আন্দালিভ রহমানের বক্তব্যে আবার উত্তেজনা, শফিকুর বললেন ‘আমাকে নিয়ে কচলায় সবাই’

সংসদে আন্দালিভ রহমান পার্থ ও শফিকুর রহমান। ২৮ এপ্রিলছবি: সংসদ টিভির ভিডিও থেকে

বিরোধীদলীয় নেতা ‘জিয়া পরিবার থেকে মানুষকে মুক্ত করার ঘোষণা’ করেছেন বলে বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) চেয়ারম্যান আন্দালিভ রহমান পার্থ অভিযোগ করলে সংসদে আবার উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে। এ সময় ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল সবাইকে একাধিকবার শান্ত হওয়ার আহ্বান জানান, কিন্তু কেউ কথা শুনছিলেন না।

আজ মঙ্গলবার মাগরিবের নামাজের বিরতির পর রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নেন আন্দালিভ রহমান। তিনি কিছু গণমাধ্যমের কাটিং হাতে নিয়ে সরকারকে ফেলে দিতে বিরোধী দলের হুমকির সমালোচনা করেন।

এ সময় আন্দালিভ কিছু সংবাদের শিরোনাম পড়ে শোনান। এর মধ্যে বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমানের বক্তব্য হিসেবে প্রকাশিত শিরোনাম কয়েকটি হলো ‘বিএনপি ফ্যাসিবাদের রাস্তা ধরে হাঁটা শুরু করেছে'', ''বিড়ালের মতো বাঁচতে চাই না, সিংহের মতো বাঁচতে চাই''; ''সংস্কার পিছিয়ে গেলে গণ–অভ্যুত্থানের প্রস্তুতি হবে''; ও ‘জিয়া পরিবার থেকে মানুষকে মুক্ত করার ঘোষণা।''

আন্দালিভ এ পর্যায়ে হেসে বলেন, গত ১৬ বছর জিয়া পরিবার থেকে মুক্ত করতে গিয়ে শেখ হাসিনা হেলিকপ্টার দিয়ে পালিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘জিয়া পরিবার মানে বাংলাদেশের গণতন্ত্র, বাংলাদেশের স্বাধীনতার ধারক-বাহক এখন। তারা (বিরোধী দল) বলেছে, আওয়ামী লীগ সরাতে ১৬ বছর লেগেছিল, আপনাদের (বিএনপি) সরাতে ১৬ দিনও লাগবে না।'

পার্থের বক্তব্যের এক পর্যায়ে বিরোধী দলের সদস্যরা একযোগে হইচই শুরু করেন। এ পর্যায়ে ডেপুটি স্পিকার সবাইকে শান্ত হওয়ার আহ্বান জানান। কিন্তু কেউ শুনছিলেন না। এ সময় ডেপুটি স্পিকার হাতুড়ি পিটিয়ে অর্ডার অর্ডার করে বলেন, এত উত্তেজিত হবেন না। অনারেবল মেম্বার অব মাই লেফট সাইট (বিরোধী দল) প্লিজ টেক ইউর সিট। এ সময় অন্যরা বসলেও বিরোধীদলীয় নেতা দাঁড়িয়ে ছিলেন। পরে স্পিকার তাঁকে বসতে অনুরোধ করেন। তিনি বলেন, ‘স্পিকারকে কথা বলতে দিন। আমি কিছু কথা বলব। কারও বক্তব্য এখানে আপনার পছন্দ হতে পারে, না–ও পছন্দ হতে পারে। আমরা চব্বিশের চেতনার কথা বলি। কিন্তু জাতি তো এই চেতনা দেখতে চায় না।’

আন্দালিভ রহমান পার্থ বলেন, অনেকে আওয়ামী লীগের ফিরে আসা নিয়ে কথা বলেন। তিনি বলেন, জুলাইকে অস্বীকার করে বাংলাদেশে রাজনীতি করার সুযোগ নেই। জুলাইকে জঙ্গি আখ্যা দিয়ে বাংলাদেশে রাজনীতি করার সুযোগ নেই। এর বিচার না হওয়া পর্যন্ত বাংলাদেশে (আ.লীগের) রাজনীতি করার সুযোগ নেই।

