কেন্দ্রীয় নেতাদের অজান্তে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সার্চ কমিটি, উপদেষ্টা পরিষদকে ‘অবাঞ্ছিত’ ঘোষণা

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের একাংশের সংবাদ সম্মেলন। রোববার বিকেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যানটিনেছবি: প্রথম আলো

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কার্যক্রম আবার সক্রিয় করার লক্ষ্যে ২১ সদস্যের একটি সার্চ কমিটি গঠনের ঘোষণা দিয়েছেন সংগঠনটির বিভিন্ন জেলা শাখার কয়েকজন নেতা। একই সঙ্গে তাঁরা বর্তমান কেন্দ্রীয় উপদেষ্টা পরিষদকে ‘অবাঞ্ছিত’ ঘোষণা করেছেন। তবে এ উদ্যোগের বিষয়ে কিছুই জানেন না বলে জানিয়েছেন সংগঠনটির সাবেক সভাপতি ও বর্তমান উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যরা। তাঁরা বলছেন, উপদেষ্টা পরিষদই নতুন গঠনতন্ত্র প্রণয়ন ও কেন্দ্রীয় কমিটি গঠনের কাজ করছে।

রোববার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যানটিনে সংবাদ সম্মেলনে সার্চ কমিটি গঠনের ঘোষণা দেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সিরাজগঞ্জ জেলা শাখার আহ্বায়ক মুনতাছির মেহেদী ও বাগেরহাট জেলা শাখার ভারপ্রাপ্ত সদস্যসচিব এস কে বাদশা। তাঁরা যথাক্রমে সার্চ কমিটির আহ্বায়ক ও সদস্যসচিবের দায়িত্বে রয়েছেন। মুনতাছির মেহেদী নিজেকে সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুর খাজা ইউনূস আলী বিশ্ববিদ্যালয়ের ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেম (এমআইএস) বিভাগের শিক্ষার্থী এবং এস কে বাদশা বাগেরহাটের প্রফুল্ল কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের স্নাতকোত্তরের শিক্ষার্থী হিসেবে পরিচয় দেন।

সংবাদ সম্মেলনে এস কে বাদশা বলেন, প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন একটি অরাজনৈতিক ও ছাত্রকেন্দ্রিক প্ল্যাটফর্ম। তবে উপদেষ্টা পরিষদের কয়েকজন সদস্য সরাসরি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হওয়ায় সংগঠনের নিরপেক্ষতা ও অরাজনৈতিক চরিত্র প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। তিনি বলেন, ‘দেশের ৩৪টি জেলা শাখার সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে আমরা বর্তমান উপদেষ্টা পরিষদকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের জন্য অবাঞ্ছিত ঘোষণা করছি। এই সিদ্ধান্ত কোনো ব্যক্তিগত বিরোধের কারণে নয়; বরং আন্দোলনের আদর্শ, জুলাইয়ের শহীদদের আত্মত্যাগের মর্যাদা এবং সংগঠনের অরাজনৈতিক পরিচয় রক্ষার স্বার্থে নেওয়া হয়েছে।’

মুনতাছির মেহেদী বলেন, জুলাইয়ের চেতনা, শিক্ষার্থীদের আকাঙ্ক্ষা ও তৃণমূলের মতামতকে গুরুত্ব দিয়ে দেশের বিভিন্ন জেলা শাখার সঙ্গে ধারাবাহিক মতবিনিময়ের পর সার্চ কমিটি গঠন করা হয়েছে।

তাঁর দাবি, ইতিমধ্যে ৩৪টির বেশি জেলা কমিটি এই সার্চ কমিটির প্রতি আস্থা ও সমর্থন জানিয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধিরাও এ উদ্যোগের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করেছেন।

মুনতাছির মেহেদী বলেন, এই সার্চ কমিটি কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষার জন্য নয়। জুলাইয়ের চেতনা, শহীদদের আত্মত্যাগ, শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা ও জনগণের আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করে গ্রহণযোগ্য, জবাবদিহিমূলক ও শক্তিশালী কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব গঠনের লক্ষ্যেই তাঁরা কাজ করবেন। কেন্দ্রীয় কাউন্সিল গঠিত না হওয়া পর্যন্ত সার্চ কমিটি সংগঠনের সাংগঠনিক, সমন্বয় ও নীতিগত কার্যক্রম পরিচালনা করবে।

