এখন থেকেই ভোটের পাহারাদারি শুরু করতে হবে: শফিকুর রহমান

জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান। আজ সোমবার দুপুরে রাজধানীর মোহাম্মদপুর কেন্দ্রীয় ঈদগাহ মাঠে ঢাকা–১৩ আসনে ১১–দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের প্রার্থী বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মামুনুল হকের নির্বাচনী সমাবেশেছবি: প্রথম আলো

এখন থেকেই ভোটের পাহারাদারি শুরু করতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান। তিনি বলেছেন, ‘কোনো জালিয়াত, ভোটচোর, অবৈধ ইঞ্জিনিয়ার যেন জনগণের কপাল নিয়ে খেলতে না পারে, তা রুখে দিতে হবে। এখন থেকে পাহারাদারি শুরু করতে হবে। বিজয়ের মালা গলে পরিয়ে দিয়ে তারপর আপনারা ঘরে ফিরবেন।’

আজ সোমবার দুপুরে রাজধানীর মোহাম্মদপুর কেন্দ্রীয় ঈদগাহ মাঠে ঢাকা–১৩ আসনে ১১–দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের প্রার্থী বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মামুনুল হকের নির্বাচনী সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে শফিকুর রহমান এ কথা বলেন।

ঢাকা-১৩ আসনে মামুনুল হকের নির্বাচনী পরিচালনা কমিটির প্রধান উপদেষ্টা মাওলানা মাহফুজুল হকের সভাপতিত্বে সমাবেশে বিশেষ অতিথি ছিলেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। তিনি ঢাকা-১১ আসনে এনসিপি মনোনীত প্রার্থী।

জনগণের আকাঙ্ক্ষার ভিত্তিতে ১১ দল এবার একত্র হয়েছে বলে মন্তব্য করেন শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, ‘আমরা একত্র হয়েছি জুলাই যোদ্ধাদের আকাঙ্ক্ষার ভিত্তিতে। আমরা একত্র হয়েছি একটি নতুন বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন নিয়ে। যেই স্বপ্ন এ দেশের ১৮ কোটি মানুষ এখন লালন করে। আমাদের এই একত্র হওয়া চাঁদাবাজ, দুর্নীতিবাজ, মামলাবাজ এবং সব ধরনের অপরাধজগতের যারা কারিগর, তাদের বিরুদ্ধে। জনগণ যখন ঐক্যবদ্ধ হয়েছে, তখন জনতারই বিজয় হবে, ইনশা আল্লাহ।’

ভোটকেন্দ্রে মোবাইল নিয়ে প্রবেশের নিষেধাজ্ঞার সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেন জামায়াতের আমির। তিনি বলেন, ‘অন্যায়ের বিরুদ্ধে, ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে, জুলাইতে যখন আন্দোলন শুরু হয়, তখনো কিন্তু ইন্টারনেট কেড়ে নেওয়া হয়েছিল, যাতে অপরাধ গোপন করা যায়, যাতে খুনকে বৈধতা দেওয়া যায়। আবার আমরা দেখতে পাচ্ছি, কার ইশারায় কেন সেই একই অন্ধকার গলিপথে নির্বাচন কমিশন হাঁটার চেষ্টা করছে?’

শফিকুর রহমান বলেন, ইসি ভোটের দিন ভোটকেন্দ্রের ৪০০ গজের ভেতর সব ধরনের রেকর্ডিং বা ক্যামেরা, মোবাইল—সবকিছুকে নিষিদ্ধ করতে চাচ্ছে। তাঁরা পরিষ্কার বলে দিতে চান, জুলাইয়ে সেই অপকর্ম যেমন মেনে নেওয়া হয়নি। আজকেও মেনে নেওয়ার কোনো প্রশ্নই উঠে না।

একই সমাবেশে নাহিদ ইসলামের ঘোষণা স্মরণ করিয়ে দেন জামায়াতের আমির। তিনি বলেন, ‘আজ সন্ধ্যার আগেই যদি এই প্রজ্ঞাপন প্রত্যাহার করে জনগণকে স্পষ্ট বার্তা দেওয়া না হয়, আগামীকাল নির্বাচন নয়, নির্বাচনী প্রক্রিয়া ভন্ডুল করার জন্য যারা জটিলতা সৃষ্টি করছে, তাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু হবে। আর তার সমস্ত দায়ভার তাদেরই নিতে হবে।’

