নির্বাচন ২০২৬: ফ্যাক্ট চেক
তারেক রহমানকে নিয়ে ছড়ানো ড. কামাল হোসেনের বক্তব্যটি ভুয়া
গণফোরামের সাধারণ সম্পাদক জানিয়েছেন, একটি স্বার্থান্বেষী চক্র ড. কামাল হোসেনকে হেয় করতে পরিকল্পিত অপপ্রচার চালিয়ে আসছে। এ জন্য তাঁরা থানায় জিডি করেছেন।
বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে ‘প্রতারক’ বলেছেন প্রবীণ রাজনীতিক ড. কামাল হোসেন, এমন একটি ফটোকার্ড ফেসবুকে ছড়ালেও তা আসলে মিথ্যা। এভাবে জামায়াত ইসলামীকে নিয়েও ড. কামাল হোসেনের ভুয়া একটি বক্তব্য ছড়ানো হচ্ছে।
নির্বাচনী প্রচার চলার মধ্যেই গত ৩১ জানুয়ারি ‘দৈনিক আজকের কণ্ঠ’ নামের একটি ফেসবুক পেজে গণফোরামের ইমেরিটাস সভাপতি কামাল হোসেনের ছবিযুক্ত একটি ফটোকার্ড পোস্ট করা হয়। এতে লেখা হয়, ‘বিএনপি সাধারণ মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করেছে। তার নিচে লেখা, ‘তারেক রহমানকে প্রতারক আখ্যা দিলেন ড. কামাল হোসেন’। ফেসবুকের আরেকটি ব্যক্তিগত প্রোফাইল থেকে গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর প্রায় একই লেখা দিয়ে আরেকটি ফটোকার্ড পোস্ট করা হয়। সেখানে সূত্র লেখা ছিল ‘বার্তা বাজার’।
কিন্তু বার্তা বাজারের ওয়েবসাইট ও ফেসবুক পেজে এমন কোনো সংবাদ পাওয়া যায়নি। মূলধারার কোনো সংবাদমাধ্যমে এ রকম কোনো সংবাদ খুঁজে পাওয়া যায়নি। দৈনিক আজকের কণ্ঠ পেজটি থেকে আগেও একাধিক মিথ্যা ও ভুয়া তথ্য ছড়ানোর প্রমাণ পেয়েছে ফ্যাক্ট চেকিং প্রতিষ্ঠানগুলো।
জামায়াতকে নিয়েও ভুয়া বক্তব্য
জামায়াতকে নিয়ে ১ ফেব্রুয়ারি ফেসবুকে একটি ফটোকার্ড পোস্ট করা হয়। তাতে ড. কামাল হোসেনকে উদ্ধৃত করে লেখা ছিল, ‘জামায়াতকেই দেশের দায়িত্ব নিতে হবে’। ফটোকার্ডটি গতকাল বুধবার পর্যন্ত ২৯ হাজারের বেশিবার শেয়ার করা হয়, মন্তব্যও করেন ছয় হাজারের বেশি মানুষ, প্রতিক্রিয়া পড়ে ৯০ হাজারের বেশি। অথচ এমন কোনো খবরও মূল ধারার কোনো সংবাদমাধ্যমে পাওয়া যায়নি।
পরিকল্পিত অপপ্রচার: গণফোরাম
বিষয়টি নিয়ে যোগাযোগ করা হলে গণফোরামের সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, দীর্ঘদিন ধরেই একটি স্বার্থান্বেষী চক্র সংবিধানবিশেষজ্ঞ ড. কামাল হোসেনকে হেয় করার উদ্দেশ্যে পরিকল্পিত অপপ্রচার চালিয়ে আসছে। এগুলো সেই অপচেষ্টার অংশ।
ড. কামাল হোসেন কোনো রাজনৈতিক দল বা রাজনৈতিক নেতাকে নিয়ে এ ধরনের মন্তব্য বা বক্তব্য দেননি জানিয়ে মিজানুর রহমান বলেন, এসব ভুয়া ফটোকার্ড ও অপতথ্যের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার অংশ হিসেবে পল্টন মডেল থানায় ৩ ফেব্রুয়ারি একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন তাঁরা।
গণভোট বাতিল ঘোষণার খবরটি মিথ্যা
১২ ফেব্রুয়ারি সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে গণভোটও হবে। সম্প্রতি অনলাইনে প্রকাশিত একটি ভিডিওতে দাবি করা হয় যে গণভোট বাতিল করা হয়েছে। রাস্তার ওই ভিডিওর অডিওতে বলা হয়, ‘এই মুহূর্তে পাওয়া গরম খবর। শেষ মুহূর্তে গণভোট বাতিল ঘোষণা।’ এই ভিডিও টিকটকে লাখের বেশিবার দেখা হয়েছে, ৮৮ হাজার অ্যাকাউন্ট থেকে পোস্টটিতে লাইক দেওয়া হয়েছে।
তবে এই দাবির পক্ষে কোনো খবর কোনো সংবাদমাধ্যমে আসেনি। নির্বাচন কমিশন থেকেও এমন কোনো ঘোষণা আসেনি।
‘১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা’, এমন দাবি করে একটি ভিডিও ইউটিউবে ছড়ানো হয়েছে, যা প্রায় তিন লাখবার দেখা হয়েছে। একই ভিডিও টিকটকে দেখা হয়েছে ৬০ হাজারের বেশিবার।
যাচাই করে দেখা যায়, ২৮ জানুয়ারি ‘ডিজিটাল ডিভাইস অ্যান্ড ইনোভেশন এক্সপো ২০২৬’–এর উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধান উপদেষ্টার বক্তব্যের ভিডিওর সঙ্গে অপ্রাসঙ্গিক ক্যাপশন জুড়ে দিয়ে ভুয়া তথ্য ছড়ানো হচ্ছে।
