গণ অধিকার পরিষদের দপ্তর সম্পাদককে অব্যাহতি, আসন সমঝোতা নিয়ে ক্ষোভ এবং আরও যা জানা গেল...

বিএনপির সঙ্গে ‘এক’ আসনের সমঝোতা ঘিরে গণ অধিকার পরিষদের ভেতরে অসন্তোষ প্রকাশ্যে এসেছে। দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে সভাপতির আসন সমঝোতা করা, দপ্তর সম্পাদকের নামে সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দেওয়া এবং এ জন্য তাঁকে সাময়িক অব্যাহতির ঘটনাকে কেন্দ্র করে বৃহস্পতিবার দিনভর নানা নাটকীয়তা লক্ষ করা গেছে। গণ অধিকার পরিষদের মধ্যে টানাপোড়েন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে দলটি কার্যত দুটি ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছে বলে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে।

ঘটনার সূত্রপাত বৃহস্পতিবার দুপুরে। দুপুর ১২টা ১৮ মিনিটের দিকে গণমাধ্যমের জন্য খোলা একটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে (গণ অধিকার পরিষদ প্রেস উইং) একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তি পাঠান গণ অধিকার পরিষদের উচ্চতর পরিষদের সদস্য ও গণমাধ্যম সমন্বয়ক আবু হানিফ। সেই সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে স্বাক্ষর ছিল দপ্তর সম্পাদক শাকিল উজ্জামানের।

‘ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে গণ অধিকার পরিষদের অংশগ্রহণ ও জোট/সমঝোতা সংক্রান্ত অবস্থান স্পষ্টীকরণ’ শীর্ষক সেই সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, গত ২২ ডিসেম্বর রাজধানীর কাকরাইলের ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশে (আইডিইবি) গণ অধিকার পরিষদের নির্বাচনী অবস্থান স্পষ্টীকরণ ও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেই সভায় দলের উচ্চতর পরিষদ, কেন্দ্রীয় সংসদ, জেলা প্রতিনিধিবৃন্দ, অঙ্গসংগঠনের নেতৃবৃন্দ এবং মনোনীত প্রার্থীরা উপস্থিত ছিলেন।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, গণ অধিকার পরিষদের সেই সভায় কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে জোট বা আসন সমঝোতায় না গিয়ে এককভাবে নির্বাচন করার সিদ্ধান্ত হয়। এরপর দলের উচ্চতর পরিষদ বা কেন্দ্রীয় পর্যায়ে এ–সংক্রান্ত কোনো নতুন সভা অনুষ্ঠিত হয়নি এবং কোনো নতুন সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়নি। গণ অধিকার পরিষদ কোনো দলের সঙ্গে সমঝোতা বা জোট করেনি। কারও ব্যক্তিগত সমঝোতা থাকলে সেটা দলের সমঝোতা নয়।

এরপর বেলা ২টা ১২ মিনিটের দিকে গণ অধিকার পরিষদের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক হাসান আল মামুন সেই হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে আরেকটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তি লিখে দেন। সেখানে লেখা হয়, দলের সভাপতি এবং সাধারণ সম্পাদকের অনুমতি ব্যতীত প্রেস বিজ্ঞপ্তি দেওয়ায় দপ্তর সম্পাদক শাকিল উজ্জামানকে সাময়িক অব্যাহতি প্রদান করা হয়েছে।

গণ অধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক
ফাইল ছবি: প্রথম আলো

নাম প্রকাশ না করার শর্তে গণ অধিকার পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির একজন নেতা বৃহস্পতিবার রাতে প্রথম আলোকে বলেন, গণ অধিকার পরিষদের উচ্চতর পরিষদকে সর্বময় ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। চাইলে পরিষদের সদস্যরা যেকোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। আসন সমঝোতার বিষয়টি নিয়ে দলের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। অন্য দলগুলোও দলের ডেকোরাম নিয়ে সমালোচনা শুরু করেছে। সে পরিপ্রেক্ষিতে দলের অবস্থান জানাতেই এই সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছে।

