গণভোট ও জুলাই সনদ নিয়ে বিভ্রান্তকারীদের প্রশ্রয় না দেওয়ার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর
রাজনৈতিক স্বার্থে গণভোট ও জুলাই সনদ নিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টির চেষ্টা করছে, এমন ব্যক্তিদের প্রশ্রয় না দিতে জনগণের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, কিছু ব্যক্তি ও রাজনৈতিক দল এখন গণভোটকে ভিন্ন পথে পরিচালিত এবং দেশের মানুষকে বিভ্রান্ত করে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করছে।
আজ সোমবার দুপুরে যশোরের শার্শা উপজেলার ঐতিহাসিক উলসী খালের পাড়ে পুনঃখনন কাজের উদ্বোধন শেষে আয়োজিত এক সংক্ষিপ্ত সমাবেশে প্রধানমন্ত্রী এ কথা বলেন।
তারেক রহমান বলেন, যারা নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের জন্য বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে চায়, যদি তারা এটা করতে না পারে, তবে জনগণের জন্য নেওয়া সব কর্মসূচি, যেমন নারীদের জন্য ফ্যামিলি কার্ড, কৃষকদের জন্য কৃষক কার্ড, খাল খনন কর্মসূচি, বেকার যুবকদের কর্মসংস্থানের জন্য বন্ধ মিল কারখানা চালুর যে কর্মসূচি, স্বাস্থ্যসেবা গ্রামে গ্রামে পৌঁছে দেওয়ার কর্মসূচি, বৃক্ষরোপণের যে কর্মসূচিগুলো রয়েছে, সেগুলো বাস্তবায়নে তারা ব্যাঘাত সৃষ্টি করবে।
দেশের অগ্রগতি যেন কেউ বাধাগ্রস্ত করতে না পারে, তা নিশ্চিত করতে জনগণকেই দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখতে হবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘রাজনৈতিক দলগুলোর স্বাক্ষরিত জুলাই সনদ ধাপে ধাপে এবং সম্পূর্ণভাবে বাস্তবায়ন করা হবে।’
৫ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তারেক রহমান বলেন, জনগণ ইতিমধ্যেই প্রমাণ করেছে যে তারা তাদের ইচ্ছাকে উপেক্ষা করার চেষ্টা মেনে নেয় না। যেভাবে জনগণ ৫ আগস্ট উপযুক্ত জবাব দিয়েছে, ভবিষ্যতেও কেউ তাদের ভাগ্য নিয়ে খেলতে চাইলে তারা একইভাবে জবাব দেবে। সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন উদ্যোগের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এসব কার্যক্রম সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে দেশের মানুষের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আজ আমাদেরকে শপথ নিতে হবে। ২০ কোটি মানুষের ৪০ কোটি হাত আজ বসে থাকলে চলবে না। ২০ কোটি মানুষের ৪০ কোটি হাতকে দেশ গঠনের কাজে লাগাতে হবে, ২০ কোটি মানুষের ৪০ কোটি হাত আজকে দেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের কাজে লাগাতে হবে, তাহলেই এই দেশের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন হবে।’
তারেক রহমান বলেন, ‘আমাদের চোখের সামনে দিয়ে গত ৫০ বছর পৃথিবীর অনেক দেশ তাদের ভাগ্যের পরিবর্তন করেছে, পৃথিবীর অনেক দেশের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন হয়েছে। যেই সিঙ্গাপুরকে নিয়ে আমরা মাঝে মাঝে গল্প করি, সেই সিঙ্গাপুরের অবস্থা ১৯৭১ সালে আমাদের চেয়েও খারাপ ছিল। আজ ৫০ বছরে তারা কোথায় চলে গিয়েছে! তারা যদি পারে আমরা কেন পারব না? ইনশা আল্লাহ, আমরাও পারব। এই দেশের মানুষ পারবে।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা দেখেছি, আন্দোলনের নামে কীভাবে ১৭৩ দিন হরতাল করা হয়েছিল। মনে আছে আপনাদের ১৭৩ দিন কীভাবে দেশের অর্থনীতিকে ধ্বংস করে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল। এখনো আবার সেই ভূত আরেকজনের কাঁধে গিয়ে আসর করেছে, আপনাদেরকে এই ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা যদি সতর্ক থাকি এবং আমাদের কর্মসূচি বাস্তবায়নে অঙ্গীকারবদ্ধ থাকি, তাহলে বাংলাদেশের মানুষের ভাগ্য নিয়ে কেউ ছিনিমিনি খেলতে পারবে না।’ তিনি আরও বলেন, ‘বাংলাদেশের মানুষের ভাগ্য নিয়ে কেউ যদি ছিনিমিনি খেলতে চায়, ইনশা আল্লাহ চব্বিশের আগস্টের ৫ তারিখে যেভাবে বাংলাদেশের মানুষ জবাব দিয়েছে, ভবিষ্যতেও এ দেশের মানুষ সেভাবেই জবাব দেবে।’
