কথা বলে জানা গেছে, ৩০ আগস্ট সন্ধ্যায় রওশন এরশাদের বিজ্ঞপ্তিটি যখন গণমাধ্যমে পৌঁছায়, তখন জাপার চেয়ারম্যান জি এম কাদেরসহ দলের সংসদ সদস্যরা জাতীয় সংসদের অধিবেশনে ছিলেন। পরে সেখানেই বিষয়টি নিয়ে দলের মহাসচিবসহ জ্যেষ্ঠ নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করেন জি এম কাদের। পরদিনই রওশন এরশাদকে বিরোধী দলের নেতার পদ থেকে সরানোর সিদ্ধান্ত নেন দলের সংসদ সদস্যরা। পরে দলের নীতিনির্ধারণী পর্ষদ প্রেসিডিয়ামেও এ বিষয়ে সম্মতি আসে।

জাপার সূত্র জানায়, দলের ২৬ জন সংসদ সদস্যের মধ্যে রওশন এরশাদ ও ছেলে সাদ এরশাদ ছাড়া বাকি ২৪ জন রওশনকে বিরোধী দলের নেতার পদ থেকে সরানোর সিদ্ধান্তে মত দেন। এ ছাড়া দলের ৪১ জন প্রেসিডিয়ামের সভায় ৩৯ জন সদস্য এ সিদ্ধান্তে একমত পোষণ করেন। দলের এ সিদ্ধান্ত ৩১ আগস্ট জাপার মহাসচিব মুজিবুল হকের নেতৃত্বে একটি দল স্পিকারের কার্যালয়ে গিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে স্পিকারকে জানায়। পরে বিরোধী দলের চিফ হুইপ ও জাপার সাবেক মহাসচিব মসিউর রহমান এ বিষয়ে লিখিত আবেদনও স্পিকারের কার্যালয়ে জমা দেন। সাধারণত দলের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্য কোনো সিদ্ধান্ত নিলে স্পিকার সেটি অনুমোদন করেন। এখন বিষয়টি স্পিকারের হাতে।

এ বিষয়ে জাপার চেয়ারম্যান জি এম কাদের প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা যে সিদ্ধান্ত নিয়েছি, নিয়মসিদ্ধভাবে নিয়েছি। এখন স্পিকার আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবেন। সাধারণত এসব ব্যাপারে স্পিকার সংসদ নেতার (প্রধানমন্ত্রী) সঙ্গে কথা বলেন। সংসদ নেতা ভারত সফরে গেছেন। সে কারণে হয়তো কথা হয়নি। তিনি ঘুরে এলে সিদ্ধান্ত হবে। আমরা অপেক্ষাও করছি। কারণ, এর মাধ্যমে আমরা একটা মেসেজ (বার্তা) পাব।’

রওশন এরশাদ প্রায় এক বছর ধরে অসুস্থ। এর মধ্যে গত ১০ মাস তিনি ব্যাংককের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। শারীরিক এ অবস্থাতেই রওশন এরশাদ আগামী ২৬ নভেম্বর জাতীয় পার্টির জাতীয় সম্মেলন আহ্বান করলেন। রওশন এরশাদ সংসদে বিরোধী দলের নেতা ও জাপার প্রধান পৃষ্ঠপোষক। আগামী সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে যখন রাজনৈতিক অঙ্গন উত্তপ্ত হয়ে উঠছে, তখন হঠাৎ করেই জি এম কাদেরের নেতৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করে রওশনের সম্মেলন আহ্বান অনেককে চমকে দেয়। বিশেষ করে, বেশ কিছুদিন ধরে জি এম কাদের যখন দেশের রাজনীতি ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতিসহ নির্বাচনব্যবস্থা ধ্বংস করা নিয়ে সরকারবিরোধী শক্ত কথাবার্তা বলছিলেন, তখন রওশনের সম্মেলন আহ্বান দলটির নেতা-কর্মী ও সাধারণ সমর্থকদের মনে নতুন করে দ্বিধাদ্বন্দ্বের সৃষ্টি করে। কারণ, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির একতরফা নির্বাচন। তখন জাপার চেয়ারম্যান প্রয়াত এইচ এম এরশাদ ওই নির্বাচন বর্জন করলেও স্ত্রী রওশন এরশাদের নেতৃত্বে একটি অংশ আওয়ামী লীগের সঙ্গে সমঝোতা করে নির্বাচনে অংশ নেয়। তখন থেকে সরকারের শীর্ষ নেতৃত্বের কাছে এরশাদের চেয়ে রওশনই বেশি আস্থাশীল হয়ে ওঠেন। তারই ধারাবাহিকতায় রওশন এরশাদ সংসদে বিরোধী দলের নেতা হন।

