ক্ষমতার গরমের আঁচ পড়েছে, স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র গুঁড়িয়ে দেওয়া প্রসঙ্গে জামায়াত আমির

জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমানফাইল ছবি: প্রথম আলো

মধ্যরাতে রাজধানীর মিরপুর-১-এর রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে লুটপাট চালানোর পর গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান। তিনি এ ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের খুঁজে বের করে কঠোর শাস্তির আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন।

জামায়াত আমির বলেছেন, ‘এবার ক্ষমতার গরমের আঁচ পড়ল স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রের ওপর। রাতের আঁধারে স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রটি গুঁড়িয়ে দিয়ে সেখানে রহস্যজনক একটি সাইনবোর্ড টানিয়ে দেওয়া হয়েছে।’

আজ শনিবার বেলা ১১টার দিকে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক স্ট্যাটাসে শফিকুর রহমান এ কথা বলেন। তাঁর ভাষ্য, মধ্যরাতে মুখোশ পরা দুই শতাধিক ব্যক্তি দেশীয় অস্ত্র নিয়ে স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রটিতে হামলা, লুটপাট ও ভাঙচুর চালানোর পর সেটি গুঁড়িয়ে দেন।

প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন জামায়াতের আমির। তিনি লিখেছেন, ‘কোথায় প্রশাসন, কোথায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী? এর পেছনে কারা রয়েছে, তা আর মোটেই অস্পষ্ট নয়। তাদের পেটের ক্ষুধা কোনোভাবেই নিবারণ হচ্ছে না। তারাই জনগণের স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার এই সুযোগটিকে নিশ্চিহ্ন করে দিল।’

শফিকুর রহমান আরও লিখেছেন, সরকার একদিকে জনগণের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার অঙ্গীকার করছে, অন্যদিকে এ ধরনের ঘটনা ঘটছে। তিনি জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে কঠোর শাস্তির দাবি জানান।

জামায়াতের মহানগর আমির-সেক্রেটারির বিবৃতি

এদিকে একই ঘটনায় নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর ঢাকা মহানগর উত্তরের আমির মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন ও সেক্রেটারি মুহাম্মদ রেজাউল করিম।

আজ এক যৌথ বিবৃতিতে তাঁরা বলেন, গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য ও স্থানীয় ব্যক্তিদের ভাষ্য অনুযায়ী, সংরক্ষিত নারী আসনের বিএনপির একজন সংসদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী উত্তরের এক বিএনপি নেতার পরিকল্পনা ও ইন্ধনে দুই শতাধিক ব্যক্তি ওই স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে হামলা চালান। পরে ভাঙচুর ও লুটপাট করে ভারী যন্ত্রপাতি দিয়ে পুরো স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়।

বিবৃতিতে বলা হয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে মিরপুরের নিম্ন আয়ের ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের মাতৃ ও শিশুসেবা, টিকাদান, পরিবার পরিকল্পনা এবং বিভিন্ন স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে আসা একটি প্রতিষ্ঠানের ওপর এ ধরনের হামলা উদ্বেগজনক এবং গণতান্ত্রিক সরকারের সময়ে এ ধরনের ঘটনা দুঃখজনক।

আরও পড়ুন

জমি নিয়ে বিরোধ বা মালিকানার দাবি থাকলে তা আইন, প্রশাসন ও আদালতের মাধ্যমে নিষ্পত্তির সুযোগ রয়েছে বলেও বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়।

জামায়াতের নেতারা বলেন, আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে রাতের আঁধারে একটি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান ভেঙে ফেলা এবং চিকিৎসাসামগ্রী ও সরকারি টিকাদান কর্মসূচির সরঞ্জাম লুটের অভিযোগ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

ঘটনার পেছনে কারা রয়েছে, হামলার উদ্দেশ্য কী ছিল এবং এ ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা কী ছিল—এসব বিষয়ে দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা। তাঁদের মতে, কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর রাজনৈতিক কিংবা প্রভাবশালী পরিচয় যেন তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করতে না পারে।

আরও পড়ুন

বিবৃতিতে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত শনাক্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া, লুট হওয়া চিকিৎসাসামগ্রী ও সরকারি সরঞ্জাম উদ্ধারে উদ্যোগ এবং ক্ষতিগ্রস্ত স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রটির কার্যক্রম দ্রুত পুনরায় চালুর ব্যবস্থা করার আহ্বান জানানো হয়।

মবের বিরুদ্ধে সরকারের অবস্থান শুধু বক্তব্যে নয়, মাঠেও প্রমাণ করতে হবে

আমার বাংলাদেশ পার্টিও (এবি পার্টি) একই ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও গভীর উদ্বেগ জানিয়েছে।

আজ এক বিবৃতিতে দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান অধ্যাপক ওহাব মিনার ও সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান ফুয়াদ বলেন, এটি শুধু একটি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে হামলা নয়; রাষ্ট্রের আইন, প্রশাসনের সক্ষমতা ও সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার ওপরও আঘাত।

বিবৃতিতে বলা হয়, দীর্ঘদিন ধরে সুবিধাবঞ্চিত মানুষের, বিশেষ করে নারী ও শিশুদের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, মাতৃসেবা, পরিবার পরিকল্পনা ও টিকাদান কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত ছিল কেন্দ্রটি। প্রতিষ্ঠানটির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, হামলাকারীরা সরকারি ইপিআই টিকা, টিকাদানের রেজিস্টার ও গুরুত্বপূর্ণ নথি, ওষুধ, চিকিৎসাসামগ্রী ও নগদ অর্থ লুট করেছে। পরে ভারী যন্ত্রপাতি দিয়ে স্থাপনাটি গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। প্রতিষ্ঠানটির হিসাবে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ প্রায় দেড় কোটি টাকা।

এবি পার্টির নেতারা বলেন, জমি বা লিজ নিয়ে কারও বৈধ দাবি থাকলে তা আইন, আদালত ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় নিষ্পত্তি করতে হবে। রাতের আঁধারে দলবল নিয়ে একটি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র ভাঙচুর, লুটপাট বা দখলের বৈধতা কারও নেই।

গণমাধ্যমে কোনো কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তি বা স্থানীয় নেতার সম্পৃক্ততার অভিযোগ এসেছে উল্লেখ করে তাঁরা বলেন, এসব অভিযোগের সত্যতা নিরপেক্ষ তদন্তে নির্ধারণ করতে হবে। অভিযোগ সত্য হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনতে হবে, আর মিথ্যা হলে সেটিও তদন্তে স্পষ্ট করতে হবে।

বিবৃতিতে বলা হয়, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ প্রকাশ্যে বলেছেন, ‘মব কালচার শেষ’ এবং দাবি আদায়ের নামে মব কালচার করা যাবে না। সরকার সত্যিই যদি মবের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে থাকে, তাহলে মিরপুরের ঘটনায় তার বাস্তব প্রয়োগ দেখাতে হবে।

আরও পড়ুন

এবি পার্টি হামলায় জড়িত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার, পরিকল্পনাকারী ও পৃষ্ঠপোষকদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা, লুট হওয়া সরকারি টিকা ও চিকিৎসাসামগ্রী উদ্ধারের পাশাপাশি পুলিশের ভূমিকা তদন্ত এবং ক্ষতিগ্রস্ত স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম দ্রুত পুনর্বহালের দাবি জানিয়েছে।

বিবৃতিতে এবি পার্টি ৬টি দাবি জানিয়েছে। এগুলো হলো রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটে জড়িত প্রত্যেককে শনাক্ত করে দ্রুত গ্রেপ্তার করতে হবে; হামলার পরিকল্পনাকারী, অর্থদাতা ও পৃষ্ঠপোষকদের নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে হবে; লুট হওয়া সরকারি টিকা, চিকিৎসা সরঞ্জাম, নথিপত্র ও অন্যান্য সামগ্রী দ্রুত উদ্ধার করতে হবে; হামলার সময় পুলিশের ভূমিকা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্ব পালনে কোনো গাফিলতি ছিল কি না, তা তদন্ত করতে হবে; জমির মালিকানা বা লিজ নিয়ে কোনো বিরোধ থাকলে তা আইনানুগ প্রক্রিয়ায় নিষ্পত্তি করতে হবে; এবং ক্ষতিগ্রস্ত স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রের চিকিৎসা, মাতৃসেবা, পরিবার পরিকল্পনা ও টিকাদান কার্যক্রম দ্রুত পুনর্বহাল করতে হবে।

গত বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত ১২টার দিকে মিরপুর-১-এর রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। মুখোশ পরা দুই শতাধিক ব্যক্তি দেশীয় অস্ত্র নিয়ে সেখানে ঢুকে দুই নিরাপত্তাকর্মীকে জিম্মি করে বলে অভিযোগ। পরে মূল্যবান যন্ত্রপাতি, ওষুধ, টিকা, নগদ টাকা ও অন্যান্য মালপত্র লুট করে নেওয়া হয়। এরপর ভারী যন্ত্রপাতি দিয়ে একটি পাকা ও তিনটি আধা পাকা ভবনসহ পুরো স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়।

আরও পড়ুন