‘বিদ্রোহী’ সেলিমের চাপে বাগেরহাটে বিএনপি
বাগেরহাটে সংসদীয় আসন চারটি। চারটিতেই বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী। তিনটিতে ভোট করছেন বিএনপির বিদ্রোহী এম এ এইচ সেলিম।
নির্বাচনী আইন অনুসারে, তাঁরা স্বতন্ত্র প্রার্থী। কিন্তু স্থানীয় ভোটাররা চেনেন তাঁদের বিএনপির ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী হিসেবে। এসব বিদ্রোহী প্রার্থীর কারণে চাপে পড়েছে বাগেরহাট বিএনপি। জেলার চারটি আসনের সব কটিতেই দলটির বিদ্রোহী প্রার্থীরা যেন বিএনপির প্রার্থীদের গলার কাঁটা হয়ে মাঠে রয়েছেন।
বিদ্রোহী প্রার্থীদের মধ্যে বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য এম এ এইচ সেলিম একাই তিনটি আসনে নির্বাচন করছেন। তিনি সিলভার লাইন গ্রুপের মালিক। ২০০১ সালে বিএনপির হয়ে চারদলীয় জোটের প্রার্থী হিসেবে বাগেরহাট–২ আসনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। তিনি বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের একসময়ের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ছিলেন, কিন্তু এবার দলীয় মনোনয়ন পাননি।
বাগেরহাট জেলায় সংসদীয় আসন চারটি। নির্বাচনী আইন অনুসারে, একজন প্রার্থী সর্বোচ্চ তিনটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেন। ব্যবসায়ী এম এ এইচ সেলিম সর্বোচ্চ তিনটি আসনে স্বতন্ত্র নির্বাচন করছেন। এবারের ভোটে বড় দলগুলোর মধ্যে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান বগুড়া ও ঢাকার একটি আসন মিলে সর্বোচ্চ দুটি আসনে ভোট করছেন। স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে কারও একাধিক আসনে ভোট করার ঘটনা নেই।
এম এ এইচ সেলিমের ঘনিষ্ঠরা বলছেন, তিনি মূলত বাগেরহাট-২ (সদর-কচুয়া) ও বাগেরহাট–১ (চিতলমারী–ফকিরহাট–মোল্লাহাট) আসনকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। বাগেরহাট–৩ (মোংলা ও রামপাল) আসনে তাঁর কার্যক্রম খুব একটা নেই। তবে বাগেরহাট ১ ও ২ আসনে তিনি বিএনপির প্রার্থীদের চাপে ফেলে দিয়েছেন।
এর বাইরে বাগেরহাট–১ আসনে বিএনপির আরেকজন বিদ্রোহী প্রার্থী দলের জেলা আহ্বায়ক কমিটির সদস্য মাছুদ রানা। বাগেরহাট–৪ (মোরেলগঞ্জ–শরণখোলা) আসনে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে মাঠে আছেন দলের জেলা আহ্বায়ক কমিটির আরেক সদস্য কাজী খায়রুজ্জামান।
বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান খুলনায় নির্বাচনী সফর করে গেছেন। সেখানে বাগেরহাটের দলীয় প্রার্থীরা উপস্থিত ছিলেন; কিন্তু তিনি পাশের জেলা বাগেরহাটে আসেননি। বিএনপির কর্মী–সমর্থকদের ধারণা, দলীয় বিভেদের কারণে তারেক রহমান বাগেরহাট আসেননি।
বিএনপির বিদ্রোহী ও বিভেদের কারণে জামায়াতের প্রার্থীরা সুবিধা পেতে পারে বলে মনে করছেন স্থানীয় ভোটাররা।
বাগেরহাট–২ আসনে ত্রিমুখী লড়াই
এই আসনে বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছেন জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য ও আইনজীবী শেখ মোহাম্মদ জাকির হোসেন। জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী হয়েছেন দলটির তরুণ নেতা শেখ মনজুরুল হক। স্বতন্ত্র প্রার্থী এম এ এইচ সেলিম।
বিএনপি, জামায়াত ও স্বতন্ত্র—তিন প্রার্থীই স্বীকার করেছেন এই আসনে লড়াই হবে ত্রিমুখী। এই আসনে মোট ভোটার প্রায় ৩ লাখ ৩৮ হাজার।
এম এ এইচ সেলিম মঙ্গলবার রাতে প্রথম আলোকে বলেন, বাগেরহাটে বিএনপি যাঁদের মনোনয়ন দিয়েছে, তাঁদের দলের লোকজন ভোট দিতে চান না। এ জন্য তাঁকে জোর করে ভোটে দাঁড় করিয়েছেন। বিশেষ করে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ বলেছেন যে তিনি না দাঁড়ালে ভোট দেওয়ার কাউকে পাবেন না। এ জন্য বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তাঁদের প্রতি সম্মান জানিয়ে ভোট করছেন।