সংসদে আন্দালিভ রহমান পার্থ
ছবি: সংসদ টিভির ভিডিও থেকে

আওয়ামী লীগের আমলে বিদ্যুৎ সেক্টরে হয়েছিল লাগামহীন দুর্নীতি

আন্দালিভ রহমান বলেন, বিদ্যুতের সংকট নিয়ে কথা বলার সময় বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী অমিত সাহেব বলেছিলেন ‘ফ্যাসিস্টের অব্যবস্থাপনা’। এটা খুবই নমনীয় এবং দুর্বল শব্দ। আওয়ামী লীগের আমলে বিদ্যুৎ সেক্টরে কোনো অব্যবস্থাপনা হয়নি, হয়েছিল লাগামহীন দুর্নীতি ও চুরি। আর্টিফিশিয়াল ক্রাইসিস সৃষ্টি করা হয়েছিল। গ্যাস উত্তোলন করা হয়নি বাপেক্স দিয়ে। কুইক রেন্টাল দিয়ে কুইক ডেস্ট্রয় করা হয়েছিল দেশকে। সেই বোঝা দেশ বহন করছে।

খালেদা জিয়ার বিচারের রায় গণভবনের বারান্দায় লেখা হয়েছিল বলে দাবি করেন পার্থ। তিনি অভিযোগ করেন, বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর রায়ও হয়তো গণভবনের কোনো করিডর থেকে লেখা হয়েছিল। বিচার বিভাগকে ধ্বংস করা হয়েছিল। আমলাতন্ত্র...তিতাসে নাকি কেজি ধরে টাকা খেত। ওয়াসার এমডিকে সরানোর জন্য হাইকোর্টে রিট করা হয়েছিল। বিসিএস পরীক্ষায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নামের পেছনে জাতির জনক লেখা না হলে পরীক্ষায় পাস করানো হয়নি। এরপর ডিএনএ টেস্ট করে ১৫ লাখ টাকা ঘুষ নিয়ে বিসিএসে নিয়োগ হয়েছিল।

পার্থ বলেন, দেশে এমন আইন হওয়া উচিত যাদের কর্মকাণ্ডে বাংলাদেশের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তারা যেন দেশদ্রোহী হিসেবে বিবেচিত হয়। একই সঙ্গে র‍্যাবের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারে সরকারকে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা করার দাবি করেন তিনি।

সবাই আমাকে ভালোবেসে কচলায়

'সবাই আমাকে ভালোবেসে কচলায়' আন্দালিভ রহমান পার্থর বক্তব্যের জবাবে বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান বলেন, 'পড়ছি মছিবতে। সবাই আমাকে খুব ভালোবাসে তো! তাই আমাকে নিয়ে কচলায় সবাই।' জিয়া পরিবার থেকে মানুষকে মুক্ত করার...বিষয়ে পার্থের বক্তব্যের জবাবে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, 'আমাদের পার্থ সাহেব। আমি শুনেছি উনি খুব ভালো ডিবেট করতেন। প্রচুর ম্যাটারিয়াল নিয়ে আসছেন। উনি কিছু সঠিক চালান দিয়েছেন। কিছু বেঠিক চালান দিয়েছেন। আগের দিনও এ রকম এতটু বক্তব্য...পরে আমি ব্যক্তিগতভাবে ওনার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলাম।'

শফিকুর রহমান বলেন, উনি কার নামে কোট করেছেন আমি বুঝতে পারিনি। কিন্তু ফাইলটা শুরু করেছেন আমার নামে। উনি বলেছেন, আমি জিয়া পরিবারকে…এ সময় পার্থ মাইক ছাড়া বিরোধীদলীয় নেতার বক্তব্যের প্রতিক্রিয়া দেখালে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, না না উনি মেনশন করেননি। লেট মি সে। জিয়া পরিবারকে আমি নিশ্চিহ্ন বা হাবিজাবি করতে বলেছি। আমি চ্যালেঞ্জ করছি, হোয়েন, হয়্যার, হাউ। প্লিজ ক্ল্যারিফাইড। আমি এ ধরনের রেডিয়াস কথা কারও নামেই বলিনি। এমনকি শেখ হাসিনার পরিবারের নামেও না।’

