প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হকের নির্বাচনী প্রচারে পল্লবীর শিশু হত্যার আসামির ছবিটি সম্পাদিত

রাজধানীর পল্লবীতে শিশু হত্যার ঘটনাকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি নির্বাচনী ফেস্টুনের ছবি ব্যাপকভাবে ছড়িয়েছে। ভাইরাল ওই ছবি দিয়ে দাবি করা হচ্ছে, শিশু হত্যা মামলার আসামি সোহেল রানা গত সংসদ নির্বাচনে যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হকের পক্ষে প্রচার চালিয়েছিলেন।

প্রথম লিংক, দ্বিতীয় লিংক, তৃতীয় লিংক, চতুর্থ লিংক

১৯ মে রাজধানীর পল্লবীতে নিজের বাসায় খুন হয় শিশুটি। এই হত্যামামলার আসামি সোহেল রানাকে ওই দিন সন্ধ্যায় নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

যে এলাকায় হত্যাকাণ্ড ঘটেছে, ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে ওই আসন (ঢাকা-১৬) থেকে বিএনপির প্রার্থী হয়েছিলেন আমিনুল হক। তবে তিনি জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীর কাছে পরাজিত হন।

হত্যাকাণ্ডের পরপরই ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে একটি পোস্টারের ছবি। তাতে দেখা যায়, আমিনুল হকের নির্বাচনী প্রচারণার ফেস্টুনে সোহেল রানার ছবি রয়েছে।

তবে যাচাই করে দেখা গেছে, আলোচিত ফেস্টুনটি আসল নয়; এটি ডিজিটাল প্রযুক্তির মাধ্যমে সম্পাদনা করে তৈরি করা হয়েছে।

গণ–অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুতির পর কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সমর্থক বিভিন্ন ফেসবুক পেজ ও অ্যাকাউন্ট থেকে মূলত ছবিটি পোস্ট করা হচ্ছে।

লিংক: এখানে

অনুসন্ধানে ভাইরাল ছবিটির মূল উৎস পাওয়া যায় একটি পুরোনো সংবাদ প্রতিবেদনে। সংবাদমাধ্যম ‘ঢাকা মেইল’-এ ২০২৫ সালের ১৫ ডিসেম্বর প্রকাশিত ‘তফসিলের ৭২ ঘণ্টা পরও ঝুলছে প্রার্থীদের ব্যানার-ফেস্টুন’ শিরোনামের একটি প্রতিবেদনে পাওয়া যায় একই স্থানের একটি ছবি।

লিংক: এখানে

সেই ছবির সঙ্গে ভাইরাল ছবিটির তুলনা করলে দেখা যায়, ফেস্টুনের অবস্থান, বৈদ্যুতিক খুঁটি ও পেছনের ভবনসহ আশেপাশের পরিবেশ হুবহু এক। অথচ ফেস্টুন দুটি আলাদা।

ছবি দুটি ধরে অনুসন্ধান চালালে দুটির মধ্যে কিছু অসামঞ্জস্য ধরা পড়ে। ভাইরাল ছবিটির মধ্যে এমন কিছু অস্বাভাবিকতা রয়েছে, যা সাধারণত সম্পাদিত ছবিতে থাকে। আলোচিত ছবির অবস্থান, বৈদ্যুতিক খুঁটি, পেছনের ভবন, গাছপালা ও অন্যান্য পোস্টার একই থাকলেও ফেস্টুনের মূল অংশে পরিবর্তনের চিহ্ন রয়েছে। নতুন ছবির ফেস্টুনটি অস্বাভাবিক ঝকঝকে। অথচ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে। এত দীর্ঘ সময় পর খোলা পরিবেশে থাকা একটি ফেস্টুনে স্বাভাবিকভাবেই ভাঁজ, ময়লা বা আবহাওয়ার প্রভাব পড়ার কথা।

প্রথম ছবির ফেস্টুনের বিভিন্ন স্থানে ভাঁজ ও কিছুটা ক্ষয়চিহ্ন রয়েছে। কিন্তু নতুন ছবিতে এসব চিহ্ন অনুপস্থিত। এ ছাড়া ফেস্টুনের লেখাগুলোর ধার, রঙের সামঞ্জস্য ও গ্রাফিক উপাদানের মসৃণতা অন্য অংশগুলোর তুলনায় অস্বাভাবিকভাবে পরিষ্কার দেখা যায়, যা ডিজিটাল সম্পাদনার ইঙ্গিত দেয়।

এ থেকে সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়, এখানে মূল ছবিটি সম্পাদনা করে সেখানে সোহেল রানার ছবি জুড়ে দেওয়া হয়েছে।

পল্লবীতে শিশু হত্যার ঘটনাকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে যখন ক্ষোভ, আতঙ্ক ও বিচার দাবির আলোচনা চলছে, তখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ৫০ সেকেন্ডের ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে।

গুরুদাসপুর উপজেলা যুবলীগ নামে একটি ফেসবুক প্রোফাইলে ভিডিওটি পোস্ট করে দাবি করা হয়, ‘খুলনা কোর্টে শিশু ধর্ষণকারীকে আদালতে তোলার সময় গুলি করে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা।’ ভিডিও এরই মধ্যে ১৬ লাখ বার দেখা হয়েছে ফেসবুকে। পোস্টে প্রতিক্রিয়া পড়েছে প্রায় ১৩ হাজার, শেয়ার হয়েছে ৯ হাজারের বেশিবার এবং মন্তব্য পড়েছে ২ হাজার।

প্রথম লিংক, দ্বিতীয় লিংক, তৃতীয় লিংক

ব্যক্তিগত প্রোফাইলের এ পেজ থেকে কোথাও আবার লেখা হয়, ‘ধর্ষকের বিচার না পেয়ে এখন সাধারণ জনগণই বিচার করছে’, কিংবা ‘শুরু হয়ে গেছে জনতা বিচার, ধর্ষককে গুলি করে হত্যা।’

প্রথম লিংক, দ্বিতীয় লিংক, তৃতীয় লিংক

তবে যাচাই করে দেখা গেছে, ভিডিওটির সঙ্গে প্রচারিত দাবির কোনো সত্যতা নেই।
ভিডিওটির কয়েকটি কি-ফ্রেম রিভার্স ইমেজ সার্চের মাধ্যমে অনুসন্ধান করে দৈনিক প্রথম আলো–তে ‘খুলনায় আদালতে হাজিরা দিতে আসা দুজনকে গুলি করে হত্যা’ এই শিরোনামে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন পাওয়া যায়।

লিংক: এখানে

২০২৫ সালের ৩০ নভেম্বর প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, খুলনা মহানগর দায়রা জজ আদালতের প্রধান ফটকের বাইরে দুর্বৃত্তদের গুলিতে দুজন নিহত হন। ওই দিন দুপুর সোয়া ১২টার দিকে আদালতে হাজিরা দিয়ে বের হওয়ার পর মোটরসাইকেলের পাশে দাঁড়িয়ে চা পান করছিলেন দুজন ব্যক্তি। এ সময় ৪ থেকে ৫ জন দুর্বৃত্ত হেঁটে এসে তাদের লক্ষ্য করে গুলি চালায়।

ঘটনাটি সে সময় দেশের বিভিন্ন সংবাদপত্র ও টেলিভিশন চ্যানেলে প্রকাশিত ও প্রচারিত হয়। তবে কোনো প্রতিবেদনেই নিহত ব্যক্তিদের শিশু ধর্ষণের আসামি বলা হয়নি। একইভাবে কোথাও উল্লেখ নেই যে পুলিশ ভ্যান থেকে নামানোর সময় জনতা বা দুর্বৃত্তরা তাদের গুলি করে হত্যা করেছে।

প্রথম লিংক, দ্বিতীয় লিংক, তৃতীয় লিংক

অর্থাৎ, খুলনা আদালত প্রাঙ্গণে সংঘটিত একটি পুরোনো হামলার ভিডিওকে শিশু ধর্ষণকারীর ওপর ‘জনতা বিচার’ দাবিতে নতুনভাবে প্রচার করা হচ্ছে, যা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও বিভ্রান্তিকর।

পল্লবীতে হত্যাকাণ্ডের শিকার শিশুটির বাবাকে নিয়ে একটি ছবিও ছড়িয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। তাতে দেখা যায়, জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান নিহত শিশুটির বাবার হাতে একটি চেক তুলে দিচ্ছেন। ছবিটির সঙ্গে দাবি করা হচ্ছে, শিশুটির পরিবারকে ১০ লাখ টাকা আর্থিক সহায়তা দিয়েছেন জামায়াত আমির।

প্রথম লিংক, দ্বিতীয় লিংক, তৃতীয় লিংক, চতুর্থ লিংক

তবে যাচাই করে দেখা গেছে, দাবিটি সত্য নয়। বরং প্রচারিত ছবিটি ডিজিটাল প্রযুক্তি ও এআই ব্যবহার করে সম্পাদিত।

এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কি-ওয়ার্ড সার্চ করে কোনো নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যম, গণমাধ্যম প্রতিবেদনে শিশুটির পরিবারকে জামায়াত আমিরের আর্থিক সহায়তা দেওয়ার কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। জামায়াতের অফিশিয়াল ফেসবুক পেজ কিংবা শফিকুর রহমানের ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টেও এমন কোনো ছবি বা তথ্য নেই। শফিকুর রহমান একটি শোকবার্তা পোস্ট করলেও পরিবারটির সঙ্গে দেখা করার কোনো তথ্য সেখানে নেই। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে জানা যায়, ২০ মে তিনি হজ পালনের জন্য ঢাকা ছেড়েছেন।
প্রথম লিংক, দ্বিতীয় লিংক

ভাইরাল ছবিটির সত্যতা যাচাই করতে রিভার্স ইমেজ সার্চ করলে দেখা যায়, এটি মূলত ঢাকা-১৬ আসনে জামায়াতের সংসদ সদস্য আবদুল বাতেনের শিশুটির বাবার সঙ্গে দেখা করার ছবি ও ভিডিওর অংশবিশেষ থেকে তৈরি করা হয়েছে। মূল ছবিতে যেখানে আবদুল বাতেন ছিলেন, সেখানে ডিজিটাল এডিটের মাধ্যমে শফিকুর রহমানের অবয়ব বসানো হয়েছে।
লিংক: এখানে

এ ছাড়া ছবিটি গুগলের ডিজিটাল ওয়াটারমার্ক শনাক্তকরণ প্রযুক্তি দিয়েও পরীক্ষা করা হয়। বিশ্লেষণে দেখা যায়, ছবিটির বড় অংশ বা সম্পূর্ণ অংশই গুগলের এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি অথবা সম্পাদনা করা হয়েছে।

সব মিলিয়ে যাচাইয়ে নিশ্চিত হওয়া যায়, শিশুটির বাবাকে জামায়াত আমির ১০ লাখ টাকার চেক দিয়েছেন—এমন দাবিতে প্রচারিত ছবিটি সত্য নয়।