এদিকে বেলা ২টা ৩২ মিনিটে সেই হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে আরও একটি বার্তা পাঠান আবু হানিফ। সেখানে হানিফ লেখেন, সংবাদ বিজ্ঞপ্তিটি গণ অধিকার পরিষদের উচ্চতর পরিষদ, নির্বাহী সংসদ, দল মনোনীত সকল প্রার্থী ও অঙ্গসংগঠনসমূহের সম্মিলিত সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে দপ্তর সম্পাদক হিসেবে শাকিল উজ্জামান স্বাক্ষরিত হয়ে প্রকাশিত হয়েছে। দলের কেন্দ্রীয় সম্মিলিত সভার সিদ্ধান্ত দপ্তর থেকে প্রকাশ করা কোনোভাবে অন্যায় নয়; বরং এই প্রেস বিজ্ঞপ্তি অস্বীকার করা অন্যায় এবং এই প্রেস বিজ্ঞপ্তিকে কেন্দ্র করে দপ্তর সম্পাদককে অব্যাহতি দেওয়া চরম অন্যায়।

এর একটু পরে সেই গ্রুপের অ্যাডমিন ও গণ অধিকার পরিষদের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক হাসান আল মামুন সবগুলো মেসেজ মুছে দেন। সেখানে তাঁর দেওয়া শাকিল উজ্জামানের অব্যাহতির মেসেজটিও ছিল।

এরপর সন্ধ্যা ৫টা ১৫ মিনিটে গণ অধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক সেই গ্রুপে তাঁর ফেসবুকে লেখা একটি পোস্টের লিংক পাঠান। সেই পোস্টে লেখা হয়েছে, ‘ভুয়া প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে কেউ বিভ্রান্ত হবেন না। গণ অধিকার পরিষদ ফ্যাসিবাদের কঠিন সময় থেকেই যুগপৎ আন্দোলন থেকেই বিএনপির সঙ্গে ছিল, আছে, আগামীর জাতীয় সরকারেও থাকবে।’

বিকেল ৫টা ২২ মিনিটে দলের প্যাডে একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তি গ্রুপে দেন হাসান আল মামুন। সেখানে লেখা হয়, গণ অধিকার পরিষদ (জিওপি) সভাপতি, সাধারণ সম্পাদকের অনুমতি ব্যতীত দলীয় সিদ্ধান্তের নামে প্রেস বিজ্ঞপ্তি দিয়ে জনমনে বিভ্রান্তি ছড়ানোসহ সাংগঠনিক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিতে জড়িত থাকার সুনির্দিষ্ট অভিযোগে গণ অধিকার পরিষদের দপ্তর সম্পাদক শাকিল উজ্জামানকে তাঁর দায়িত্ব থেকে সাময়িক অব্যাহতি প্রদান করা হলো। একই সঙ্গে কেন শাকিল উজ্জামানকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করা হবে না, আগামী ৫ দিনের মধ্যে তার লিখিত জবাব চাওয়া হলো।

জানতে চাইলে শাকিল উজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, কেন্দ্রীয় কমিটির সিদ্ধান্ত না নিয়ে তাঁকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। এমনটি করার সুযোগ নেই।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে হাসান আল মামুন প্রথম আলোকে বলেন, দলের সভাপতি নুরুল হকের সঙ্গে বিএনপির সমঝোতা হয়েছে। এখন সেই বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক করার সুযোগ নেই। শাকিল উজ্জামান এখতিয়ারবহির্ভূত কাজ করেছেন।

এদিকে এই ঘটনার মধ্যেই নতুন বিতর্কের জন্ম দেয় আরেকটি ঘটনা। সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দেওয়ার পর গণ অধিকার পরিষদের সাবেক সাধারণ সম্পাদক রাশেদ খাঁন শাকিল উজ্জামানকে ওই হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ থেকে সরিয়ে দেন। দলটির উচ্চতর পরিষদের একজন সদস্য প্রথম আলোকে বলেন, যিনি দল ছেড়ে অন্য দলে যোগ দিয়েছেন, তিনি কীভাবে দলের দপ্তর সম্পাদককে দলীয় গ্রুপ থেকে বের করেন, সে প্রশ্ন উঠেছে।

সংকটের সূত্রপাত যেখানে...

