জ্বালানি তেলের সংকট নিয়ে সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বিতর্ক
জ্বালানিসংকট নিয়ে জাতীয় সংসদে কোন বিধিতে আলোচনা হবে—এ প্রশ্নে বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের মধ্যে বিতর্ক হয়েছে। এক দিন বৈঠকের নিয়মিত কার্যক্রম মুলতবি রেখে বিষয়টি নিয়ে আলোচনার নোটিশ দিয়েছিল বিরোধী দল। তবে শেষ পর্যন্ত সরকারি দল ও বিরোধী দল সম্মত হয়েছে যে নিয়মিত কার্যক্রম মুলতবি না করে বিষয়টি নিয়ে আগামী তিন দিনের মধ্যে এক ঘণ্টা আলোচনা হবে।
আজ সোমবার জাতীয় সংসদে এ অনির্ধারিত বিতর্কের এক পর্যায়ে ৩০ মার্চ জ্বালানিমন্ত্রীর দেওয়া বিবৃতির কথা উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, দেশে জ্বালানি তেল ও গ্যাসের কোনো সংকট নেই, সেটা পরিসংখ্যান দিয়ে দেখানো হয়েছে।
অন্যদিকে বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান বলেন, জ্বালানিমন্ত্রী সংসদে ৩০০ বিধিতে যে বিবৃতি দিয়েছেন, বাস্তবের সঙ্গে তার কোনো মিল খুঁজে পাওয়া যায়নি। তিনি বলেন, কোনো সংকট নেই, এটা আসলে সংসদের ভেতরে নেই। সংকটটা সংসদের বাইরে।
গতকাল বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান একটি মুলতবি প্রস্তাবের নোটিশ দিলে এ বিতর্কের সূচনা হয়। জ্বালানিসংকট এবং এর ফলে জনজীবনে সৃষ্ট সংকট নিয়ে সংসদে আলোচনার জন্য ওই মুলতবি প্রস্তাবের নোটিশটি আনা হয়। চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনের নুরুল ইসলামও একই ধরনের একটি প্রস্তাব আনেন। মুলতবি প্রস্তাব গ্রহণ করা হলে অধিবেশনের নিয়মিত কার্যক্রম স্থগিত রেখে প্রস্তাবের বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়।
তবে অধিবেশনের সভাপতি ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল প্রস্তাব দুটি আলোচনার জন্য গ্রহণ না করে বলেন, ইতিমধ্যে বিষয়টি নিয়ে সংসদে বিভিন্ন বিধিতে আলোচনা হয়েছে। সংশ্লিষ্টমন্ত্রী ৩০০ বিধিতে বিবৃতি দিয়েছেন। এরপরও আলোচনা করতে হলে যথাযথ বিধিতে নোটিশ আনলে আলোচনা হতে পারে।
জবাবে বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান বলেন, বিষয়টি জাতীয় জীবনে একটি অতীব গুরুত্বপূর্ণ। বিষয়টি তাঁরা আরও দু-একবার নোটিশে আনার চেষ্টা করেছেন। ৭১ বিধিতে সুযোগ দেওয়া হয়নি। তিনি বলেন, ‘এখনো যদি এভাবে পাশ কাটিয়ে যাওয়া হয়, তাহলে জনগণের কথা কি এখানে আমরা সবাই মিলে আলোচনা করতে পারব না?’ কাউকে দোষারোপের জন্য তাঁরা এ আলোচনা করতে চাইছেন না—উল্লেখ করে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, ‘যদি এই সুযোগই দেওয়া না হয়, তাহলে আমরা কী ধরে নেব? আমরা ধরে নেব যে জনজীবনে যে প্রবলেমটা সবচেয়ে বার্নিং, সেটা নিয়ে এই সংসদে আলোচনা করতে পারলাম না। এটা কি আমাদের জন্য একটা দুর্ভাগ্য হবে না?’
