চব্বিশের কাঠগড়ায় প্রগতিশীল রাজনীতি
চব্বিশের গণ–অভ্যুত্থানের দিনগুলোয় যখন লাশের সারি বাড়ছে, যখন ক্রমেই আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে যে জনতার সঙ্গে আওয়ামী লীগের মরণপণ লড়াই অত্যাসন্ন, তখন এ দেশের ‘প্রগতিশীল’ হিসেবে পরিচিতদের ভূমিকা বেশ নাজুক ছিল। আন্দোলনের সমর্থনে তাদের রাজনৈতিক কর্মসূচি প্রায় ছিলই না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও হাতে গোনা কিছু ব্যক্তির প্রতিক্রিয়া ছাড়া প্রগতিশীল মহলের অংশগ্রহণ ছিল দুর্বল।
শিক্ষার্থীদের সমর্থনে যে একটিমাত্র রাজনৈতিক কর্মসূচি এসেছিল উদারপন্থী ও প্রগতিশীলদের দিক থেকে, ১৯ জুলাই গণতন্ত্র মঞ্চের সেই সমাবেশকে পুলিশ সাউন্ড গ্রেনেড ও কাঁদানে গ্যাস দিয়ে ছত্রভঙ্গ করে এবং হাসনাত কাইয়ূম, জোনায়েদ সাকিসহ অনেক নেতা–কর্মীকে পিটিয়ে আহত করে। সেদিনই দুপুরবেলা স্থানীয় যুবলীগের গুন্ডাবাহিনী আহত জোনায়েদ সাকিকে ঢাকা কমিউনিটি হাসপাতাল থেকে অপহরণ করে। তিনি ভয়াবহ নিপীড়নের শিকার হন।
এই রাজনৈতিক জোট আর ‘বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক’ নামের সংগঠনের শিক্ষকেরাই শুধু আন্দোলনকে ধারাবাহিক সমর্থন জুগিয়ে গেছেন। এ ছাড়া শেখ হাসিনার পতন যে নিশ্চিত হয়ে উঠেছে, সেই বার্তাকে ভাষা দিয়েছে অধ্যাপক আনু মুহাম্মদের আহ্বানে ‘দ্রোহযাত্রা’। কোনো কোনো প্রগতিশীল ছাত্রসংগঠন জুলাইয়ের রাজনৈতিক কর্মসূচিগুলোতে শুরু থেকে দৃঢ়ভাবে অংশগ্রহণ নিলেও একটা বলয় আকারে বিবেচনা করলে এই গোষ্ঠীর সার্বিক সমর্থন ও অংশগ্রহণ তেমন ছিল না।
প্রগতিশীলেরা দুর্বল হলে তা দেশের জন্য শুধু বিপজ্জনকই নয়, উপমহাদেশের সামগ্রিক রাজনীতিতেও এর প্রভাব খুবই নেতিবাচক হবে। অন্যদিকে মুক্তিযুদ্ধকে কোনো পরিবার বা দলের সংকীর্ণ স্বার্থে ব্যবহার করা যাবে না, ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক আত্মমর্যাদার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হবে—এগুলো এখন বাংলাদেশের রাজনীতির ন্যূনতম নির্ণায়কে পরিণত হয়েছে।
উমামা ফাতেমা নিজ সংগঠনের প্রতিনিধি হিসেবে আন্দোলনের অন্যতম ভরসার মুখে পরিণত হলেও এবং দ্বিধাবিভক্ত সংগঠনের মুখ হিসেবে মেঘমল্লার বসুর মতো কেউ কেউ দৃষ্টি আকর্ষণ করলেও শিক্ষার্থীদের মধ্যে এই অংশের ভূমিকা কম ছিল।