হঠাৎ রওশন এরশাদের ভিন্ন তৎপরতা জি এম কাদেরের নেতৃত্বকে চ্যালেঞ্জে ফেলল কি না বা দলে বিভক্তি সৃষ্টি করল কি না, তা নিয়ে নানামুখী আলোচনা চলছে দলটিতে। এ বিষয়ে জাপার উচ্চপর্যায়ের একজন নেতা প্রথম আলোকে বলেন, তাঁদেরও আশঙ্কা ছিল যে নির্বাচনের আগে দলে এ ধরনের একটা কিছু হতে পারে। কিন্তু এত আগে এটি ঘটবে, তার জন্য তাঁরা প্রস্তুত ছিলেন না। এ অবস্থায় এখন তাঁরা দলীয় ঐক্যের দিকে নজর দিচ্ছেন। একই সঙ্গে দলের বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থান ও সংহতির বিরুদ্ধে যায়, কোনো নেতা এমন কোনো পদক্ষেপ নিলে তাঁর বিরুদ্ধে কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। রওশন এরশাদকে বিরোধী দলের নেতার আসন থেকে সরানোর সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে নেতা-কর্মীদের এই বার্তা দেওয়া হয়েছে।

জাপার নেতা-কর্মীদের অনেকে মনে করছেন, এই মুহূর্তে জি এম কাদেরের নেতৃত্বে দল ঐক্যবদ্ধ। রওশন এরশাদকে বিরোধী দলের নেতার পদ থেকে সরানোর বিষয়েও এখন পর্যন্ত আনিসুল ইসলাম মাহমুদসহ দলের প্রভাবশালী নেতাদের থেকে কোনো ভিন্নমত প্রকাশ্যে আসেনি। জি এম কাদেরকে বিরোধী দলের নেতা মনোনীত করার ব্যাপারে সংসদীয় দল ও দলের নীতিনির্ধারণী পর্ষদ প্রেসিডিয়ামে সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত হয়েছে। তবু নেতা-কর্মীদের কারও কারও মনে খটকা আছে, রওশন সুস্থ থাকলে তাঁকে সামনে রেখে দলের একটি অংশ তৎপর হতে পারে।

রওশন এরশাদ অসুস্থ হয়ে বিদেশের হাসপাতালে থাকলেও ঢাকায় জাপার সাবেক, দলচ্যুত ও নিষ্ক্রিয় নেতাদের একটি অংশ তাঁকে সামনে রেখে তৎপরতা চালাচ্ছে। আজ সোমবার নতুন করে সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটিতে সাতজন যুগ্ম আহ্বায়কের নাম ঘোষণা করেন বিরোধী দলের নেতা রওশন এরশাদের রাজনৈতিক সচিব গোলাম মসীহ। তাঁরা হলেন এম এ সাত্তার, দোলোয়ার হোসেন, এস এম এম আলম, এম এ গোফরান, জিয়াউল হক মৃধা, ইকবাল হোসেন রাজু ও কাজী মামনুর রশীদ।

