কোনোভাবেই উগ্রবাদকে প্রশ্রয় দেবে না সরকার: সংসদে প্রধানমন্ত্রী
বর্তমান সরকার কোনোভাবেই কোনো ধরনের চরমপন্থা বা উগ্রবাদকে প্রশ্রয় দেবে না বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, এ ক্ষেত্রে সরকারবিরোধী দলের পূর্ণ সহযোগিতা পাবে বলে তিনি বিশ্বাস করেন। একই সঙ্গে তিনি আশা করেন, দেশে আর কোনোভাবেই যেন ফ্যাসিবাদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে না পারে এবং দেশ তাঁবেদারি রাষ্ট্রে পরিণত হতে না পারে, সে জন্য জাতীয় ঐক্য অটুট থাকবে।
আজ বুধবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশনের (বাজেট অধিবেশন) সমাপনী ভাষণে প্রধানমন্ত্রী এ কথা বলেন। গত ৭ জুন থেকে শুরু হওয়া এই অধিবেশন আজ শেষ হয়েছে।
অধিবেশনে মোট ২৬টি কার্যদিবস ছিল। বাজেট পাস হয় ৩০ জুন। অধিবেশনে মোট ১০টি বিল পাস হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর উত্তরদানের জন্য ২৭৮টি প্রশ্ন জমা পড়ে, যার মধ্যে ৩৫টি প্রশ্নের উত্তর টেবিলে উপস্থাপিত হয়েছে। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীদের জন্য ৫ হাজার ৩১টি প্রশ্ন জমা পড়ে এবং ৩ হাজার ৪৭৪টি প্রশ্নের উত্তর দেওয়া হয়েছে। এ অধিবেশনে সংবিধান সংশোধন-সম্পর্কিত বিশেষ কমিটিসহ মোট ১১টি কমিটি গঠিত হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর সমাপনী ভাষণ
সমাপনী ভাষণে সংসদ নেতা তারেক রহমান বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গঠন এবং জবাবদিহিমূলক কল্যাণরাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্যে বিভিন্ন সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি, ঋণনির্ভর অর্থনীতি থেকে বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতিতে রূপান্তর, কর্মসংস্থান সৃষ্টির পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বর্তমান সরকার কোনোভাবেই কোনো ধরনের চরমপন্থা বা উগ্রবাদকে প্রশ্রয় দেবে না এবং আমরা যেভাবে সরকারি দল এবং বিরোধী দল বিভিন্ন বিষয়ে এই সংসদে কোনো কোনো বিষয় হয়তো দ্বিমত করেছি, কিন্তু একই সঙ্গে অনেক বিষয় আমরা একমত পোষণ করেছি। আমি বিশ্বাস করি দৃঢ়ভাবে, উগ্রবাদ ও চরমপন্থাকে যে বর্তমান সরকার প্রশ্রয় দেবে না—এ ব্যাপারে আমরা সম্পূর্ণভাবে বিরোধী দলের সহযোগিতা পাব।’
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ‘দৃঢ়ভাবে আমরা প্রত্যেকে বিশ্বাস করি, সেই বাংলাদেশ যে বাংলাদেশে চরমপন্থা কিংবা উগ্রবাদের কোনো রকম ঠাঁই হবে না। বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার নামে কেউ মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ করবে না।’ দেশে ধর্মীয়, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও পারিবারিক মূল্যবোধের অবক্ষয় হয়েছে বলে মনে করেন তারেক রহমান। সে কারণে পারিবারিক মূল্যবোধ ফিরিয়ে আনা অত্যন্ত জরুরি এবং প্রতিটি পরিবার এ ক্ষেত্রে দায়িত্ব পালন করবে বলে তিনি আশা করেন।
সংসদ নেতা বলেন, সংসদের রীতি অনুযায়ী বিরোধী দলের সঙ্গে মতভিন্নতা থাকবে। তবে অবশ্যই শত্রুতা নয়। প্রতিহিংসা প্রতিশোধের পরিবর্তে থাকবে ন্যায়পরায়ণতা।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশে আর যাতে কখনো কোনোভাবেই ফ্যাসিবাদ স্বৈরাচার মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে না পারে আর যাতে এই প্রিয় মাতৃভূমি তাঁবেদারি রাষ্ট্রে পরিণত হতে না পারে—এই প্রশ্নে বিরোধী দল এবং সরকারি দলের মধ্যে জাতীয় ঐক্য রয়েছে। যেকোনো মূল্যে এই জাতীয় ঐক্য অটুট এবং বজায় থাকবে।
জুলাই সনদ প্রসঙ্গ
বিএনপির ৩১ দফা এখন সারা দেশের মানুষের ৩১ দফা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্র্রী তারেক রহমান বলেন, একইভাবে সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় সব দল জুলাই সনদে স্বাক্ষর করেছিল। তারা জুলাই সনদের প্রতিটি দফা বাস্তবায়নে জনগণের কাছে দায়বদ্ধ ও অঙ্গীকারবদ্ধ।
বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতি
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ফ্যাসিবাদের আমলে আমরা শুধু উন্নয়নের গল্প শুনেছি। কিন্তু বিভিন্ন এলাকায় সফরে গিয়ে সেই উন্নয়নের গল্প ও বাস্তবতার মধ্যে কোনো মিল পাইনি। স্বৈরাচার ও তার কাছের লোকগুলো নিজেদের পকেট ভারী করার জন্য বিদ্যুৎ খাতকে বেছে নিয়েছিল।’
তারেক রহমান বলেন, দেশের অর্থনীতি দুর্বল। বিশ্ব একটি যুদ্ধের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এই সরকারের কাছে জনগণের প্রত্যাশা অপরিসীম। তিনি বলেন, ‘এমন পরিস্থিতিতে আমরা অর্থনৈতিকভাবে ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছি। আমরা জনগণকে সঙ্গে নিয়ে আমাদের পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়ন করব।’