কেন্দ্রীয় উপদেষ্টা পরিষদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছিল কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে সার্চ কমিটির সদস্যসচিব এস কে বাদশা বলেন, কেন্দ্রীয় কমিটির অনেকের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তেমন সাড়া পাওয়া যায়নি। পরে জেলা কমিটিগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ এবং অনলাইন ভোটের মাধ্যমে ২১ সদস্যের এই কমিটি গঠন করা হয়েছে। এতে ৩৪টি জেলা কমিটির প্রতিনিধিরা সমর্থন দিয়েছেন বলে তিনি দাবি করেন।

জানেন না কেন্দ্রীয় নেতারা

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কেন্দ্রীয় কাউন্সিলের সভাপতি হিসেবে রিফাত রশিদ এবং সম্পাদক হিসেবে হাসান ইনাম ২০২৫ সালের ২৫ জুন দায়িত্ব নেন। পরে একই বছরের ২ নভেম্বর শারীরিক ও মানসিক অসুস্থতার কথা উল্লেখ করে সম্পাদক পদ থেকে সরে দাঁড়ান হাসান ইনাম। এরপর ২০২৬ সালের ১৯ এপ্রিল জাতীয় নাগরিক পার্টিতে (এনসিপি) যোগ দিতে সভাপতির পদ ছাড়েন রিফাত রশিদ। পদত্যাগের সময় তিনি কেন্দ্রীয় কমিটি বিলুপ্ত করে পাঁচ সদস্যের একটি উপদেষ্টা কমিটি গঠন করেন। ওই কমিটির দায়িত্ব ছিল গঠনতন্ত্র প্রণয়ন এবং নতুন কেন্দ্রীয় কমিটি গঠন।

নতুন সার্চ কমিটির বিষয়ে জানতে চাইলে সংগঠনটির সাবেক সভাপতি রিফাত রশিদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘এই কমিটির বিষয়ে কিছুই জানি না। কারা কী করেছে, সেটিরও খোঁজ আমার কাছে নেই। আমি জানি, যে উপদেষ্টা কমিটি গঠন হয়েছে, তারা গঠনতন্ত্র তৈরি করে নতুন কমিটি ঘোষণা করবে। এর বাইরে নতুন করে কেউ বিচ্ছিন্নভাবে কিছু করতে চাইলে সেটি হবে না।’

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক ও বর্তমান উপদেষ্টা কমিটির সদস্য মুঈনুল ইসলামও বলেন, ঘোষিত সার্চ কমিটির বিষয়ে তাঁদের কোনো ধারণা নেই। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কোনো গঠনতন্ত্র ছিল না। ফলে ভবিষ্যতে সংগঠনটি কীভাবে চলবে, তা নিয়ে ধোঁয়াশা ছিল। বর্তমানে পাঁচ সদস্যের উপদেষ্টা কমিটি গঠনতন্ত্র তৈরির কাজ করেছে। একই সঙ্গে দ্রুত নতুন কমিটি ঘোষণার কাজও চলছে।’

উপদেষ্টা কমিটিকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে মুঈনুল ইসলাম বলেন, ‘উপদেষ্টা কমিটিকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করার কিছু নেই। উপদেষ্টা কমিটি যে লক্ষ্য নিয়ে গঠিত হয়েছে, সে লক্ষ্যেই কাজ করছে। খুব শিগগিরই নতুন কমিটি ঘোষণা করা হবে।’

সার্চ কমিটিতে যাঁরা

ঘোষিত ২১ সদস্যের সার্চ কমিটির আহ্বায়ক করা হয়েছে মুনতাছির মেহেদীকে। সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুর রহমান, সদস্যসচিব এস কে বাদশা, সিনিয়র যুগ্ম সদস্যসচিব মো. সজিব ইসলাম, মুখ্য সংগঠক মাহাদী হাসান, মিডিয়া সম্পাদক লোকমান হোসেন লিমন, তথ্য, গবেষণা ও দপ্তর সম্পাদক মহিম পাটোয়ারী এবং আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক হিসেবে আলী বিন আজমকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া আরও ১৩ জনকে নির্বাহী সদস্য করা হয়েছে।