একটি পক্ষ হেরে যাওয়ার ভয়ে হতাশ হয়ে পড়েছে বলে মন্তব্য করেন শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, ‘বহু জায়গায় দেখতে পাচ্ছি, একটা পক্ষ নির্বাচনে হেরে যাওয়ার ভয়ে একবারেই হতাশ হয়ে পড়েছে। সেই হতাশা থেকে তারা এখন চোরাই পথে নির্বাচনকে হাইজ্যাক করার চিন্তা করছে। গুন্ডাদের লেলিয়ে দেওয়া হচ্ছে। অস্ত্রের ভান্ডার গড়ে তোলা হয়েছে। ভোটকেন্দ্র অন্যায়ভাবে দখল করে মানুষের ভোট কেড়ে নেওয়ার পাঁয়তারা করা হচ্ছে।’

জামায়াতের আমির বলেন, ‘স্পষ্টভাবে বলে দিচ্ছি, জুলাই যোদ্ধারা ঘুমিয়ে পড়ে নাই। তারা এখনো জেগে আছে। তাদের সমস্ত অপকর্ম ইনশা আল্লাহ আমরা প্রতিহত করে দেব। জনগণের ভোট আবার কেউ ছিনতাই করবেন—এই দুঃসাহস দেখাবেন না। এই দুঃস্বপ্নে ভুগবেন না।’

ঢাকা-১৩ একটি মর্যাদাপূর্ণ আসন বলে উল্লেখ করেন শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, ‘অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, কিছু অসৎ লোক এই এলাকাকে বিভিন্নভাবে জর্জরিত করে রেখেছে। এখানে ব্যাপক হারে বেপরোয়া চাঁদাবাজি চলে। এখানে মাদকের রমরমা ব্যবসা চলে। এখানে আমাদের বুকের সন্তানদের ভুল বুঝিয়ে, বিপথগামী করে তাদের দিয়ে অস্ত্রবাজি করা হয়। দখলবাজিতে নামানো হয়। এখানে মামলাবাণিজ্য হয়েছে। আমরা যে সমস্ত সন্তানদের বিপথগামী করা হয়েছে, তাদের বুকে টেনে নিয়ে সংশোধন করে মর্যাদাবান নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলব।’

জামায়াত আমির বলেন, ‘আমরা কোনো ব্যক্তি, পরিবার, গোষ্ঠীর পক্ষেই নির্বাচনে নামিনি। ১৮ কোটি মানুষের পক্ষে নেমেছি। স্পষ্টভাবে ঘোষণা দিয়েছি, নির্বাচিত হলে আমরা কোনো দলীয় সরকার কায়েম করব না। আমরা জনগণের সরকার কায়েম করব। এও ঘোষণা দিয়েছি, আমরা নির্দিষ্ট কোনো দলের বিজয় চাই না। আমরা ১৮ কোটি মানুষের বিজয় চাই। ১৮ কোটি মানুষের বিজয় অর্জন হলেই এটি হবে আমাদের মহাবিজয়, ইনশা আল্লাহ।’

একটা পক্ষ দল, ব্যক্তি, পরিবারের বিজয়ের জন্য পাগলপারা হয়ে উঠেছে বলে মন্তব্য করেন শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, ‘জনগণ তাদেরকে অতীতে দেখেছে। আর এখনো তাদের লোভ দেখছে। আমরা বিশ্বাস করি, বাংলাদেশের শান্তিপ্রিয় জনগণ অবশ্যই তাদেরকে সমর্থন করবে না। তারা জনগণের দ্বারা প্রত্যাখ্যাত হবে। যারা জনগণের পক্ষে আছে, জুলাই আকাঙ্ক্ষার পক্ষে আছে, জনগণ তাদেরকেই বেছে নেবে। এর আলামত ইতিমধ্যে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।’

