জামায়াতের সঙ্গে ইসলামী আন্দোলনের আসন সমঝোতা চূড়ান্ত হয়নি

নির্বাচনী আসন সমঝোতা নিয়ে জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মধ্যে দূরত্ব পুরোপুরি ঘোচেনি। আসন বণ্টন নিয়ে আরও দু–একটি দলের অসন্তোষ থাকায় ৩০০ আসনের সমঝোতা এখনো চূড়ান্ত হয়নি। এমন অবস্থায় দুই দলের শীর্ষ নেতাদের হস্তক্ষেপে আবার আলোচনা শুরু হয়েছে। দুই দলই দ্রুত সমঝোতায় পৌঁছানোর পক্ষে কথা বলছে।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল অনুযায়ী মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ সময় ছিল ২৯ ডিসেম্বর। মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের সুযোগ থাকবে ২০ জানুয়ারি পর্যন্ত। এই সময়সীমা সামনে রেখে আসন সমঝোতা চূড়ান্ত করার চাপ বাড়ছে জোটভুক্ত দলগুলোর ওপর।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, সমঝোতা আলোচনার শুরুতে ইসলামী আন্দোলন শতাধিক আসনের দাবি তোলে। অন্য দলগুলোর চাহিদাও তুলনামূলক বেশি ছিল। কিন্তু একপর্যায়ে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) নির্বাচনী আসন সমঝোতায় যুক্ত হওয়ায় ইসলামী আন্দোলনসহ কয়েকটি দলের মধ্যে আসনসংখ্যা নিয়ে অস্থিরতা ও অসন্তোষ তৈরি হয়।

আসন বণ্টন নিয়ে আগের সংকট পুরোপুরি কাটেনি। সমঝোতা না হওয়া কিছু আসনে সব দলের সম্মিলিত জরিপ করার কথা ছিল, সেটি এখনো হয়নি। সব মিলিয়ে আসন সমঝোতার বিষয়টি চূড়ান্ত হতে আরও কিছুটা সময় লাগবে।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক

২৮ ডিসেম্বর আট দলের ব্যানারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান জানান, এনসিপি এবং কর্নেল (অব.) অলি আহমদের নেতৃত্বাধীন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি) আসন সমঝোতায় যুক্ত হচ্ছে। এতে সমঝোতায় থাকা দলের সংখ্যা আট থেকে বেড়ে দাঁড়ায় দশে। পরে আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি) যুক্ত হলে দলের সংখ্যা দাঁড়ায় ১১। ফলে আসন সমঝোতা নিয়ে নতুন হিসাব–নিকাশ শুরু হয়।

সমঝোতার আলোচনা চলার মধ্যেই জামায়াত ২৭৬টি আসনে এবং ইসলামী আন্দোলন ২৬৮টি আসনে প্রার্থী দিয়ে মনোনয়নপত্র জমা দেয়। পাশাপাশি এনসিপি ৪৪টি, এবি পার্টি ৫৩টি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ৯৪টি, খেলাফত মজলিস ৬৮টি, এলডিপি ২৪টি, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন ১১টি, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি ৬টি, জাগপা ৩টি এবং বিডিপি ২টি আসনে মনোনয়নপত্র জমা দেয়।

বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক রোববার প্রথম আলোকে বলেন, আসন বণ্টন নিয়ে আগের সংকট পুরোপুরি কাটেনি। সমঝোতা না হওয়া কিছু আসনে সব দলের সম্মিলিত জরিপ করার কথা ছিল, সেটি এখনো হয়নি। সব মিলিয়ে আসন সমঝোতার বিষয়টি চূড়ান্ত হতে আরও কিছুটা সময় লাগবে। তবে সবার মধ্যে নমনীয় মনোভাব দেখা গেছে। সমঝোতার আলোচনা তিন-চার দিনের মধ্যে একটা পর্যায়ে পৌঁছাবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