দলীয় সূত্র জানায়, এর মধ্যে কেবল জিয়াউল হক মৃধা জাপার চেয়ারম্যানের উপদেষ্টার পদে আছেন। তিনি নিজ এলাকা ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় দলীয় রাজনীতিতে স্বস্তিতে নেই। বাকিরা একসময় রাজনীতিতে সক্রিয় থাকলেও গত কয়েক বছর দলের সঙ্গে নেই। দলে তাঁদের কোনো পদও নেই। এস এম এম আলম জাপা ছেড়ে কাজী জাফর আহমদের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টিতে যোগ দিয়েছিলেন। আর কাজী মামনুর রশীদ প্রেসিডিয়াম সদস্য পদ থেকে বহিষ্কৃত হন। কাজী মামনুর রশীদ ও দোলোয়ার হোসেন কিছুদিন আগেও বিদিশা সিদ্দিকের সঙ্গে ছিলেন। কমিটিতে রওশন এরশাদ তাঁর রাজনৈতিক সচিব গোলাম মসীহকে সদস্যসচিব করেন। তিনি একসময় দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য থাকলেও এখন তাঁর কোনো পদ নেই।

এর আগে রওশন এরশাদ সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটিতে ছয়জনকে যুগ্ম আহ্বায়ক ঘোষণা করেছিলেন। তাঁরা হলেন কো-চেয়ারম্যান আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, রুহুল আমিন হাওলাদার, কাজী ফিরোজ রশীদ, মুজিবুল হক, সৈয়দ আবু হোসেন ও সালমা ইসলাম। প্রত্যেকে বলেছেন, এ বিষয়ে তাঁরা কিছু জানেন না। পরে দেখা যায়, তাঁরা রওশন এরশাদকে বিরোধী দলের নেতার আসন থেকে সরানোর সিদ্ধান্তে ভূমিকা রাখেন।

এ বিষয়ে জাপার কো–চেয়ারম্যান কাজী ফিরোজ রশীদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘জাতীয় পার্টি এখন ঐক্যবদ্ধ আছে এবং ভালো অবস্থানে আছে। সেই সময়ে এগুলো যারা করছে, তারা কোত্থেকে অর্থ পাচ্ছে, কারা ব্যাকিং করছে আমাদের জানা নেই। এগুলো শুভ লক্ষণ নয়। এর পেছনে কারা আছে, আমাদের ভেবে দেখার বিষয় আছে।’

কথা বলে জানা গেছে, সম্মেলন আহ্বানের বিজ্ঞপ্তি হাতে পাওয়ার পরদিন সকালে ব্যাংককে থাকা রওশনকে ফোন করেন জাপার মহাসচিব মুজিবুল হক। তিনি গণমাধ্যমে পাঠানো চিঠির স্বাক্ষরটি তাঁর কি না, জানতে চান। রওশন এরশাদ স্বাক্ষরটি তাঁর জানালে মুজিবুল হক বলেন, সম্মেলনের মাধ্যমে একটি কমিটি হয়েছে। সম্মেলনে জি এম কাদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন। হঠাৎ করে কোনো কথাবার্তা নেই, এমন চিঠি দেওয়া, সম্মেলন ডাকার কারণ কী? তখন রওশন এরশাদ চিঠিটি স্থগিত করবেন কি না, জানতে চান। কিন্তু মুজিবুল হক তাতে রাজি হননি।

এ বিষয়ে জাপার মহাসচিব মুজিবুল হক প্রথম আলোকে বলেন, ‘আসলে তিনি অসুস্থ। তাঁর সঙ্গে কথা বলে বুঝলাম, এ কর্মগুলো করতে তিনি বাধ্য হয়েছেন। কিন্তু যারাই এ কর্ম করিয়েছে, তারা অত্যন্ত শিশুসুলভ কাজ করেছে। এই কাজে জাতীয় পার্টির বর্তমান কাঠামোর কেউ নেই। কিছু বহিষ্কৃত, নিষ্ক্রিয় লোক দিয়ে তো তিনি এ কাজ করতে পারেন না।’

রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন