নতুন সরকার শপথ না নিতেই আন্দোলনের ডাক, এটা ভালো লক্ষণ নয়: মেজর (অব.) হাফিজ
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীসহ ১১-দলীয় নির্বাচনী ঐক্যভুক্ত দলগুলো আজ সোমবার রাজধানীতে যে বিক্ষোভ সমাবেশের ডাক দিয়েছে, তার সমালোচনা করেছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ। তিনি বলেছেন, এটা ভালো লক্ষণ নয়।
আজ দুপুরে রাজধানীর মহাখালীতে রাওয়া ক্লাবে মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি জেনারেল (অব.) এম এ জি ওসমানীর ৪২তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভার পর সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এ কথা বলেন হাফিজ উদ্দিন আহমদ। তিনি ওই সভার প্রধান অতিথি ছিলেন।
‘সারা দেশে জাতীয় নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা, নির্যাতন, নিপীড়ন, হত্যা, ধর্ষণের প্রতিবাদে’ আজ বিকেলে রাজধানীতে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করবে ১১ দল।
আজকের এ কর্মসূচির বিষয়ে হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, ‘দুঃখজনক হলেও সত্য যে নতুন সরকার এখনো শপথই নেয়নি, অথচ আজকেও আন্দোলনের ডাক দেওয়া হচ্ছে। এটি বাংলাদেশের জন্য ভালো সাইন (লক্ষণ) নয়। অপেক্ষা করতে হবে। বিরোধী দলকেও বাংলাদেশের জনগণ সুখ–দুঃখের কথা চিন্তা করে কর্মসূচি দেওয়া উচিত বলে আমি মনে করি।’
নতুন সংসদে বিরোধী দলের নেতাদের ভূমিকা কেমন হবে—এ প্রসঙ্গে হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, ‘তারেক রহমান বিরোধী দলের নেতাদের বাসায় গেছেন। এ আচরণ বাংলাদেশে একেবারে নতুন। বাংলাদেশের রাজনীতির অঙ্গনে এটি সুবাতাস বয়ে নিয়ে এসেছে। আমরা বিরোধী দলের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক আশা করি। তারা সরকারের গঠনমূলক সমালোচনা করবে। জনগণকে বিপদে ফেলবে না, কথায় কথায় রাজপথ অবরুদ্ধ করে জনগণকে কষ্ট দেবে না।’
নতুন মন্ত্রিসভা গঠন নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, ‘এটা সম্পর্কে আমি কিছুই জানি না। তবে একটা ছোট মন্ত্রিসভা হবে বলে শুনেছি। দীর্ঘদিন ফ্যাসিস্ট সরকারের বিরুদ্ধে যাঁরা আন্দোলন–সংগ্রাম করেছেন, অবদান রেখেছেন, নিশ্চয়ই তাঁরা এই মন্ত্রিসভায় স্থান পাবেন। আশা করি, যাদের দুর্নীতির বদনাম নেই, যাদের দক্ষতা ও জনগণের মধ্যে জনপ্রিয়তা আছে এবং স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ন রাখতে কখনো আপস করবে না, তাদের এই মন্ত্রিসভায় রাখা হবে।’
এ প্রসঙ্গে হাফিজ উদ্দিন আহমদ আরও বলেন, জোটের সদস্যরাও কয়েকজন মন্ত্রিসভায় থাকবেন। নবীন ও প্রবীণদের সংমিশ্রণে নতুন মন্ত্রিসভা গঠিত হবে।
এম এ জি ওসমানীকে স্মরণ
হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, জেনারেল এম এ জি ওসমানীর যে মর্যাদা ও সম্মান স্বাধীন দেশে পাওয়া উচিত ছিল, তা থেকে তিনি বঞ্চিত হয়েছেন। তিনি বলেন, ‘এতে তাঁর কোনো ক্ষতি হয় নাই, এই জাতিরই ক্ষতি হয়েছে। আমরা অত্যন্ত ভাগ্যবান, স্বাধীনতাযুদ্ধে তাঁর মতো একজন অধিনায়ক পেয়েছিলাম।’