ভোটের দিন ইন্টারনেট বন্ধের ঘোষণা দেননি স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা
‘ভোটের দিন ইন্টারনেট বন্ধ থাকবে! এ কী ঘোষণা দিল স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা’ শিরোনামে একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়েছে। অথচ এমন কোনো খবর কোনো সংবাদমাধ্যমে আসেনি। ইন্টারনেট নিয়ে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার একটি বক্তব্য খুঁজে পাওয়া যায় প্রথম আলোর ওয়েবসাইটে ১ ফেব্রুয়ারি। তার শিরোনাম ছিল, ‘নির্বাচনের দিন ইন্টারনেট বন্ধ করলে আইনগত ব্যবস্থা: স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা’। ওই প্রতিবেদন অনুযায়ী, চট্টগ্রামের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে এক মতবিনিময় সভা শেষে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে বলেছিলেন, ‘আমাদের পরিকল্পনা হলো, এটা খোলা থাকবে। ইন্টারনেট যদি কেউ বন্ধ করে, আমরা তাকে আইনের আওতায় নিয়ে আসব।’
জামায়াত নিয়ে সেনাসদস্যের বক্তব্যের ভিডিওটি এআই দিয়ে তৈরি
সম্প্রতি টিকটকে একটি ভিডিও প্রচার করা হয়, যেখানে মাইক্রোফোন (বুম) হাতে এক সেনাসদস্যকে বলতে শোনা যায়, ‘১২ তারিখের ভোটের সাথে বদরের যুদ্ধের সাথে তুলনা (অস্পষ্ট) জামায়াত নেতার। নির্বাচনী প্রচারণার জন্য নামাজ পড়তে বললেন জামায়াত নেতা। নামাজ ভোটের জন্য নাকি আল্লাহর জন্য? কম্বল দেওয়ার নামে জামায়াত নেতারা ভোটার আইডি কার্ড হাতিয়ে নিচ্ছে। জামায়াতের এসব কর্মকাণ্ডের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি।’
এ বিষয়ে নির্ভরযোগ্য কোনো সূত্র বা সংবাদমাধ্যমে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। ভিডিওটি পর্যবেক্ষণ করে একাধিক অসঙ্গতি লক্ষ করা যায়। পেছনে থাকা সাইনবোর্ড ও সেনাসদস্যের পোশাকে নামের স্থলে অর্থপূর্ণ নয়, এমন শব্দ ও বাক্যের ব্যবহার লক্ষ করা যায়।
ভিডিওটি এআই কনটেন্ট শনাক্তকারী হাইভ মডারেশনের টুলে বিশ্লেষণ করলে এটি এআই দিয়ে তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় শতভাগ বলে ফলাফল আসে।
এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পুলিশ ও নারী সেনাসদস্যের একটি ছবিও সম্প্রতি ছড়িয়েছে। এ–সংক্রান্ত পোস্টের ক্যাপশনে যে দাবি করা হয়েছে, তার সারকথা হলো, পুলিশের এক কনস্টেবলকে সেনাবাহিনীর এক নারী সদস্য থাপ্পড় দিচ্ছেন।
অনুসন্ধানে নিউজ হান্টের ফেসবুক পেজে ২০২৫ সালের ১৭ নভেম্বর প্রকাশিত একটি ভিডিও পাওয়া যায়, যার সঙ্গে ছবিটির কিছু মিল পাওয়া যায়। তবে সেখানে নারী সেনাসদস্য এবং পেছনের দাঁড়ানো সেনাসদস্যদের একই অবস্থানে দেখা যায়। তবে ছবির মতো নারী সেনাসদস্যের আহত পুলিশ সদস্যকে থাপ্পড় দেওয়ার ভঙ্গির মতো কোনো দৃশ্য দেখা যায়নি। এর পরিবর্তে ভিডিওতে আহত পুলিশ সদস্যকে ব্যান্ডেজ লাগিয়ে দিতে দেখা যায় নারী সেনাসদস্যকে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহায়তায় তৈরি কনটেন্ট শনাক্তকারী একাধিক টুলে যাচাই করে ফলাফল পাওয়া যায় যে ওই ছবি এআই দিয়ে তৈরি। অর্থাৎ ভিডিও থেকে স্ক্রিনশট নিয়ে ছবিটি সম্পাদনা করে তৈরি করা হয়েছে।
এ ধরনের অপতথ্যের বিষয়ে ২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অফিশিয়াল ফেসবুক পেজ থেকে একটি সতর্কতামূলক বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়। তাতে বলা হয়, একটি স্বার্থান্বেষী মহল বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে ঘিরে এআই-জেনারেটেড কনটেন্ট ও বিভ্রান্তিকর ফটোকার্ড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার করছে। এ ধরনের অপতথ্যে বিভ্রান্ত না হয়ে সংবাদমাধ্যমের ভেরিফায়েড পেজগুলো অনুসরণ করার জন্য অনুরোধ করা হলো।