’৫২, ’৬২, ’৬৯, ’৮২, ’৯০–এর মতো বড় বড় আন্দোলন–অভ্যুত্থানে নেতৃত্বদানকারীরাই পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক নেতা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। ফলে চব্বিশের এই প্রবণতা বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতির গতিমুখ নির্ধারণ করে দিতে পারে। প্রগতিশীলেরা কোন কোন বিন্দুতে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছেন এবং কী কী কারণ দীর্ঘদিন ধরে তৈরি হওয়া কোটা সংস্কার আন্দোলনে তাঁদের ভূমিকা রাখায় বাধা দিয়েছে, তার অনুসন্ধান জরুরি।
২
২০১৮ সাল পর্যন্ত জাতীয় সম্পদ রক্ষার আন্দোলন বেশ শক্তিশালী ছিল। বিবিয়ানার গ্যাস ভারতে রপ্তানি বন্ধ করা, টাটার কাছে নামমাত্র মূল্যে গ্যাস সরবরাহ রোধ করাসহ আরও কিছু সীমিত বিজয়ও তার ছিল।
এ আন্দোলনের প্রধান দিক ছিল অর্থনৈতিক, চেতনা ছিল সাম্রাজ্যবাদবিরোধী। তবে সুন্দরবন রক্ষার জন্য রামপালে কয়লাবিদ্যুৎকেন্দ্র প্রতিহত করার আন্দোলনের ব্যর্থতা এই আন্দোলন এবং পরবর্তীকালের বাংলাদেশের জন্য একটি বিশেষ মুহূর্ত।
বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক নীতি, পররাষ্ট্রনীতি, জ্বালানিনীতি ইত্যাদি বিষয়ে প্রতিবেশী দেশটা যে এত বিপুল প্রভাবের অধিকারী, বাংলাদেশকে আত্মমর্যাদা নিয়ে দাঁড়াতে হলে সেই বাস্তবতা স্বীকার করে নতুন কর্মসূচি তৈরি করা রাজনীতিতে দরকার হয়ে পড়ে।
এ আন্দোলনের দুই প্রধান নেতা প্রয়াত শেখ মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ ও অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ উভয়েই এই বাস্তবতা উপলব্ধি করতেন। কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলো এ বিষয়ে ছিল বহুধাবিভক্ত। কারণ, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে ভারতের হস্তক্ষেপের বাস্তবতা স্বীকার করে নিলে যে রাজনৈতিক কর্মসূচি গ্রহণ করতে হয়, বাংলাদেশের প্রগতিশীল বহু রাজনৈতিক দল তাতে সম্মত ছিল না।
উমামা ফাতেমা নিজ সংগঠনের প্রতিনিধি হিসেবে আন্দোলনের অন্যতম ভরসার মুখে পরিণত হলেও এবং দ্বিধাবিভক্ত সংগঠনের মুখ হিসেবে মেঘমল্লার বসুর মতো কেউ কেউ দৃষ্টি আকর্ষণ করলেও শিক্ষার্থীদের মধ্যে এই অংশের ভূমিকা কম ছিল।
৩
