ভিন্ন মত, ভিন্ন আদর্শ প্রকাশ করার স্বাধীনতা থাকবে—এমন বাংলাদেশের প্রত্যাশা করেন জাইমা রহমান। তিনি বলেছেন, বাংলাদেশ যেন সবার জন্য হয়। যেখানে বিভিন্ন মানুষ তাদের ভিন্ন ভিন্ন মত ও আদর্শ প্রকাশ করার স্বাধীনতা পাবে। নানা মত, সংস্কৃতি, ভাবনা আর নানা ধরনের মানুষের যে বৈচিত্র্য, তাকে হারিয়ে ফেলা যাবে না। আজ সোমবার বিকেলে রাজধানীর বনানীতে ডিওএইচএস প্লেগ্রাউন্ডে তরুণ ভোটারদের সঙ্গে চায়ের আড্ডায় এক প্রশ্নের জবাবে নিজের বাংলাদেশ ভাবনা জানাতে গিয়ে তিনি এসব কথা বলেন।
ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ নিয়ে তরুণ ভোটারদের ভাবনা জানতে এই আড্ডার আয়োজন করে বিএনপি। আড্ডায় মোট ৫৫ জন তরুণ ভোটার অংশ নেন। ছয়টি টেবিলে তাঁদের বসানো হয়। আলাপের এ অনুষ্ঠানে কোনো মঞ্চ ছিল না। বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের কন্যা জাইমা রহমান প্রতিটি টেবিলে যান এবং সেখানে বসে আলাদা আলাদাভাবে তাঁদের কথা শোনেন। বাসযোগ্য ঢাকা নিয়ে তরুণদের ভাবনা জানতে চান তিনি। তাঁদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তরও দেন। এ আয়োজনে কোনো সাউন্ড সিস্টেমও ব্যবহার করা হয়নি।
অনলাইনে নারীদের হয়রানি
তরুণ ভোটারদের সঙ্গে আড্ডায় শিক্ষা, কর্মসংস্থান, পরিবেশসহ বিভিন্ন বিষয় উঠে আসে। একাধিকবার উঠে আসে সাইবার স্পেসে নারীদের হয়রানির বিষয়টি। আড্ডায় অংশ নেওয়া নারী ভোটাররা জাইমা রহমানকে জানান, নারীরা বিভিন্নভাবে সাইবার মাধ্যমে প্রতিনিয়ত হয়রানির শিকার হচ্ছেন। তবে প্রতিকার পাওয়ার হার কম।
এ প্রসঙ্গে জাইমা রহমান বলেন, দেশের মোট জনসংখ্যার ৫১ শতাংশ নারী। নারীদের নিরাপত্তা ‘নাম্বার ওয়ান প্রায়োরিটি’। তাদের কথা বলার অধিকার, নিরাপত্তা, অন্তর্ভুক্তি নিয়ে ভাবতে হবে।
জাইমা রহমান মনে করেন, সব পক্ষের সদিচ্ছা থাকলে ‘সাইবার বুলিং’ কমানো সম্ভব। তিনি বলেন, প্রথমত এ ধরনের ঘটনা ঘটার পরে কী করতে হবে, সে বিষয়ে মানুষকে জানাতে হবে। স্কুল পর্যায় থেকে এগুলো জানানো হলে ছোট থেকেই সচেতনতা তৈরি হবে। এর সঙ্গে শেখাতে হবে ‘সাইবার বুলিং’ খারাপ।
শুধু আইন থাকলেই হবে না উল্লেখ করে জাইমা রহমান বলেন, সেটার প্রয়োগ থাকতে হবে। সাধারণ নাগরিকের সেটি জানতে হবে, বুঝতে হবে। তাদের সচেতনতাটা প্রয়োজন। তা ছাড়া ফেসবুকসহ বড় প্ল্যাটফর্মগুলোর কার্যক্রম (স্থানীয় কার্যালয়) বাংলাদেশে নেই। এসব অনলাইন প্ল্যাটফর্মকে এ দেশে নিয়ে আসতে হবে।
পরিবেশদূষণ
ঢাকা নিয়ে আলোচনায় তরুণেরা জানান, তাঁরা যানজটমুক্ত ও নির্মল পরিবেশের ঢাকা দেখতে চান। এ সময় বায়ুদূষণের প্রসঙ্গটি তোলেন জাইমা রহমান। তিনি জানান, তাঁর নিজেরও আগে ঢাকায় থাকার সময় শ্বাসকষ্টের সমস্যা (অ্যাজমা) ছিল। তিনি বলেন, ঢাকায় গাছপালা অনেক কমে গেছে।
তরুণেরা তাঁকে বলেন, খাল–বিল, নদী–নালা প্রতিনিয়ত দখল হয়ে যাচ্ছে, ভরাট হয়ে যাচ্ছে। দখল ও দূষণে নাকাল এসব জলাধার সংস্কারে উদ্যোগের কথা বলেন জাইমা রহমান। তরুণদের কাছে তিনি জানতে চান, এ কাজে তরুণেরা এগিয়ে আসবেন কি না। জবাবে তরুণেরা তাঁদের আগ্রহের কথা জানান।
নিরাপদ সড়ক, যানজট প্রসঙ্গ
আড্ডায় ঢাকার সড়কের নিরাপত্তা নিয়েও কথা বলেন তরুণ ভোটাররা। ঢাকা শহরের সড়ককে আরও নিরাপদ করতে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা স্বেচ্ছাশ্রম দিতে প্রস্তুত বলে জানান তাঁরা।
সড়কের যানজটের ভোগান্তি নিয়ে নিজেদের অভিজ্ঞতার কথা জাইমা রহমানকে জানান তরুণ ভোটাররা। একজন নারী শিক্ষার্থী তাঁকে বলেন, যানজটের কারণে তাঁর বাসা থেকে অনুষ্ঠানস্থল পর্যন্ত আসতে দুই ঘণ্টা সময় লেগেছে। এ কথা শুনে অবাক হন জাইমা রহমান।
কর্মসংস্থান, শিক্ষাভাবনা
তরুণ ভোটারদের ভাবনার একটি বড় অংশ জুড়ে ছিল দেশের শিক্ষাব্যবস্থা ও কর্মসংস্থান নিয়ে উদ্বেগ। আড্ডায় জাইমা রহমানকে সে কথাই জানান তাঁরা। জাইমা রহমান বলেন, সরকারি–বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের অংশীদারত্বে ‘ইন্টার্নশিপ’, ‘মেন্টরশিপ’–এর মতো কার্যক্রম থাকলে কর্মজীবনে প্রবেশের আগে শিক্ষার্থীরা ব্যবহারিক শিক্ষায় দক্ষতা বাড়াতে পারবে। এ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রশাসনিক সদিচ্ছা থাকতে হবে।
‘কমিউনিটি স্পেস’
আড্ডায় কথা বলার ফাঁকে ফাঁকে চা, ঝালমুড়ি, শিঙাড়া, ফুচকার মতো মুখরোচক খাবারের আয়োজন ছিল। তরুণ ভোটাররা খাবারের স্টলগুলোতে গিয়ে খাবার খাচ্ছিলেন। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকা শহরের বিনোদনকেন্দ্রের ঘাটতির কথা আলোচনায় তোলেন তাঁরা। জাইমা রহমানকে তাঁরা জানান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বাইরে তাঁদের খেলাধুলা, আড্ডা দেওয়ার মতো জায়গা নেই।
এ বিষয়ে জাইমা রহমান বলেন, ঢাকা শহরে লাইব্রেরি, পার্কের মতো ‘কমিউনিটি স্পেস’ তৈরি করা দরকার। সেখানে মানুষ আসবে, একে অপরের সঙ্গে মিশতে পারবে। তাহলে একদিকে যেমন নিরাপত্তার দিক দিয়ে সুবিধা পাওয়া যাবে, অন্যদিকে মানুষ এখন যেমন সব সময় মুঠোফোনে ব্যস্ত থাকে, সেটা থেকে বের হওয়া যাবে।
অভিভূত জাইমা রহমান
বাংলাদেশ নিয়ে তরুণ ভোটারদের ভাবনা জেনে, তাঁদের মতামত শুনে আড্ডায় নিজের ভালো লাগার কথা জানান জাইমা রহমান। তরুণদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আমি খুব ছোটবেলায় চলে গিয়েছিলাম। আর ১৭ বছর পরে এসেছি। মাঝখানে আর আসা হয়নি। কিন্তু খোঁজ রাখতাম অবশ্যই, দেখতাম সবকিছু। মেইনলি আপনাদের মতো এত এনার্জেটিক, ইন্সপিরেশনাল, ভেরি ব্রিলিয়ান্ট তরুণেরা যাঁরা আছেন, এটা নতুনভাবে দেখছি।...আপনাদের মধ্যে এত আইডিয়া আছে, এনার্জি আছে, এত কিছু করার ইচ্ছা আছে, সেটা দেখে খুব ভালো লাগছে।’