সিটি নির্বাচনে এনসিপির আগেভাগে প্রার্থী ঘোষণার পেছনে কী

পাঁচ সিটিতে মেয়র পদে এনসিপির প্রার্থীরা– (বাঁ থেকে) আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া, আরিফুল ইসলাম আদীব, তারিকুল ইসলাম, আবদুর রহমান আফজাল ও মো. মোবাশ্বের আলীছবি: সংগৃহীত

বিএনপি ক্ষমতায় বসে সবে সিটি করপোরেশনগুলোতে প্রশাসক বসিয়েছে, ফলে স্থানীয় সরকারের এই প্রতিষ্ঠানগুলোতে আশু নির্বাচনের কোনো ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে না। তার মধ্যেই পাঁচটি সিটি করপোরেশনে মেয়র প্রার্থী ঘোষণা করে বসল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। অন্য কোনো দলের যখন এ নিয়ে কোনো তৎপরতা নেই, তখন নতুন দলটির প্রার্থী ঘোষণা রাজনৈতিক অঙ্গনে কৌতূহল তৈরি করেছে।

সংসদ নির্বাচনে এনসিপির প্রত্যাশামতো ফল না হওয়া নিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে আলোচনার মধ্যেই সিটি নির্বাচন ঘিরে আগাম প্রার্থী ঘোষণা নিয়ে দলটির নেতারা বলেন, এর প্রধান কারণ হলো নিজেদের প্রস্তুতি এগিয়ে রাখা। এ ছাড়া আগেভাগে প্রার্থী ঘোষণার পেছনে প্রার্থীদের আগেই জনগণের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া এবং তাঁদের কেন্দ্র করে সংশ্লিষ্ট এলাকায় সংগঠন গোছানোর বিষয়ও আছে।

এনসিপি ঢাকা দক্ষিণে আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া, ঢাকা উত্তরে আরিফুল ইসলাম আদীব, রাজশাহীতে মোবাশ্বের আলী, সিলেটে আবদুর রহমান আফজাল, কুমিল্লায় তারিকুল ইসলামকে মেয়র পদে প্রার্থী ঘোষণা করেছে।

এনসিপির শীর্ষ পর্যায়ের এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বছরখানেক আগে জামায়াতে ইসলামী বিভিন্ন আসনে দলীয় প্রার্থী ঘোষণা করে রেখেছিল। ওই প্রার্থীকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন এলাকায় প্রচার-জনসংযোগের পাশাপাশি সাংগঠনিক কাঠামোও চাঙা করা গেছে। দীর্ঘ এই প্রস্তুতির ইতিবাচক প্রভাব সংসদ নির্বাচনের ফলাফলে দেখা গেছে। সে বিষয়টি মাথায় রেখে এনসিপি আগেভাগে প্রার্থী ঘোষণা করেছে।

গত ২৯ মার্চ সংবাদ সম্মেলন করে ঢাকা দক্ষিণ, উত্তর সিটিসহ দেশের পাঁচটি সিটি করপোরেশনের মেয়র পদে দলীয় প্রার্থী ঘোষণা করে এনসিপি। বাকি সাত সিটি করপোরেশনের মেয়র প্রার্থীর নামও শিগগির ঘোষণা করার কথা বলেন দলটির নেতারা। এ ছাড়া উপজেলা পরিষদ ও পৌরসভা নির্বাচনের জন্য চলতি এপ্রিলের মধ্যে প্রার্থী ঘোষণা হতে পারে বলেও সংবাদ সম্মেলনে তাঁরা ইঙ্গিত দেন।

আরও পড়ুন

বিএনপি ক্ষমতায় যাওয়ার পর সিটি করপোরেশনসহ স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর বিল সংসদে পাস হয়, এগুলো নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার অধ্যাদেশ জারি করেছিল। পাস হওয়া বিল অনুযায়ী, আগামী সিটি করপোরেশন নির্বাচন দলীয় প্রতীকে হবে না।

৯ এপ্রিল বিলগুলো পাসের সময় সংসদে আলোচনায় স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছিলেন, আইনগুলো পাস হওয়ার পর স্থানীয় সরকার নির্বাচনের দিকে যাবে সরকার।

এনসিপির নীতিনির্ধারকেরা মনে করেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সঙ্গে যেহেতু রাষ্ট্রক্ষমতায় যাওয়া, না–যাওয়ার সরাসরি সম্পর্ক নেই, সে কারণে এসব নির্বাচনে প্রার্থীর ব্যক্তিগত ভাবমূর্তি গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি প্রার্থীকে কেন্দ্র করে সাংগঠনিক কাঠামো গোছানো গেলে নির্বাচনে তার সুবিধা পাওয়া যাবে।