শেখ হাসিনাকে প্রথম ‘ফ্যাসিবাদী’ অভিধা দেন বদরুদ্দীন উমর। একসময় তিনি ফরহাদ মজহার, আহমদ ছফা ও সেক্টর কমান্ডার কর্নেল কাজী নুরুজ্জামানকে নিয়ে ফ্যাসিবাদ–বিরোধী কমিটিও গঠন করেছিলেন। এর পেছনে ছিল ১৯৯৬-২০০১ সালে মুক্তিযুদ্ধ ও ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসের ওপর আওয়ামী লীগের একচেটিয়া দখলদারিত্ব প্রতিষ্ঠার তৎপরতার বিরুদ্ধে কথা বলার একটি পরিসর তৈরি করার তাগিদ। বদরুদ্দীন উমর তাঁর ফ্যাসিবাদবিষয়ক লেখালেখিতে জামায়াতে ইসলামী ও আওয়ামী লীগ এই দুটি দলের মতাদর্শের মধ্যে প্রবল ফ্যাসিবাদী প্রবণতার উপস্থিতি শনাক্ত করেন। একটির ফ্যাসিবাদী প্রবণতা ধর্মীয়, অন্যটির জাতীয়তাবাদী।
২০১৪ সালের একতরফা নির্বাচনের পর প্রগতিশীল বলয়ের একটা উদীয়মান অংশ যখন শেখ হাসিনার শাসনকে গুম-খুন-বিভাজনের রাজনীতি ও গণতন্ত্রহীনতার জন্য ফ্যাসিবাদী হিসেবে চিহ্নিত করে আন্দোলন করতে চেয়েছে, তখন প্রগতিশীলদের বনেদি অংশটি এই বিষয়ে একমত ছিল না, পরবর্তী সময়ে দ্বিধান্বিত ছিল।
বদরুদ্দীন উমর তাঁর ফ্যাসিবাদবিষয়ক লেখালেখিতে জামায়াতে ইসলামী ও আওয়ামী লীগ এই দুটি দলের মতাদর্শের মধ্যে প্রবল ফ্যাসিবাদী প্রবণতার উপস্থিতি শনাক্ত করেন। একটির ফ্যাসিবাদী প্রবণতা ধর্মীয়, অন্যটির জাতীয়তাবাদী।
৪
তাঁদের এই দ্বিধার রাজনৈতিক মূল্য আকাশচুম্বী। তাই এই দ্বিধার কারণ সন্ধান করা দরকার।
খনিজ সম্পদ রক্ষার আন্দোলনের সারবস্তুকে মানুষ কিছু দাবিদাওয়ার আন্দোলন হিসেবেই বিবেচনা করেছে, সমর্থনও করেছে। কিন্তু ওই সময়েই গুম, জামিন–অযোগ্য মামলা, পুলিশের হেফাজতে হাঁটুতে গুলি খাওয়া মানুষের সংখ্যা ক্রমাগত বেড়েছে। কিন্তু তা প্রগতিশীলদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেনি।
খনিজ সম্পদ রক্ষার আন্দোলনেও আওয়ামী লীগের নিপীড়ন ছিল যথেষ্ট। তবে বিএনপি ও ডানপন্থী দলগুলোর আন্দোলন দমনে আওয়ামী লীগের নীতি ছিল চরম মানবাধিকারবিরোধী। এদের সবাইকে ‘বিএনপি-জামায়াত’ হিসেবে চিহ্নিত করে ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা রক্ষায়’, ‘যুদ্ধাপরাধীদের দমন করতে’ এবং ‘উগ্রপন্থীদের হাত থেকে দেশকে বাঁচাতে’ সব ধরনের নির্যাতন ও নিপীড়নকে বৈধ করার জন্য তারা একটি রাজনীতির সূচনা করে। নিপীড়ন ক্রমেই ডানপন্থীদের ছাপিয়ে কার্টুনিস্ট, লেখক, টক শোর আলোচক, গণমাধ্যম সবার ওপর বিস্তৃত হয়।
সংক্ষেপে কিছু ব্যতিক্রম বাদে প্রগতিশীলেরা মোটাদাগে আওয়ামী লীগের ‘উন্নয়নের অর্থনীতির’ পেছনে লুণ্ঠনচিত্রটা তুলে ধরতে সক্ষম হলেও প্রতিষ্ঠিত প্রগতিশীলদের বড় একটি অংশ আওয়ামী লীগের বিভাজনের রাজনীতি এবং ফ্যাসিবাদী দমন-পীড়ন ইত্যাদি বিষয়ে আওয়াজ তোলেননি। তাঁরা একে ‘মন্দ কিন্তু প্রয়োজনীয়’ বলে মনে করেছেন।
দৈনিক দিনকাল বা নয়া দিগন্ত–এর মতো সংবাদমাধ্যম দমন বিষয়ে প্রতিবাদ করা তো দূরের কথা, এমনকি বহু উদার ও প্রগতিশীল নাগরিক প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার–এর মতো উদারপন্থী সংবাদমাধ্যমের ওপর সরকারের নিপীড়ন ও বিপুল চাপ প্রয়োগের বিরুদ্ধেও প্রতিবাদ করেননি। কারণ, একে তাঁরা ‘মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ-বিপক্ষ বিভাজনের মাধ্যমে দেশরক্ষার’ রাজনীতির জন্য প্রয়োজন বলে ভেবেছেন।
কিশোর আলোর অনুষ্ঠানে একটা বৈদ্যুতিক দুর্ঘটনায় এক শিক্ষার্থীর মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনাকে প্রথম আলোর সম্পাদককে চরম হয়রানি করার কাজে সরকার যেভাবে ব্যবহার করেছিল, সেই চরম দৃষ্টান্তও ‘সংস্কৃতিমনা’ মধ্যবিত্তের উল্লেখযোগ্য অংশের সমর্থন পেয়েছিল একই কারণে।
৫
২০১৮ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলন জমে ওঠার পরে খেয়াল করে দেখি, আমাদের পরিচিত ছাত্ররাজনৈতিক কর্মীরা সেখানে আর সংগঠন আকারে হাজির হচ্ছেন না, হচ্ছেন ব্যক্তি হিসেবে। কারণ জিজ্ঞস করলে বলেন, শিক্ষার্থীদের যে জোটটির তাঁরা সদস্য, সেখানকার কয়েকটি ‘বড়’ সংগঠন মনে করে কোটা সংস্কার আন্দোলন মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী। তদুপরি এই আন্দোলনের সংগঠকেরা একটা মৌলবাদী সংগঠনের সদস্য।
আমি ওদের পরামর্শ দিয়েছিলাম, সংগঠনগুলোকে ওরা যেন পরিষ্কারভাবেই বলে দেয়, কোটা সংস্কার আন্দোলনকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী বলে মনে করলে সেটা প্রকাশ্যে জানিয়ে দেওয়াই তাঁদের রাজনৈতিক কর্তব্য। বাংলাদেশের তরুণ–সমাজের প্রধান দাবিতে পরিণত হওয়া এই আন্দোলন যদি কোনো মৌলবাদী সংগঠনের দখলে চলে যায়, তার মতো বিপজ্জনক কিছু তো প্রগতিশীলদের জন্য হতে পারে না। ওই তরুণ বন্ধুরাও এ ব্যাপারে একমত ছিলেন। কিন্তু রাজনীতির গতিমুখ নির্ধারণী আন্দোলনটিতে প্রগতিশীলদের প্রত্যক্ষ ভূমিকা সর্বজনীন ও দ্বিধাহীন ছিল না।
নিরাপদ সড়ক আন্দোলনকে সমর্থন দিতেও তাঁদের কারও কারও দ্বিধা ছিল। কারণ ওই একই—আমরা কি মৌলবাদীদের ফাঁদে পড়ে যাব? চট্টগ্রাম শহরে নিরাপদ সড়ক কর্মসূচি আয়োজনরত অবস্থায় একটি প্রগতিশীল সংগঠনের সদস্যদের পুলিশের হাতে তুলে দেন আরেকটি প্রগতিশীল সংগঠনের সদস্যরা।
মোটাদাগে এই ছিল প্রগতিশীলদের তরুণ জনগোষ্ঠীর সামনে হাজির হওয়ার বাস্তবতা।
৭