বাজেট বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট সবার সহযোগিতা চেয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ব্যবসা–বাণিজ্য থেকে সব বাধা সরিয়ে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ ও ন্যায়ভিত্তিক সুযোগ সৃষ্টি এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোয় জবাবদিহির আওতায় আনা গেলে শহীদদের প্রত্যাশিত বাংলাদেশ গড়ে তোলা যাবে।
কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও অর্থনীতি শক্তিশালী করার পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা ঋণনির্ভর অর্থনীতিকে বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতিতে পরিণত করতে চাই। সম্পদ তৈরিতে বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতি হবে আমাদের মূল চালিকা শক্তি। বর্তমান সরকার এমনভাবে পরিকল্পনা করেছে, যার মাধ্যমে ২০৩৪ সালে আমরা ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির কাছাকাছি চলে যেতে পারি।’
দুর্নীতি দমন ও আইনশৃঙ্খলায় অগ্রাধিকার
দুর্নীতি দমন ও আইনশৃঙ্খলা সরকারের অগ্রাধিকারে রয়েছে বলে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেন, দুর্নীতির মাধ্যমে স্বৈরাচারের সময়ে প্রতিবছর এ দেশ থেকে ১৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার পাচার করে দেওয়া হয়েছে। সব সমস্যার অন্যতম কারণ হচ্ছে এই দুর্নীতি। যেকোনোভাবে হোক, সেই দুর্নীতি হাত বেঁধে হোক আর টুঁটি চেপে ধরে হোক, নিয়ন্ত্রণ করতে বর্তমান সরকার বদ্ধপরিকর। তিনি জানান, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সরকার পেশাদার বাহিনী হিসেবে গড়ে তুলতে চায়।
একটি বিশেষ দেশকে সুবিধা দিতে স্বাস্থ্য খাত ধ্বংস
প্রধানমন্ত্রী বলেন, একটি বিশেষ দেশকে সুবিধা দেওয়ার জন্য ফ্যাসিবাদী-স্বৈরাচারী সরকারের সময়ে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছিল। নির্বাচিত এই সরকারের লক্ষ্য হচ্ছে, জনগণ, জনগণ এবং বাংলাদেশের জনগণ। বর্তমান সরকার চায় বাংলাদেশকে একটি কল্যাণ রাষ্ট্রে পরিণত করতে। যেখানে সমাজের প্রতিটি শ্রেণি–পেশার মানুষ ন্যূনতম রাষ্ট্রীয় সেবা পাবেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য সরকার ইতোমধ্যে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ডসহ অন্য কাজগুলো করছে। এই সব কটি কার্ডকে একসময় ‘ইউনিভার্সেল কার্ড’ নামে একটি কার্ডের মধ্যে নিয়ে আসার পরিকল্পনা রয়েছে।
এসব সুবিধা নাগরিকদের প্রতি রাষ্ট্রের করুণা নয়, বরং এগুলো জনগণের প্রতি রাষ্ট্রের দায় বলে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ভবিষ্যতে স্বৈরাচার-তাঁবেদার রুখতে হলে অবশ্যই রাষ্ট্র ও জনগণকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী করতে হবে।
ফ্যাসিবাদ-স্বৈরাচারের আমলে প্রতিটি সংগঠন, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, এসব সংগঠন মধ্যে অন্যতম একটি ছিল শিক্ষা খাত। সেই সময় নকলকে উৎসাহিত করা হয়েছিল। অটো প্রমোশন দিয়ে ছাত্রছাত্রীদের ভবিষ্যৎ ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছিল। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়েও এ ব্যাপারে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি। শিক্ষা খাতের বরাদ্দ ৫ বছরে জিডিপির ৫ শতাংশ করা হবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমার কেন যেন মনে হয় ফ্যাসিবাদ স্বৈরাচার কোনো একটি বিশেষ গোষ্ঠী, কোনো একটি বিশেষ দেশকে খুশি করতে এই শিক্ষা খাতকে ধ্বংস করার নীতি গ্রহণ করেছিল।’
জনগণের সংসদ
সংসদ নেতা তারেক রহমান বলেন, জনগণের কাঙ্ক্ষিত এই সংসদ প্রত্যেক সংসদ সদস্যের প্রচেষ্টায় জনগণের সংসদ হয়ে উঠেছে। কিছু বিষয়ে দ্বিমত হয়েছে। প্রাণবন্ত আলোচনা হয়েছে। এটাই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য।
বর্তমান সরকার জনগণের কাছে দায়বদ্ধ উল্লেখ করে সরকারপ্রধান তারেক রহমান বলেন, ‘আমরা জনগণের আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করে জনগণের জীবন ও সম্পদ সুরক্ষা সরকারের পবিত্র আমানত বলে আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি। আমরা এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চাই, যেখানে রাষ্ট্র এবং সরকার হবে জনগণের কাছে জবাবদিহিমূলক। অর্থনীতি হবে অন্তর্ভুক্তিমূলক। নাগরিকের জীবন হবে নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও সম্ভাবনাময়।’