রিটায়ার্ড আর্মড ফোর্সেস অফিসার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন (রাওয়া) আজকের এ আলোচনা সভার আয়োজন করে। সভায় রাওয়ার চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) মোহাম্মদ আবদুল হক স্বাগত এবং ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক লে. কর্নেল (অব.) আবু নওরোজ খুরশিদ সূচনা বক্তব্য দেন।
এ ছাড়া সাবেক বিমানবাহিনী প্রধান এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) এ জি মাহমুদ, মেজর (অব.) জামিল ডি আহসান, অর্থনীতিবিদ মাহবুব উল্লাহ, রাওয়ার সদস্য এয়ার কমোডর (অব.) মো. শফিকুল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, বাঙালির মধ্যে দলাদলির প্রবণতা নতুন কিছু নয়—সামরিক বা বেসামরিক, সব ক্ষেত্রেই এর উপস্থিতি দেখা যায়। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের সময় এমন বিভাজন ছিল না। এর বড় কারণ ছিলেন কর্নেল (পরবর্তীকালে জেনারেল) আতাউল গনি ওসমানী। তাঁর ব্যক্তিত্ব, চলাফেরা, জীবনাচরণ ও শৃঙ্খলা এতটাই নিখুঁত ছিল যে পদমর্যাদা অনুযায়ী সবাই তাঁকে সম্মান দিতেন, যা স্বাভাবিকভাবেই তিনি প্রাপ্য ছিলেন।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির এই সদস্য বলেন, ‘স্বাধীনতার পর থেকেই মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে নানা বিতর্কে জড়ানো হয়েছে। প্রকৃত তথ্য জনগণের সামনে তুলে ধরা হয়নি। আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে নিজেদের কৃতিত্ব প্রচারের প্রবণতা বেশি, অন্যের অবদান স্বীকারে অনীহাও আছে।’
জেনারেল ওসমানীর অবদান তুলে ধরে হাফিজ উদ্দিন বলেন, মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল গণতন্ত্রের জন্য। কিন্তু স্বাধীনতার পর গণতন্ত্র পূর্ণতা পায়নি। ১৯৭৫ সালের জানুয়ারিতে একদলীয় শাসনব্যবস্থা চালু হলে মাত্র দুজন সংসদ সদস্য—ব্যারিস্টার মঈনুল হোসেন ও জেনারেল ওসমানী—প্রকাশ্যে এর বিরোধিতা করেন। ওসমানী বলেন, গণতন্ত্রের জন্য লড়ে দেশ স্বাধীন করা হয়েছে, সেটিকে নির্বাসনে পাঠানো যায় না। মতামত গুরুত্ব না পেয়ে তিনি পদত্যাগ করেন, যা তাঁর নৈতিক দৃঢ়তার পরিচায়ক।
হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, ‘কথা উঠেছে, জেনারেল এম এ জি ওসমানীর মতো ব্যক্তিত্বকে আরও উচ্চ মর্যাদায় প্রতিষ্ঠা করা উচিত। মুক্তিযুদ্ধে সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক হিসেবে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। তাঁকে “ফিল্ড মার্শাল” পদে ভূষিত করা উচিত।’ তিনি এ দাবিকে সমর্থন করেন। তাঁর প্রস্তাব, অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তাদের সংগঠন থেকে একটি প্রতিনিধিদল তিন বাহিনীর প্রধানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বিষয়টি উত্থাপন করুক এবং সশস্ত্র বাহিনীর পক্ষ থেকে সরকারপ্রধানের কাছে লিখিত সুপারিশ পাঠানো হোক। ব্যক্তিগতভাবেও তিনি এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেবেন।
এর আগে শফিকুল ইসলাম মুক্তিযুদ্ধে অবদানের জন্য জেনারেল এম এ জি ওসমানীকে মরণোত্তর ফিল্ড মার্শাল খেতাব দিতে নতুন সরকারের কাছে দাবি জানান। অন্যরাও তাঁর এ বক্তব্যকে সমর্থন জানান। পরে হাফিজ উদ্দিন আহমদ এ দাবির বিষয়ে সহযোগিতা করার অঙ্গীকার করেন।