পাঁচটি বিশ্ববিদ্যালয়ে তরুণেরা জুলাই আকাঙ্ক্ষার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন এবং আকাঙ্ক্ষাকেই তারা সম্মান করেছেন বলে মন্তব্য করেন শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, ১২ তারিখেও বাংলাদেশ একই দৃশ্য দেখবে। কেউ যদি সেই দৃশ্য দেখে এখনই ভীত–সন্ত্রস্ত হয়ে চোরাই পথে পা বাড়ান, তাইলে জাতি ও তাঁরা তাদের ক্ষমা করবেন না। তাঁরা সেদিকে চলতে দেবেন না। এই রাস্তা বন্ধ করে দেওয়া হবে।

আমলা ও সচিবদের উদ্দেশে জামায়াত আমির বলেন, ‘সরকারের কিছু আমলা, সচিব, কিছু অসৎ লোক এখনো দলবাজি করছেন। বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন প্রার্থীকে জিতিয়ে আনার চেষ্টা করছেন। প্রার্থী জিতবে বা পরাজিত হবে, সেটা নির্ধারিত হবে জনগণের ভোটে। আপনাকে কে এই দায়িত্ব দিয়েছে? মনে রাখবেন ক্ষমা বারবার পাবেন না। অপরাধ করে অতীতে ক্ষমা পেয়েছেন, আগামীতে সেই ক্ষমা করা হবে না।’
শফিকুর রহমান আরও বলেন, যদি আবার ফ্যাসিবাদের দিকে দেশকে ঠেলে দেওয়ার কেউ দুঃসাহস করেন, জুলাইতে যেমন ফ্যাসিবাদে রুখে দেওয়া হয়েছে, আগামীতেও রুখে দেওয়া হবে।

ধর্ম–বর্ণ–লিঙ্গের ভিত্তিতে কোনো বিভাজন মেনে নেওয়া হবে না বলে উল্লেখ করেন জামায়াতের আমির। তিনি আরও বলেন, ‘আমরা বারবার জুলাই চাই না। আবার জুলাই হওয়ার প্রেক্ষাপট কেউ তৈরি করবেন, তা হতে দেব না। ইনশা আল্লাহ, সত্যের বিজয় হবে। ইনসাফের বিজয় হবে। দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ হবে। ইনসাফ এই বাংলাদেশে কায়েম হবে। সকল শ্রেণি-পেশা–লিঙ্গ–বর্ণের মানুষ, ধর্মের মানুষ সমতার ভিত্তিতে তাদের অধিকার ফিরে পাবে। এই রাষ্ট্রে ধর্ম–বর্ণ–লিঙ্গের ভিত্তিতে আর কোনো বিভাজন আমরা মানব না। এই ঐক্যবদ্ধ জাতি নিয়ে আমরা সামনে এগিয়ে যেতে চাই।’

ঢাকা-১৩ আসনে ‘রিকশা’ ১১ দলের প্রতীক বলে উল্লেখ করেন শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, এখানে রিকশা জনগণের প্রতীক। জুলাই আকাঙ্ক্ষার প্রতীক। তরুণ প্রজন্মের প্রতীক। নারী সমাজের প্রতীক। নারী–পুরুষ সকলের প্রতীক। আধিপত্যবাদবিরোধী জনগণের প্রতীক। সেই প্রতীক তাঁরা এখন মামুনুল হকের হাতে তুলে দিচ্ছেন।

জয়ী হলে মামুনুল হককে মন্ত্রী করার ঘোষণা দেন জামায়াতের আমির। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘জনগণের ভালোবাসা, সমর্থন, ভোটে ১১ দল বিজয়ী হলে ঢাকা–১৩ আসনের প্রতিনিধি হিসেবে নয়, সারা দেশের মানুষ একজন মর্যাদাবান মন্ত্রী পাবে, যিনি সংসদে গিয়ে শুধু ১৩ আসনের জনগণের কথা বলবেন না, তিনি ১৮ কোটি মানুষের অধিকারের পক্ষে কথা বলবেন। আলেম–ওলামাদের পক্ষে কথা বলবেন। আল্লাহর দ্বীনের পক্ষে কথা বলবেন। বেইনসাফের বিরুদ্ধে কথা বলবেন। ইনসাফের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নেবেন।’ এমন একজনকে এই আসনের জনগণ বুকের ভালোবাসা দিয়ে আলিঙ্গন করে বিজয়ী করবেন বলে তিনি আশাবাদী।