জাতীয় রাজনীতির চিত্রও ভিন্ন ছিল না। এরই ফলাফল ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের পক্ষে গণতন্ত্র মঞ্চের সমাবেশে ওপর পুলিশের হামলা সত্ত্বেও সেটা ছিল এ ধরনের একমাত্র কর্মসূচি এবং এই কর্মসূচি হাসনাত কাইয়ুম বা জোনায়েদ সাকিকে শিক্ষার্থীদের কাছে অনেকটা গ্রহণযোগ্য করে তুললেও সামগ্রিক চিত্রের অবসানে বড় ভূমিকা পালন করতে পারেনি। কারণ, বনেদি বামপন্থীদের বড় অংশটি মোটাদাগে ছিল আন্দোলনের প্রতি বিমুখ।
লাশের সংখ্যা বাড়তে লাগল। শ্রমজীবী ও মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠী রাস্তায় নেমে এল। তখনো এ পরিস্থিতির অবসান ঘটেনি। প্রগতিশীলদের কেউ কেউ ব্যক্তিগতভাবে ভূমিকা নিয়েছেন। বহু ক্ষেত্রে নৈতিক দায়িত্ব হিসেবে মাঠে নামা ব্যক্তিরাও ‘মৌলবাদ’ ও ‘উগ্রবাদের’ উত্থান নিয়ে আতঙ্কিত থেকেছেন।
স্বৈরাচারী সরকারের ‘বি–টিম’ হিসেবে প্রগতিশীলদের যে ভাবমূর্তি তৈরি হয়েছিল, তা উগ্রবাদের উত্থানের বহু কারণের একটি।
৮
ভারতীয় সাংবাদিক ও লেখক খুশবন্ত সিং ১৯৭৩ সালে ঢাকা সফরকালে ভারতবিরোধী ও সরকারবিরোধী মনোভাব লক্ষ করেন। বাংলাদেশ, আফটার দ্য ফার্স্ট ইয়ার: উইল ইট এভার বি আ ওয়ার্কেবল কান্ট্রি নামে নিউইয়র্ক টাইমস–এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে খুশবন্ত সিংয়ের মনোজগৎও এখনকার অধিকাংশ বামপন্থীর মতো: ভারত এত উপকার করেছে, তবু কেন এত ভারতবিদ্বেষ! তিনি বিদ্বেষ খেয়াল করেছেন, কিন্তু কারণ তলিয়ে দেখেননি।
ঢাকায় কেন ট্যাক্সি নেই?—খুশবন্ত সিংয়ের এ প্রশ্নের উত্তরে এক ব্যক্তি বলেছেন, ‘কিছু ট্যাক্সি পাকিস্তানিরা পুড়িয়ে দিয়েছে, বাকিগুলো ভারতে।’ খুশবন্তের প্রশ্নের জবাবে জনগণের এই অনুভূতিকে মাওলানা ভাসানী ভাষা দিয়েছিলেন এভাবে: ‘পাকিস্তানিরা আমাদের লুট করেছে, তোমরা তাদের লুট করেছ।’ এমনকি আওয়ামী লীগের মিত্র অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদও খুশবন্তকে পরিষ্কার বলেন, বাংলাদেশের দুর্নীতিপরায়ণ সরকারের প্রতি ভারতের সমর্থনই জনগণকে বিদ্বিষ্ট করে তুলছে।
তারপরও শেখ মুজিবুর রহমানের শাসনামলে সরকারবিরোধী আন্দোলনে প্রগতিশীলদের সক্রিয় ভূমিকা, খেতমজুর ও শ্রমিকদের আন্দোলন প্রভৃতির কল্যাণে সরকারের ছোট শরিকের ভাবমূর্তি থেকে তাদের বড় একটা অংশ রক্ষা পেয়েছিল। কিন্তু এবারের গণ–অভ্যুত্থানের সময় এই চিত্র ছিল নাজুক।
৯