ইসলামী আন্দোলনে অসন্তোষ

মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার পরদিনই অসন্তোষ প্রকাশ করেন ইসলামী আন্দোলনের জ্যেষ্ঠ নায়েবে আমির সৈয়দ মুহাম্মাদ ফয়জুল করীম। তিনি দাবি করেন, তাঁদের দল ১৪৩টি আসনে ‘এ’ ক্যাটাগরিতে রয়েছে, কিন্তু সে অনুযায়ী সমঝোতা হচ্ছে না। তিনি বলেছিলেন, তাঁর দল কেন জামায়াতের কাছে আসন চাইবে। এক বাক্স নীতি প্রথম ঘোষণা করে ইসলামী আন্দোলন। কাউকে আসন দেওয়ার কথা উঠলে ইসলামী আন্দোলন দিচ্ছে কি না, সেই প্রশ্ন আসবে।

ইসলামী আন্দোলনের নেতাদের একটি অংশের ধারণা, জামায়াত এনসিপিকে তুলনামূলক বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। সমঝোতায় এনসিপিসহ নতুন তিনটি দল যুক্ত হওয়ায় আসন ছাড়ের বিষয়টি নতুন করে বিবেচনা করতে হচ্ছে। এতে আগে যত আসনে প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল, সেখান থেকে সংখ্যা কমাতে হচ্ছে। এ নিয়ে ইসলামী আন্দোলনের পাশাপাশি কয়েকটি দলের তৃণমূল নেতা-কর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। কিছু এলাকায় জামায়াতের তৃণমূলেও অসন্তোষের কথা শোনা যাচ্ছে।

দলীয় সূত্র জানায়, আট দলের সর্বশেষ বৈঠকের পর জামায়াত ইসলামী আন্দোলনকে ৩৫ থেকে ৪০টি, এনসিপিকে ৩০টি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসকে ১১টি, খেলাফত মজলিসকে ৩টি, এবি পার্টিকে ৩টি, এলডিপিকে ২টি এবং বিডিপিকে ২টি আসন ছাড়ের কথা বলে। এই প্রেক্ষাপটে ইসলামী আন্দোলন একপর্যায়ে সমঝোতার আলোচনা থেকে সরে যাওয়ার ইঙ্গিত দেয়। এর পরপরই দুই দলের অনুসারীদের মধ্যে পক্ষে-বিপক্ষে বক্তব্য শুরু হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আক্রমণাত্মক পোস্টও ছড়িয়ে পড়ে।

ইসলামী আন্দোলনের নেতাদের একটি অংশের ধারণা, জামায়াত এনসিপিকে তুলনামূলক বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। সমঝোতায় এনসিপিসহ নতুন তিনটি দল যুক্ত হওয়ায় আসন ছাড়ের বিষয়টি নতুন করে বিবেচনা করতে হচ্ছে। এতে আগে যত আসনে প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল, সেখান থেকে সংখ্যা কমাতে হচ্ছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ইসলামী আন্দোলনের একজন কেন্দ্রীয় নেতা প্রথম আলোকে বলেন, শুরু থেকেই যোগ্যতা ও জনপ্রিয়তার ভিত্তিতে আসন ছাড়ের কথা ছিল। কোনো দলের প্রার্থী যদি ২০টি আসনে যোগ্য হয়, তবে তাকে ২০টিই দেওয়া উচিত। আবার কেউ ৮০ আসনে যোগ্য হলে সেটিও বিবেচনায় নিতে হবে।

অন্যদিকে জামায়াতের একজন কেন্দ্রীয় নেতা বলেন, ইসলামী আন্দোলন ৭০-৭৫টি আসন চাইছে, যেটি বাস্তবসম্মত নয়। এখানে তৃতীয় কোনো পক্ষের ইন্ধন আছে কি না, সেটিও ভাবা দরকার। অতীতের নির্বাচনগুলোতে বিভিন্ন ষড়যন্ত্র হয়েছে। আগামী নির্বাচন কেন্দ্র করেও একই রকম ষড়যন্ত্র হচ্ছে। যারা ইসলামী দলগুলোকে এক প্ল্যাটফর্মে দেখতে চায় না, তারাই এসব ষড়যন্ত্র করছে।