অন্যদিকে বিএনপির প্রার্থী জাকির হোসেন দাবি করেন, বাগেরহাটে জামায়াতে ইসলামীকে সুবিধা করে দিতে এম এ এইচ সেলিম জেলার তিনটি আসনে স্বতন্ত্র ভোট করছেন। সেলিমের সঙ্গে দলের লোকজন নেই।
জামায়াতের প্রার্থী মনজুরুল আলম মনে করেন, তিনি নিজের শক্তিতেই জিতবেন। তবে বিএনপির দুজন প্রার্থী থাকায় কিছুটা সুবিধা হতে পারে।
স্থানীয় লোকজন বলছেন, বিএনপির কর্মী–সমর্থকেরা আক্ষরিক অর্থেই সেলিম আর জাকির হোসেনে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। সেলিম বাগেরহাট জেলা বিএনপির সভাপতি ছিলেন। এক–এগারোর পর তিনি কারাগারে যান এবং ২০০৮ সালে নির্বাচন করতে পারেননি। সেবার তাঁর ছোট ভাই এম এ সালাম ভোট করে আওয়ামী লীগের মীর শওকাত আলী বাদশার কাছে হেরে যান। পরে সেলিম দলীয় পদ ছেড়ে দেন। ভাই এম এ সালাম সভাপতি হন। এরপর আর সেলিম দলের সঙ্গে সেভাবে যুক্ত হননি।
বিএনপির সূত্র বলছে, একসময় তারেক রহমানের ঘনিষ্ঠ সেলিম ২০১৪ সালের নির্বাচনের পর আর যোগাযোগই রাখেননি। এমনকি তিনি আওয়ামী লীগের নেতাদের সঙ্গে সখ্য গড়ে তোলে ব্যবসার প্রসার ঘটান। এ জন্য দল থেকে এবার তাঁকে মনোনয়ন দেওয়া হয়নি। তাঁর ভাই এম এ সালাম এই আসনে মনোনয়ন চেয়েছিলেন। তিনিও তা পাননি। ফলে তবে তিনি স্বতন্ত্র হননি, কিন্তু মাঠে সেভাবে সক্রিয় নন।
দুই আসনে সংখ্যালঘু প্রার্থী
গোপালগঞ্জঘেঁষা ফকিরহাট, মোল্লাহাট ও চিতলমারী নিয়ে গঠিত বাগেরহাট-১ আসনে আওয়ামী লীগের ভোট রয়েছে। শেখ হাসিনা, তাঁর চাচাতো ভাই শেখ হেলাল ঘুরেফিরে এই আসনে সংসদ সদস্য হয়েছেন। এবার ভোটে নেই কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ। এই আসনে বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য (বহিষ্কৃত) মো. মাছুদ রানা, কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য শেখ ওয়াহিদুজ্জামান ও শেখ মুজিবুর রহমান।
সবাইকে বাদ দিয়ে চমক দেখায় বিএনপি। প্রার্থী করা হয় কপিল কৃষ্ণ মণ্ডলকে। যিনি মতুয়া বহুজন সমাজ ঐক্য জোটের সাধারণ সম্পাদক। একই সঙ্গে তিনি বিশ্ব হিন্দু পরিষদের বাংলাদেশ চ্যাপটারের মহাসচিব এবং বাংলাদেশ অশ্বিনী সেবা আশ্রমের সভাপতি। অবশ্য তিনি ছিলেন চিতলমারী উপজেলার কলাতলা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সহসভাপতি।
স্থানীয় বিএনপির দলীয় সূত্র জানায়, বাগেরহাট–১ আসনে মোট ভোটার ৩ লাখ ৭৫ হাজারের কিছু বেশি। এর মধ্যে সংখ্যালঘু ভোটার আছেন লক্ষাধিক। সংখ্যালঘু ভোট টানতেই বিএনপি এই কৌশল নিয়েছে।
অবশ্য এ সিদ্ধান্ত নিয়ে বিএনপির ভেতর কিছুটা অসন্তোষ আছে। এম এইচ সেলিম স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন। জেলা বিএনপির নেতা মাছুদ রানাও এখানে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন।
স্থানীয় বিএনপির নেতারা বলছেন, সেলিম কিছু সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ভোট টানতে পারেন। মাছুদ রানাও বিএনপির ভোট কিছু পাবেন, যা জামায়াতের প্রার্থীর জন্য কিছুটা সুবিধা করে দিতে পারে। এই আসনে জামায়াতের প্রার্থী জেলার সাবেক আমির মো. মশিউর রহমান।
বাগেরহাট–৪ (মোরেলগঞ্জ–শরণখোলা) বরাবরই জামায়াত শক্ত। ১৯৯১ ও ২০০১ সালে এই আসন থেকে জামায়াত প্রার্থীরা সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। জোটের কারণে ২০০৮ সালেও আসনটি জামায়াতকে ছেড়ে দেয় বিএনপি, কিন্তু জয়ী হন আওয়ামী লীগের প্রার্থী।