শফিকুর রহমান অনুরোধ জানান, বক্তব্যের মাধুর্য ছড়াতে গিয়ে তাঁর ওপরে যেন ভবিষ্যতে এ ধরনের দয়া উনি না করেন। তিনি বলেন, ‘আমাকে এত ভালোবেসে সবকিছু আমার নামে চালান দিলে এই বোঝার দায় বোধ হয় আমি বহন করতে পারব না।’

সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান। ২৮ এপ্রিল
ছবি: সংসদ টিভির ভিডিও থেকে

আমি ওনার কথা বলিনি

জবাবে আন্দালিভ রহমান পার্থ বলেন, ‘আমার হাতে ডকুমেন্ট আছে। জিয়া পরিবার থেকে মানুষকে মুক্ত করার। আমি তো ওনার কথা বলিনি। এনসিপির এক নেতা বলেছেন।’ এই বক্তব্যে বিরোধী দলের সদস্যরা হইচই শুরু করেন। এতে সংসদে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।

এ সময় পার্থ বিরোধী দলকে উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘আমি ওনার কথা বলেনি। যিনি বলেছেন তার কথা বলেছি।’

উত্তেজনার মধ্যে ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল এক পর্যায় অর্ডার অর্ডার করে বলেন, এত উত্তেজিত হবেন না। অনারেবল মেম্বার অব মাই লেফট সাইট (বিরোধী দল) প্লিজ টেক ইউর সিট। এ সময় অন্যরা বসলেও বিরোধীদলীয় নেতা দাঁড়িয়ে ছিলেন। পরে স্পিকার তাঁকে বসতে অনুরোধ করেন।

পরে ডেপুটি স্পিকার আবারও পার্থকে ফ্লোর দেন। ফ্লোর পেয়ে তিনি তাঁর বক্তব্যের বাখ্যা দিয়ে বলেন, ‘আমি ১১–দলীয় জোট ও বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে ওনার নাম বলে শুরু করেছি। কিন্তু এই ক্লিপগুলোতে আরও অন্যান্যের কথা রয়েছে। এ জন্য ব্যাখ্যা করিনি। আমি ওনাকে দায়ী করে কথা বলিনি। এটা ভুল–বোঝাবুঝি মাত্র। আর কাউকে মিথ্যাভাবে দায়ী করার সুযোগ এই ডিজিটাল যুগে নেই।’

পরে বিরোধী দলের নেতা বলেন, ‘এই সংসদে কোনো ডকুমেন্ট হাতে নিয়ে কোনো রেফারেন্স যখন দেব, তা ক্লিয়ার ও যথাযথ হতে হবে। সবাইকে বলব, ডকুমেন্টস দিয়ে কথা বললে তা সুনির্দিষ্টভাবে হতে হবে।’

গণভোটের রায় বাতিলের সিদ্ধান্ত বিএনপির সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ভুল

আলোচনায় অংশ নিয়ে জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য নূরুল ইসলাম বলেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ ও গণভোটের রায় বাতিলের সিদ্ধান্ত বিএনপির সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ভুল, আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। এর মাধ্যমে জনআকাঙ্ক্ষা ও গণ–অভ্যুত্থানকে পদদলিত করা হয়েছে। এর অর্থ হলো আরেকটি জুলাইকে স্বাগত জানানো, ফ্যাসিবাদের নতুন ধারার সূচনা করা।

একটি নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণে সবাই ঐকবদ্ধভাবে ভূমিকা রাখবেন—এমন আশা ছিল উল্লেখ করে জামায়াতের এই সংসদ সদস্য বলেন, সংসদে ও সংসদের বাইরে সে পরিবেশ ধীরে ধীরে ক্ষীণ হয়ে আসছে। তিনি অভিযোগ করেন, একজন ঋণখেলাপি দলীয় লোককে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর পদে বসানো হয়েছে। এটা জাতির জন্য লজ্জাজনক, দেশের ভঙ্গুুর অর্থনীতির জন্য অশনিসংকেত।