আট দলের বৈঠকে উপস্থিত থাকেন ইসলামী আন্দোলনের এমন একজন নেতা প্রথম আলোকে বলেন, আসন সমঝোতা না হলে ইসলামী ঐক্য ক্ষতিগ্রস্ত হবে, এ বিষয়ে সবাই একমত। কিছুটা অস্বস্তি থাকলেও পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হচ্ছে।

গতকাল জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের বৈঠকে আসন সমঝোতা নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে। জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ প্রথম আলোকে বলেন, মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার পর্যন্ত সময় আছে। তার আগেই সমঝোতা চূড়ান্ত করার চেষ্টা আছে।

শেষ পর্যন্ত সমঝোতার আলোচনা চূড়ান্ত হবে কি না, জানতে চাইলে ইসলামী আন্দোলনের আমির সৈয়দ মুহাম্মাদ রেজাউল করীম রোববার প্রথম আলোকে বলেন, এটি পরিবেশ-পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করছে। ইসলাম, দেশ এবং মানবতার জন্যই সমঝোতা করবে ইসলামী আন্দোলন। এই তিনটি ব্যাহত হলে বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করা হবে।

এনসিপি ও এবি পার্টি

আসন সমঝোতা নিয়ে এলডিপির তেমন প্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি। তবে আসনসংখ্যা নিয়ে এনসিপির মধ্যে কিছুটা সংশয় দেখা দিয়েছে। আর এবি পার্টির মতে, আসন সমঝোতা এখনো স্পষ্ট নয়।

রাজনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, এনসিপি ও এবি পার্টি সমঝোতা আলোচনায় ৫০টি আসন চেয়েছিল। তবে জামায়াত আলাদা করে এনসিপির সঙ্গে বৈঠক করে তাদের ৩০টি আসন ছাড় দেওয়ার বিষয়ে রাজি করায়। এসব আসনে প্রার্থী দেওয়া হবে না বলে তাদের জানানো হয়। তবে কোন ৩০টি আসনে সমঝোতার আলাপ হয়েছে, তা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়নি।

এনসিপি সূত্রে যে ৩০টি আসনের তথ্য পাওয়া গেছে, সেগুলোর বেশির ভাগ আসনেই জামায়াতের প্রার্থীরা মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। এ জন্য শেষ মুহূর্তে এনসিপিও ৪৪টি আসনে প্রার্থী দিয়ে রেখেছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এনসিপির একজন কেন্দ্রীয় নেতা প্রথম আলোকে বলেন, জামায়াতের দিক থেকে তাঁদের ৩০টি আসন ছাড়ার ব্যাপারে আশ্বস্ত করা হয়েছিল। কিন্তু বিভিন্ন মাধ্যমে ইঙ্গিত দেওয়া হচ্ছে যে এনসিপির জন্য এই আসন আরও কমতে পারে। কিন্তু এনসিপি চাইছে আসন যেন কোনোভাবেই ৩০-এর নিচে না যায়। সে জন্য তাঁরা ৪০ আসনের জন্য জামায়াতের ওপর চাপ রাখছেন।

অন্যদিকে এবি পার্টির সঙ্গে তিনটি আসনে সমঝোতা করতে চায় জামায়াত। তবে এবি পার্টি মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছে ৫৩টি আসনে। এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু প্রথম আলোকে বলেন, আট দলের সঙ্গে এখনো এবি পার্টির আনুষ্ঠানিক বৈঠক হয়নি। শুধু জামায়াত নেতাদের সঙ্গে এবি পার্টি ও এনসিপির আলাদা বৈঠক হয়েছে। জোটের নাম, জোটের রাজনৈতিক লক্ষ্য, আসনসংখ্যা ও সমঝোতার বিষয়গুলো এখনো চূড়ান্ত নয়। সমঝোতার আলোচনা চলমান রয়েছে।