জ্বালানিমন্ত্রী সংসদে ৩০০ বিধিতে যে বিবৃতি দিয়েছেন বাস্তবের সঙ্গে তার কোনো মিল খুঁজে পাননি—উল্লেখ করে বিরোধীদলীয় নেতা প্রশ্ন রাখেন, ‘সেই বিবৃতি দিয়ে কী হবে? এই বিবৃতিতে কী সমস্যার সমাধান হবে? একদিকে বলা হচ্ছে, তেলের কোনো সংকট নেই। আরেক দিকে বাস্তবে যেটা ঘটছে, তা সম্পূর্ণ ভিন্ন।’
বিরোধী দলের কোনো নোটিশ বিবেচনায় নেওয়া না হলে তাঁরা সংসদে থাকবেন কেন—এমন প্রশ্ন রেখে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, জনগণের প্রয়োজন পূরণ করতে না পারলে সংসদে থাকার স্বার্থকতা নেই। সংসদের প্রতিটি সেকেন্ডে জনগণের টাকা খরচ হচ্ছে। তিনি তাঁর নোটিশটি দু–এক দিন পর আলোচনার জন্য নির্ধারণ করার অনুরোধ করেন।
জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, বিরোধীদলীয় নেতার প্রস্তাবটি অবশ্যই আলোচনার যোগ্য। এটি জাতীয় জীবনে জরুরি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও বটে। অধিবেশনের কার্যক্রম মুলতবি না করে অন্যভাবে বিষয়টি নিয়ে আলোচনার সুযোগ আছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতির ইতিহাসে খুব বেশি হলে দু-চারবার মূলতবি প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হয়েছে। চলতি সংসদের প্রথম অধিবেশনে দুটি মূলতবি প্রস্তাব আলোচনা হয়েছে। এটা ইতিহাসে অনন্য নজির। আরেকটি মুলতবি প্রস্তাব নিয়ে আলোচনার সুযোগ দেওয়া হলে ভবিষ্যতে এটা অনুসরণ করার চেষ্টা করা হবে। তিনি জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালি বিধির ৭১ ধারায় নোটিশ দেওয়া বা ৬৮ বিধি অনুযায়ী আলোচনা করার সুযোগ দেওয়ার পক্ষে মত দেন।
জ্বালানিমন্ত্রীর বিবৃতির কথা উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘মন্ত্রীর ৩০০ বিধিতে বিবৃতি দেওয়ার পরে এবং দীর্ঘ বিবৃতি দিয়েছেন, সেটা জাতির কাছে পরিষ্কার...আমাদের দেশে জ্বালানি তেল ও গ্যাসের কোনো সংকট নেই। সেটা আমরা পরিসংখ্যান দিয়ে দেখিয়েছি। মন্ত্রী দেখিয়েছেন।’
সরকার তেলের দাম কিছুটা বাড়াতে বাধ্য হয়েছে
সহনীয় মাত্রায় জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়েছে উল্লেখ করে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, একেবারে শেষের দিকে এসে শৃঙ্খলার মধ্যে আনার জন্য বা পাচার বন্ধ করতে সরকার তেলের দাম কিছুটা বাড়াতে বাধ্য হয়েছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের জবাবে বিরোধিদলীয় নেতা শফিকুর রহমান বলেন, ‘স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী খুব সুন্দর করেই বলেছেন, কোনো সংকট নেই। এটা আসলে সংসদের ভেতরে নেই। সংকটটা আমাদের সংসদের বাইরে। সংকট আছে বলে জ্বালানি সাশ্রয়ের উদ্দেশ্যে হাইকোর্টের মতো খুবই স্পর্শকাতর জায়গায় দুই দিন ভার্চ্যুয়ালি কোর্ট বসছে।’
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সব বক্তব্যের জবাব দিতে চান না উল্লেখ করে শফিকুর রহমান বলেন, সংকটটা সরকারের সৃষ্টি নয়, এটি বৈশ্বিক বিষয়। তাঁরা এটা বোঝেন। সব দায়িত্বই যদি এককভাবে সরকারি দল পালন করে, বিরোধী দল কোনো সুযোগ পাবে না। তিনি জানান, ৬৮ বিধিতে তিনি নোটিশ দিতে পারেন। সংসদ নেতার উপস্থিতিতে বিষয়টি নিয়ে আলোচনার সময় নির্ধারণের অনুরোধ করেন তিনি।
জবাবে ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও আলোচনা করতে চান। বিষয়টি হচ্ছে এই আলোচনা সংসদের বৈঠক মুলতবি করে হবে কি না। সংসদের কার্যক্রম মূলতবি না করেও আলোচনা হতে পারে, আধা ঘণ্টার জায়গায় এক–দেড় ঘণ্টা আলোচনা হতে পারে।
জবাবে বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান ডেপুটি স্পিকারের উদ্দেশে বলেন, তাঁরা এটা মেনে নিয়েছেন। এ বিষয়ে নোটিশ দেবেন। তবে সংসদ নেতার উপস্থিতিতে তাঁরা আলোচনা করতে চান।
পরে স্পিকার বলেন, বিরোধীদলীয় নেতা নোটিশ দিলে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে। অর্থবহ আলোচনার জন্য যা করণীয়, সংসদ তাই করবে।