এবার আসনটিতে বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছেন সোম নাথ দে। তিনি মতুয়া বহুজন সমাজ ঐক্যজোটের সভাপতি। তিনি বিশ্ব হিন্দু পরিষদের বাংলাদেশ চ্যাপটারের সভাপতি ছিলেন।
বিএনপির প্রার্থী হওয়ার আগে সোমনাথ মোরেলগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। এর আগে তিনি জাতীয় পার্টির রাজনীতির সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। বাগেরহাট-৪ থেকে জাতীয় পার্টির হয়ে নির্বাচনও করেছেন। ছিলেন প্রয়াত হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সংখ্যালঘুবিষয়ক উপদেষ্টা।
দলীয় সিদ্ধান্ত মেনে নিতে না পেরে বিএনপির জেলা নেতা কাজী খায়রুজ্জামান স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন। এই আসনে জামায়াতের প্রার্থী আবদুল আলীম।
এই আসনে মোট ভোটার ৩ লাখ ৮০ হাজারের কিছু বেশি। স্থানীয় রাজনীতিক ও ভোটারদের মতে, জামায়াত এবারও এই আসনে শক্ত অবস্থানে আছে। বিএনপি এই আসনের সংখ্যালঘু ভোটারদের আকৃষ্ট করতে সোম নাথকে প্রার্থী করেছে। তবে খায়রুজ্জামান স্বতন্ত্র প্রার্থী না হলে বিএনপি জোরালো অবস্থান তৈরি করতে পারত।
বাগেরহাট–১ আসনের বিএনপির প্রার্থী কপিল কৃষ্ণকে গত বছর মার্চে দেশবিরোধী ষড়যন্ত্রের অভিযোগে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। অপর একটি মামলায় পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হন সোম নাথ দে। পরে তাঁরা জামিনে মুক্ত হন।
আওয়াম লীগের ভোট পেতে চেষ্টা
বাগেরহাটের চারটি আসনের মূল প্রতিদ্বন্দ্বীদের কেউ আওয়ামী লীগের সমর্থকেরা অখুশি হন, এমন বক্তব্য দিচ্ছেন না।
স্থানীয় রাজনীতিক ও ভোটাররা মনে করেন, বিএনপির একাধিক বিদ্রোহী প্রার্থী থাকায় দলটি আওয়ামী লীগের সমর্থকদের ভোট টানতে মরিয়া। তিনটি আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী এম এ এইচ সেলিমও আওয়ামী লীগকে লক্ষ্যবস্তু করে কোনো বক্তব্য দিচ্ছেন না। এমনকি তিনি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ভোট টানতে অতীতে তাদের জন্য কী কী করেছেন, সেই প্রচার চালাচ্ছেন। জামায়াতের প্রার্থীদের প্রধান লক্ষ্য বিএনপির প্রার্থীরা। তাঁরা আওয়ামী লীগের খুব একটা সমালোচনা করছেন না।
বিএনপি, জামায়াত ও স্বতন্ত্র একাধিক প্রার্থীর ঘনিষ্ঠরা বলছেন, ভেতরে–ভেতরে বিদেশে থাকা আওয়ামী লীগের নেতাদের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করছেন প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা। দেশে থাকা কর্মীদের অভয় দিচ্ছেন।
বাগেরহাট জেলা আওয়ামী লীগের একজন নেতা ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর এলাকা ছেড়ে চলে যান। সম্প্রতি তিনি বাগেরহাট শহরে এসেছেন প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের আশ্বাস পেয়ে। ওই আওয়ামী লীগের নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগের ভোট পেতে এখন তাঁদের সমাদর করছেন প্রার্থীরা। ভোটের পর পরাজিত প্রার্থীর সমর্থকেরা আবার হামলা করবে না—এর নিশ্চয়তা কী।
সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) বাগেরহাট জেলা সম্পাদক এস কে হাসিব প্রথম আলোকে বলেন, আওয়ামী লীগের বড় নেতাদের প্রায় সবাই পলাতক। অন্যরা ইতিমধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ও দলগুলোর সঙ্গে একধরনের সমঝোতা করে চলছেন। ফলে আওয়ামী লীগের ভোট সবাই কমবেশি আশা করছেন। তিনি আরও বলেন, সব আসনে বিএনপির স্বতন্ত্র প্রার্থী থাকায় দলটির বিভেদ প্রকাশ্য হয়ে পড়েছে। আরও দু–তিন দিন গেলে বোঝা যাবে, এর প্রভাব দলটির জন্য কতটা নেতিবাচক হয়।