জুলাই গণ–অভ্যুত্থান শুধু বাংলাদেশের ইতিহাসেই নয়, সম্ভবত পৃথিবীর ইতিহাসের স্বতঃস্ফূর্ত গণ–অভ্যুত্থানগুলোর একটা। এখানে কোনো রাজনৈতিক দলেরই নির্ধারক ভূমিকা ছিল না। অন্তর্বর্তী সরকারের শুরুর দিকে বাংলাদেশের ডানপন্থী অংশটি রাষ্ট্রের ওপর যথাসম্ভব চাপ তৈরি করে যা কিছু সম্ভব সাধ্যাতীত পরিমাণে তা আদায় করে নিতে সক্ষম হয়েছে।
কিন্তু অভ্যুত্থানকালে সামষ্টিকভাবে দুর্বল, দ্বিধাগ্রস্ত বা নেতিবাচক ভূমিকার কারণে রাষ্ট্রীয় নানা নীতি নির্ধারণে উদারপন্থী ও প্রগতিশীলেরা অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে বড় কোনো ভূমিকা পালনে ব্যর্থ হয়েছেন।
বাংলাদেশ এতে ভুক্তভোগী হয়েছে। প্রগতিশীল শক্তিগুলো অভ্যুত্থানে যথাযথ ভূমিকা রাখলে অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষে মাজারে হামলা, নারীদের ওপর আক্রমণ, বাউলদের হেনস্তা, গণমাধ্যমে আগুন দেওয়া ইত্যাদি ঘটনা প্রতিহত করা শুধু অনেক সহজ হতো না, বাংলাদেশের সমাজে যে এর সমর্থন গৌণ—তা প্রমাণিত হতো। অথচ সেই নৈতিক শক্তিই তাঁরা হারিয়ে ফেলছিলেন। অভ্যুত্থানের পরে তাঁদের আত্মবিশ্বাস শুধু নাজুকই হয়ে পড়েনি, অনেকের রাজনৈতিক অস্তিত্বই বিপন্ন হয়েছে।
দুঃখজনক হলেও সত্য, বাংলাদেশের রাষ্ট্রকাঠামো, সংবিধান, ব্যবস্থাগত সংস্কারের আলাপেও হাতে গোনা কিছু সংগঠন ছাড়া প্রগতিশীলেরা কোনো নির্ধারণী ভূমিকা পালন করতে পারেননি। এসব বিষয়ে কোনো বুদ্ধিবৃত্তিক প্রস্তুতি, প্রস্তাব বা উপলব্ধিও তাঁদের মধ্যে দেখা যায়নি।
১০
উদার ও প্রগতিশীলদের উল্লেখযোগ্য অংশ যে কোটারি রাজনীতির সহযোগীর ভূমিকা পালন করেছেন, তারই যবনিকাপাত ঘটেছে চব্বিশের গণ–অভ্যুত্থানে।
প্রগতিশীলেরা দুর্বল হলে তা দেশের জন্য শুধু বিপজ্জনকই নয়, উপমহাদেশের সামগ্রিক রাজনীতিতেও এর প্রভাব খুবই নেতিবাচক হবে। অন্যদিকে মুক্তিযুদ্ধকে কোনো পরিবার বা দলের সংকীর্ণ স্বার্থে ব্যবহার করা যাবে না, ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক আত্মমর্যাদার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হবে—এগুলো এখন বাংলাদেশের রাজনীতির ন্যূনতম নির্ণায়কে পরিণত হয়েছে। গণ–অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের মানুষ এটাও প্রমাণ করেছে যে মুক্তিযুদ্ধ ও রাষ্ট্রীয় প্রতীকগুলোর প্রশ্নে কোনো আপস চলবে না। এসব ক্ষেত্রে ডানপন্থীদের তৎপরতা জনগণের ক্ষোভের মুখে পরাস্ত হয়েছে।
এই অভিজ্ঞতা উপলব্ধি করে বাংলাদেশের প্রগতিশীলদের নতুনভাবে ভাবতে হবে এবং নিজেদের গোছানোর চেষ্টা করতে হবে। পুরোনো ভার কাঁধে নিয়ে এগোনো কঠিন।
ফিরোজ আহমেদ: লেখক ও রাজনৈতিক সংগঠক