এনসিপির সদস্যসচিব ও রংপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য আখতার হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘দেশে এখন নির্বাচনের পরিবেশ আছে। কিন্তু স্থানীয় সরকারকে কবজায় নিয়ে বিএনপি প্রশাসক বসাচ্ছে। আমরা ছয় মাসের মধ্যে ধাপে ধাপে স্থানীয় সরকারের সব পর্যায়ে নির্বাচন দাবি করেছি। সেই দাবির সঙ্গে সাযুজ্য রেখেই আমরা নির্বাচনের প্রস্তুতি শুরু করেছি।’

স্থানীয় সরকারকে কবজায় নিয়ে বিএনপি প্রশাসক বসাচ্ছে। আমরা ছয় মাসের মধ্যে ধাপে ধাপে স্থানীয় সরকারের সব পর্যায়ে নির্বাচন দাবি করেছি। সেই দাবির সঙ্গে সাযুজ্য রেখেই আমরা নির্বাচনের প্রস্তুতি শুরু করেছি।
আখতার হোসেন, সদস্যসচিব, এনসিপি

বিএনপি এরই মধ্যে দেশের ১১টি সিটি করপোরেশনে প্রশাসক বসিয়েছে। এই দায়িত্ব যাঁরা পেয়েছেন, তাঁরা সবাই বিএনপির নেতা। এ ছাড়া চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনে বিএনপির শাহাদাত হোসেন মেয়রের পদে রয়েছেন।

একক না জোটগত নির্বাচন

জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১–দলীয় ঐক্যে যুক্ত হয়ে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল এনসিপি। ৩০টি আসনে প্রার্থী দিয়ে ৬টি আসনে জয় পায় দলটি। এ ছাড়া ১৭টি আসনে এনসিপির প্রার্থীরা দ্বিতীয় হন, অর্থাৎ জয়ী হওয়া বিএনপির প্রার্থীদের নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী।

এনসিপির ছয়জনের সংসদ সদস্য হওয়ার পেছনে জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে তৈরি হওয়া পরিস্থিতি ও সমর্থনের পাশাপাশি জামায়াতের ভোটব্যাংকও ভূমিকা রেখেছে বলে দলটির নীতিনির্ধারকেরা মনে করেন। তবে তাঁরা এটাও মনে করেন, জামায়াতসহ ১১ দলের অন্য মিত্ররাও নির্বাচনে এনসিপির সমর্থনের ‘সুবিধা’ পেয়েছেন।

সংসদ নির্বাচনের পর আসন্ন সিটি করপোরেশনসহ স্থানীয় সরকারের নির্বাচনেও এনসিপি ১১–দলীয় ঐক্যের শরিক হিসেবেই অংশ নেবে কি না, রাজনৈতিক অঙ্গনে সেই আলোচনাও আছে।

আরও পড়ুন

সেই আলোচনার মধ্যেই পাঁচটি সিটি করপোরেশনে দলের মেয়র প্রার্থীর নাম ঘোষণা করে এনসিপি। এর মধ্যে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে মেয়র পদে প্রার্থী এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া। ঢাকা উত্তর সিটিতে প্রার্থী দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক ও মহানগর উত্তরের আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব।

এ ছাড়া কুমিল্লা সিটি করপোরেশনে জাতীয় যুবশক্তির আহ্বায়ক তারিকুল ইসলাম, রাজশাহী সিটি করপোরেশনে রাজশাহী মহানগর এনসিপির আহ্বায়ক মো. মোবাশ্বের আলী এবং সিলেট সিটি করপোরেশনে মহানগর এনসিপির আহ্বায়ক আবদুর রহমান আফজালের নাম ঘোষণা করা হয়।

আরও পড়ুন

একক প্রার্থী ঘোষণা করলেও এনসিপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের দুজন নেতা জানিয়েছেন, এখন পর্যন্ত তাঁরা ১১–দলীয় ঐক্যের হয়েই স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নেওয়ার কথা ভাবছেন। আপাতত সিটি করপোরেশনসহ স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে শীর্ষ পদে (মেয়র, উপজেলা চেয়ারম্যান ইত্যাদি) প্রার্থী ঘোষণা করে প্রস্তুতি এগিয়ে রাখলেও জোটগত সমঝোতা হলে অনেকে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াবেন। তবে যদি সমঝোতা না হয়, তাহলে এককভাবেই লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিয়ে রাখা হচ্ছে।

জানতে চাইলে এনসিপির সদস্যসচিব আখতার হোসেন বলেন, ‘স্থানীয় সরকার নির্বাচনের জন্য আমরা এককভাবেই প্রস্তুতি শুরু করেছি। আমাদের প্রার্থীরা পরিচিতি তৈরি ও মাঠপর্যায়ের নির্বাচনমুখী সাংগঠনিক কার্যক্রম শুরু করেছেন। যদি নির্বাচনের সময়কালে জোটের প্রয়োজনীয়তার মতো পরিস্থিতি দেখা দেয়, তখন আমরা সে বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেব।’

আরও পড়ুন
আরও পড়ুন