গণ অধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রাশেদ খাঁন গত ২৭ ডিসেম্বর শনিবার দলের সাধারণ সম্পাদক পদ ছেড়ে বিএনপিতে যোগ দেন। তাঁকে ঝিনাইদহ-৪ (কালীগঞ্জ ও সদরের আংশিক) আসনে প্রার্থী করেছে বিএনপি। তাঁর জায়গায় জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হাসান আল মামুনকে ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক করা হয়। আর বিএনপির পক্ষ থেকে দলের সভাপতি নুরুল হককে মন্ত্রিত্বের আশ্বাসসহ একটি আসনে ছাড় দেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

গণ অধিকার পরিষদ সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে, আরও আগেই বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর জোটে থাকা নিয়ে সংকট দেখা দিয়েছিল গণ অধিকার পরিষদে। কয়েকটি সভায় দলের বর্তমান সভাপতি নুরুল হক এবং সাবেক সাধারণ সম্পাদক রাশেদ খাঁন জানিয়েছিলেন, বিএনপি এবং জামায়াত দুই দলের সঙ্গেই আলোচনা চলছে। দুই দল থেকে গণ অধিকার পরিষদকে কী প্রস্তাব দেওয়া হবে, তার ওপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তবে শুরু থেকেই বিএনপির প্রতি পক্ষপাতদুষ্ট ছিলেন দুজনই। বিশেষ করে রাশেদ খাঁন। সে কারণে জামায়াত নেতৃত্বাধীন আট দলের প্রতি তাঁরা আগ্রহ দেখাননি।

সূত্র জানায়, সর্বশেষ বৈঠকে বিএনপির প্রস্তাব জানানো হলেও জামায়াতের প্রস্তাব জানানো হয়নি। এরপর দলের বেশির ভাগ নেতা স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচনের পক্ষে মত দেন। এটা পরদিন ২৩ ডিসেম্বর সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে জানানোর কথা সভাপতির। তিনি সেটি জানাননি। এরপর রাশেদ খাঁন বিএনপিতে চলে গেলেন কাউকে কিছু না জানিয়েই। এসব কারণে নেতা-কর্মীরা বিব্রত। বিশেষ করে দলের সভাপতির ধানের শীষের পক্ষে ভোট চাওয়া, সাধারণ সম্পাদকের বিএনপিতে যোগ দেওয়ায় দেড় শর বেশি আসনে গণ অধিকারের প্রার্থী একধরনের ভাবমূর্তি সংকটে পড়েছেন।

সূত্র আরও জানায়, গত বুধবার বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠক করেছেন গণ অধিকার পরিষদের সভাপতি ও ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক। সেখানে দলটির সাবেক সাধারণ সম্পাদক রাশেদ খাঁনকেও দেখা গেছে। এটি নিয়েও দলের ভেতরে একধরনের অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।

জানতে চাইলে গণ অধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক বৃহস্পতিবার দুপুরে প্রথম আলোকে বলেন, দল গঠনের সময় বিভিন্ন দল থেকে লোকজন গণ অধিকার পরিষদে এসেছে। নির্বাচন সামনে রেখে বিএনপির সঙ্গে দলের আসন সমঝোতা হয়েছে। এরপরও অন্য কোনো দলের ইন্ধনে গণ অধিকার পরিষদের কিছু নেতার মাধ্যমে দলের ভেতরে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির একটি চেষ্টা থাকতে পারে।