তারেক রহমান বলেন, ‘আমরা যারা শহীদ জিয়ার দল করি, আমরা যারা দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার সৈনিক, আমরা বিশ্বাস করি, এই দেশই হচ্ছে আমাদের প্রথম, এই দেশই হচ্ছে আমাদের শেষ ঠিকানা। সে জন্যই আমরা বলি, প্রথম বাংলাদেশ আমার শেষ বাংলাদেশ।’
উলসী খাল দেখিয়ে দিয়ে তারেক রহমান বলেন, ‘এই খালে পানি নাই। কারণ, এই খালগুলো আজকে রুদ্ধ হয়ে গেছে, ভরাট হয়ে গেছে। বিভিন্ন জায়গায় খাল দখলও হয়ে গেছে। এই যে খাল ভরাট হয়ে গেছে, খাল বন্ধ হয়ে গেছে, খাল দখল হয়ে গেছে, তাতে কি সাধারণ মানুষ বা কৃষকদের কোনো উপকার হয়েছে? কোনো উপকার হয়নি।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এখন আজকে আমরা এসেছি এই খাল পুনঃখনন করতে। গত প্রায় ৫০ বছর আগে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এই খালকে খনন করেছিলেন। প্রায় চার কিলোমিটারের এই খাল আমরা যদি পুনঃখনন করতে পারি, তাহলে এই এলাকার মানুষ পানি পাবে। পানি পেলে কী হবে? আমরা দেখেছি, ২০ হাজারের মতো কৃষক সরাসরি উপকৃত হবে, প্রায় চৌদ্দ শ টন বাড়তি খাদ্যশস্য উৎপাদন হবে। প্রায় ৭২ হাজার মানুষ সরাসরি উপকৃত হবে।’
তারেক রহমান বলেন, ‘এই খালে পানি থাকলে উপকারটা কাদের হবে ভাই? এই এলাকার মানুষের হবে। শুধু তা–ই নয়, এই খাল পুনঃখনন যখন শেষ হয়ে যাবে, আমরা এর দুপাশ দিয়ে প্রায় ৩ হাজার বৃক্ষরোপণ করব।’
এ বিষয়ে তারেক রহমান আরও বলেন, ‘এই এলাকার মা-বোনেরা যাঁরা ঘরে হাঁস পালতেন আগে, খালে পানি না থাকার কারণে অনেকের পক্ষে সেটা আর সম্ভব হচ্ছে না। কিন্তু খালে পানি আসলে মা-বোনদের জন্য বাড়তি রোজগারের সুবিধা হবে হাঁস পালনের মাধ্যমে। আমরা যদি সকলে মিলে পরিশ্রম করি, তাহলে অবশ্যই ভাগ্যের পরিবর্তন করা সম্ভব। অবশ্যই দেশের অবস্থার পরিবর্তন করা সম্ভব। আর তাহলেই দেশের মানুষ ভালো থাকতে পারবে।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বাংলাদেশের প্রায় ২০ কোটি জনসংখ্যার অর্ধেক হচ্ছে নারী। দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া এই নারীদের জন্য শিক্ষাব্যবস্থাকে ফ্রি করে দিয়েছেন ইন্টারমিডিয়েট পর্যন্ত। প্রথমবার করেছেন স্কুল পর্যায় পর্যন্ত, দ্বিতীয়বার করেছেন ইন্টারমিডিয়েট পর্যন্ত। খালেদা জিয়ার সেই কর্মসূচিকে আমরা আরও সামনে নিয়ে যেতে চাই।’
তারেক রহমান বলেন, ‘এ জন্য আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, মেয়েদের পড়ালেখার ব্যবস্থা ডিগ্রি পর্যন্ত বিনা মূল্যে করব। শুধু মেয়েদের শিক্ষাব্যবস্থা আমরা ডিগ্রি পর্যন্ত ফ্রি করব না। একই সাথে আমাদের যে মেয়েরা ভালো রেজাল্ট করবে, তাদের জন্য আমরা উপবৃত্তিরও ব্যবস্থা করব।’
এর আগে সকাল ১১টা ৫৫ মিনিটে প্রধানমন্ত্রী শার্শায় বাবার স্মৃতিবিজড়িত উলসী খাল পুনঃখনন কাজের উদ্বোধন করেন। এ সময় তিনি নিজ হাতে কোদাল দিয়ে মাটি কাটেন। পরে খালের পাড়ে বৃক্ষরোপণ করেন তিনি।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিতের সভাপতিত্বে সমাবেশে বক্তব্য দেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সাখাওয়াত হোসেন, পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদ উদ্দীন চৌধুরী, প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ, স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম প্রমুখ।
প্রধানমন্ত্রী এর আগে বেলা ১১টা ৪২ মিনিটে খাল খননস্থলে আসেন। এসেই খালের ওপরের অংশে নির্মিত ফলক উন্মোচন করেন। এ সময় প্রধানমন্ত্রী আল্লাহর দরবারে দোয়া ও মোনাজাত করেন।
উল্লেখ্য, ১৯৭৬ সালের ১ নভেম্বর যশোরের শার্শার উলসী থেকে যদুনাথপুর পর্যন্ত প্রায় চার কিলোমিটার দীর্ঘ খালটি তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান স্বেচ্ছাশ্রমে খনন করেছিলেন, যা ‘জিয়ার খাল’ নামে পরিচিত। খালটি বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের মাধ্যমে পুনঃখনন করা হচ্ছে।