।’

তারেক রহমান বলেন, ‘শহীদ জিয়ার এই প্রবন্ধটি যে শুধু ১৯৭২ সালের ২৬ শে মার্চ প্রকাশিত হয়েছিল, তা নয়, আরেকবার প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৭৪ সালে সাপ্তাহিক বিচিত্রায়। তখনো কারও কোনো আপত্তি ছিল না। শহীদ জিয়া তার লেখায় যা বলেছেন, তা অবিকল ছিল। সেই সময় সরকারে কারা ছিলেন, রাজনৈতিকভাবে কারা কোথায় অবস্থান করছিলেন—আমাদের সবারই ধারণা আছে। কিন্তু সেই সময়ও তৎকালীন সরকার অথবা কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব শহীদ জিয়ার এই প্রবন্ধ বা বক্তব্যকে কোনোভাবেই খণ্ডন করার চেষ্টা করেননি। কারণ, সেই সময় যাঁরা ছিলেন, তাঁরা জানতেন, শহীদ জিয়ার প্রতিটি বাক্য, প্রতিটি শব্দ প্রবন্ধে লিখিত সত্য।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমি আগেও বলেছি, অতীত নিয়ে আমরা সব সময় পড়ে থাকলে আমাদের এক চোখ অন্ধ, আর অতীত ভুলে গেলে আমাদের দুই চোখ অন্ধ। সুতরাং অতীতকে একেবারে ভুলে যাওয়া চলবে না। আবার অতীত নিয়ে পড়ে থাকতে গিয়ে সেটি যেন আমাদের ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাওয়ার পথে বিঘ্ন সৃষ্টির কারণ না হয়ে দাঁড়ায়। কিছুদিন আগেও অতীত নিয়ে অনেক বেশি চর্চা হয়েছে, যা সামনের সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎকে বাধাগ্রস্ত করেছে।’

বক্তব্যের শুরুতেই ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সব শহীদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানসহ বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের সকল জাতীয় নেতৃবৃন্দকে কৃতজ্ঞতা জানাই। সকল বীর মুক্তিযোদ্ধা, আহত ও পঙ্গু মুক্তিযোদ্ধা এবং মুক্তিযুদ্ধকালীন বাংলাদেশের সাহসী জনগণের অবদানকে স্মরণ করছি, যাঁদের অনন্য অবদানে আমাদের স্বাধীন বাংলাদেশ।’

স্বাধীনতা ও ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকে বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে গৌরবজনক অধ্যায় উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, ‘এখানে উপস্থিত আপনাদের অনেকেই সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন, মুক্তিযুদ্ধের সময়কালীন নৃশংসতা প্রত্যক্ষ করেছেন, দুঃখ–দুর্দশা নির্যাতন–নিপীড়নের শিকার হয়েছেন। শেষ পর্যন্ত বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী সেবাবাহিনীকে পরাজিত করে মুক্তিযোদ্ধারা বিজয় ছিনিয়ে এনেছেন। সুতরাং প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম স্বাধীনতার এবং মুক্তিযুদ্ধের গৌরবগাথা নিয়ে আলোচনা হবে, এটা স্বাভাবিক। তবে আলোচনা, সমালোচনা বা গবেষণার নামে এমন কিছু করা বা বলা যাবে না, যা আমাদের স্বাধীনতা বা মুক্তিযুদ্ধের যে গৌরব অথবা ইতিহাস, তাকে কোনোভাবে খাটো করে, মুক্তিযুদ্ধের গৌরবজনক ইতিহাসের অবমূল্যায়ন হয়।’

স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধ কোনো দলের নয়, এটি ছিল ‘জনযুদ্ধ’ উল্লেখ করে বিএনপির চেয়ারম্যান বলেন, ‘বছরের পর বছর, এমনকি যুগের পর যুগ ধরে লড়াই করেও যারা এখনো স্বাধীন হতে পারেননি, একমাত্র তাদের পক্ষেই স্বাধীনতার মূল্য সম্পূর্ণভাবে উপলব্ধি করা সম্ভব। স্বাধীনতার গুরুত্ব এবং তাৎপর্য উপলব্ধি করতে পারছেন স্বাধীনতাকামী ফিলিস্তিনের প্রতিটি মানুষ।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘লাখো প্রাণের বিনিময়ে আমরা ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা অর্জন করেছি, হাজারো প্রাণের বিনিময়ে আমরা ২০২৪ সালে দেশ এবং জনগণের স্বাধীনতা রক্ষা করেছি। প্রতিটি প্রাণেরই একটি স্বপ্ন ছিল, একটি আকাঙ্ক্ষা ছিল। সেই আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের জন্য তারা সাহসের সঙ্গে অধিকার আদায়ের জন্য লড়াই করেছিলেন। নিজের জীবন বিলিয়ে দিয়েছিলেন। ১৯৭১ সাল থেকে আজ পর্যন্ত প্রতিটি আন্দোলন–সংগ্রামে সকল শহীদের আকাঙ্ক্ষা ছিল—সাম্য, মানবিক মর্যাদা এবং সামাজিক ন্যায়বিচারভিত্তিক তাঁবেদারমুক্ত একটি স্বাধীন সার্বভৌম নিরাপদ গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা।’

প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ‘আমাদের আকাঙ্ক্ষা সীমাহীন হলেও সম্পদের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। আমাদের সাধ এবং সাধ্যের মধ্যে ফারাক থাকলেও আমি বিশ্বাস করি, আমরা যদি ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে যাই, তাহলে স্বনির্ভর বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা অসম্ভব নয়। সেই লক্ষ্য পূরণের জন্যই বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকার রাষ্ট্রের বিভিন্ন শ্রেণি–পেশার মানুষকে টার্গেট করে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, খাল খননসহ বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়নের কাজ শুরু করেছে। জনগণের জীবন মানোন্নয়নে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ এবং বাস্তবায়ন শুরু করেছে।’

সমাজের সবাইকে নিয়ে ভালো থাকার অঙ্গীকার করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, ‘সমাজের একটি অংশ নয়, আমরা সবাই মিলে ভালো থাকব, আমরা সবাই মিলে ভালো থাকার চেষ্টা করব এবং ভালো থাকব। আমাদের এবারের স্বাধীনতা দিবসের এটিই হোক অঙ্গীকার।’

আলোচনা সভায় স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন, আবদুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী ও সালাহউদ্দিন আহমদ বক্তব্য দেন।

আলোচনা সভায় আরও অংশ নেন অধ্যাপক ওয়াকিল আহমেদ, অধ্যাপক মাহবুবউল্লাহ, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মামুন আহমেদ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম।