প্রতীক নয়, ব্যক্তি ও পারিবারিক পরিচয় আলোচনার কেন্দ্রে

জাতীয় নির্বাচনে ভোটের অঙ্কে দলীয় প্রতীক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু দক্ষিণের জেলা পিরোজপুর ঘুরে দেখা গেল ভিন্ন বাস্তবতা। এখানে প্রতীকের চেয়েও বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে প্রার্থীর ব্যক্তিগত পরিচিতি। একই সঙ্গে প্রার্থীদের স্থানীয় প্রভাব এবং পারিবারিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে।

বরগুনা থেকে বিষখালী নদী পার হয়ে পাথরঘাটা দিয়ে প্রবেশ করলাম পিরোজপুরের মঠবাড়িয়ায়। রাস্তার দুই পাশে ধানখেত, মাঝেমধ্যে বাজার, আবার কোথাও নদীর ধারে নৌকার সারি। অতীতে পিরোজপুরে নির্বাচন মানেই ছিল সহিংসতা, আতঙ্ক। জাতীয় থেকে স্থানীয়—প্রায় প্রতিটি নির্বাচনের ইতিহাসেই সংঘর্ষ ও হতাহতের ঘটনা আছে। তবে এবার ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে এখন পর্যন্ত বড় কোনো সহিংসতার খবর নেই।

পিরোজপুরের মঠবাড়িয়ায় বিএনপি ও ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের প্রার্থীর প্রচার
ছবি: প্রথম আলো

মঠবাড়িয়া, ভান্ডারিয়াসহ পিরোজপুরের বিভিন্ন ইউনিয়ন ঘুরে এবং ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে মনে হয়েছে, শান্তির এ আবরণের নিচে জমে আছে নানা অদৃশ্য সমীকরণ। নদীভাঙন ও সুপেয় পানি ব্যবস্থাপনায় ভূমিকা এবং দলীয় কোন্দল এবারের ভোটের হিসাব বদলে দিতে পারে। বিশেষ করে সংখ্যালঘু ভোটারদের মধ্যে আস্থা তৈরি করতে পারা এবং নীরব ভোটারদের মধ্যে আকর্ষণ সৃষ্টি করতে যিনি যত এগিয়ে থাকবেন, তাঁর সম্ভাবনাও তত বাড়বে।

পিরোজপুর জেলায় তিনটি সংসদীয় আসন রয়েছে। এর মধ্যে পিরোজপুর-১ আসন গঠিত হয়েছে সদর উপজেলা, নাজিরপুর ও ইন্দুরকানি নিয়ে। এখানে ভোটার ৩ লাখ ৯২ হাজার ১৭৮ জন। পিরোজপুর-২ (ভান্ডারিয়া-কাউখালী-নেছারাবাদ) আসনে ভোটার ৪ লাখ ৯ হাজার ২৮৮ জন। আর মঠবাড়িয়া উপজেলা নিয়ে গঠিত পিরোজপুর-৩ আসনে ভোটার ২ লাখ ৪১ হাজার ৩৬১ জন। অতীতের নির্বাচনে এসব আসনে ভোটের সমীকরণে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই একক দলের চেয়ে একক ব্যক্তির আধিপত্য বেশি দেখা গেছে।

পিরোজপুর-১

এবার পিরোজপুর-১ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন বিএনপির ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী আলমগীর হোসেন ও জামায়াতে ইসলামীর দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থী মাসুদ সাঈদী। ১৯৯৬ সালের জুনের নির্বাচন থেকে এখন পর্যন্ত এই আসনে কখনো জামায়াতে ইসলামী, আবার কখনো আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা জয়ী হয়েছেন। যেসব নির্বাচনে বিএনপি অংশ নিয়েছে, সেসব নির্বাচনে অন্য প্রার্থীদের তুলনায় ধানের শীষের ব্যবধান তুলনামূলক কম ছিল।

এবার আওয়ামী লীগ না থাকায় মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা ধানের শীষ ও দাঁড়িপাল্লার মধ্যে। এই আসন থেকে দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে দুবার—১৯৯৬ ও ২০০১ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন জামায়াতের নায়েবে আমির ও বিশিষ্ট ইসলামি বক্তা মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী। এবার দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে নির্বাচন করছেন তাঁর ছেলে মাসুদ সাঈদী। ২০১৪ সালে উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন মাসুদ সাঈদী। এখানকার ভোটারদের অনেকের কাছে দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের চেয়েও সাঈদীর ছেলে—এই পরিচয় অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

এই আসনে বিএনপির প্রার্থীর সঙ্গে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বলে দলটির স্থানীয় নেতারা দাবি করেন। স্থানীয় অনেকের মতে, বিএনপির কর্মী বাহিনী শক্তিশালী। তবে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর একটি ভোট ব্যাংক রয়েছে। তাই যে প্রার্থী সাধারণ মানুষের ভোট যত বেশি টানতে পারবেন, তিনি তত এগিয়ে থাকবেন। এ ছাড়া এখানে সংখ্যালঘু ভোটারও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক রয়েছেন। তাঁদের আস্থা অর্জন বা আশ্বস্ত করতে পারাটাও গুরুত্বপূর্ণ।

পিরোজপুর-২

পিরোজপুর ২ আসনের ভান্ডারিয়ায় প্রার্থীদের নির্বাচনী প্রচার, মঙ্গলবার বিকেল ৫টা
ছবি: প্রথম আলো

ভান্ডারিয়া-কাউখালী-নেছারাবাদ নিয়ে গঠিত পিরোজপুর-২। এ আসনে জাতীয় পার্টির (জেপি) চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন মঞ্জু ছয়বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। তবে ২০২৪ সালের আওয়ামী লীগের অধীন দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে তাঁরই এক সময়ের ব্যক্তিগত সহকারী মহিউদ্দিন মহারাজের কাছে তিনি পরাজিত হন। আওয়ামী লীগের নেতা মহারাজ স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছিলেন।

তবে স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, এ আসনে এখনো আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর ভোট ব্যাংক রয়েছে, কিন্তু তিনি এবার নির্বাচন করছেন না। তবে তাঁরই চাচাতো ভাই বিএনপির নেতা মাহমুদ হোসেন স্বতন্ত্র প্রার্থী (প্রতীক ঘোড়া) হয়েছেন। মাহমুদের আরেক ভাই মো. মহিবুল হোসেন জেপির প্রার্থী (বাইসাইকেল)। যদিও এলাকা ঘুরে মহিবুলের খুব একটা প্রচার চোখে পড়েনি।

মঙ্গলবার বিকেলে মঠবাড়িয়া থেকে ভান্ডারিয়ার লিয়াকত মার্কেট এলাকায় পৌঁছাই। সাধারণ ভোটারদের সঙ্গে কথা বলার সময় সেখানে প্রচারে আসেন ঘোড়া প্রতীকের মাহমুদ হোসেন। সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে তিনি এই প্রতিবেদকের কাছে নির্বাচনী পরিবেশ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তাঁর অভিযোগ, ভোটারদের ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে। প্রশাসন নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করছে না।

এই আসনে বিএনপির প্রার্থী আহম্মদ সোহেল মনজুর আর জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী হলেন মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর আরেক ছেলে শামীম সাঈদী। সোহেল মনজুর সাবেক প্রতিমন্ত্রী নূরুল ইসলাম মঞ্জুর ছেলে এবং ভান্ডারিয়া উপজেলা বিএনপির সভাপতি। এই প্রার্থীর পারিবারিক পরিচয় এখানে ভোটের অঙ্কে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

বিভিন্ন পর্যায়ের লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, এই আসনে ত্রিমুখী লড়াই হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। এখানে বিএনপির সাংগঠনিক অবস্থা ভালো। সে হিসেবে ধানের শীষের অবস্থান শক্ত হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু দলের একজন ‘বিদ্রোহী’ (স্বতন্ত্র) প্রার্থী থাকায় দলীয় ভোট ভাগ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। অপর দিকে জামায়াতের পক্ষে শামীম সাঈদীর মরহুম বাবার প্রভাব রয়েছে।

কথা হচ্ছিল ভান্ডারিয়ার লিয়াকত মার্কেটের ব্যবসায়ী কাজী মিজানুর রহমানের সঙ্গে। তিনি বলেন, এখানে বিএনপিতে অন্তর্দ্বন্দ্ব বেশি। কেউ কাউকে মানেন না। এটা ঠিক করতে না পারলে বিএনপির প্রার্থীকে ভুগতে হবে।

তবে এই আসনে আওয়ামী লীগের সমর্থকদের ভোট কোন দিকে যাবে, তা নিয়েও নানা জল্পনাকল্পনা চলছে। ভান্ডারিয়ায় কথা হয় ছাত্রলীগের স্থানীয় এক নেতার সঙ্গে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, দল থেকে কোনো সিদ্ধান্ত আসেনি। হয়তো টেলিগ্রাম গ্রুপে কেন্দ্র থেকে জেলায় কোনো সিদ্ধান্ত আসবে। জেলা নেতৃত্ব যা বলবেন, সেটা অনুসরণ করবেন।

পিরোজপুর-৩

মঠবাড়িয়ার বড় মাছুয়া ইউনিয়নের ২নং ফেরিঘাটে ভোট নিয়ে কথা বলছিলেন সজীব ফরাজী। তিনি এবারই প্রথম ভোট দেবেন। মঙ্গলবার বিকেল চারটা
ছবি: প্রথম আলো

এ আসন গঠিত হয়েছে মঠবাড়িয়া উপজেলা নিয়ে। এই আসনে বিএনপির প্রার্থী মো. রুহুল আমীন দুলাল। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী ইসলামী আন্দোলনের হাতপাখা প্রতীকের মো. রুস্তম আলী ফরাজী ও ১১-দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের প্রার্থী জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) শাপলা কলি প্রতীকের মো. শামীম হামিদী।

স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ছাত্রদল ও যুবদল থেকে উঠে আসা বিএনপির প্রার্থী দুলালের কর্মীদের মধ্যে জনপ্রিয়তা রয়েছে। তবে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর কর্মীদের একাংশের কিছু কর্মকাণ্ড নিয়ে এলাকায় সমালোচনা রয়েছে।

২০২৪ সালের ১২ সেপ্টেম্বর ‘মানুষকে হুমকি, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং নীতি ও আদর্শ-পরিপন্থী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত থেকে দলের শৃঙ্খলা ভঙ্গ করার কারণে’ দুলালকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। অবশ্য পরে বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করা হয়।

হাতপাখা প্রতীকের প্রার্থী মো. রুস্তম আলী ফরাজী দলের চেয়ে নিজ পরিচয়ে বেশি আলোচিত। তিনি বিএনপি থেকে দুবার, আওয়ামী লীগ-সমর্থিত মহাজোট থেকে একবার এবং একবার স্বতন্ত্র হিসেবে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তিনি ইসলামী আন্দোলনে যোগ দেন। এলাকায় তাঁর নিজস্ব একটি ভোট ব্যাংক রয়েছে। তবে দল পরিবর্তনের কারণে তাঁকে ঘিরে একধরনের নেতিবাচক প্রচারণাও রয়েছে। এবার তাঁর প্রভাবশালী কয়েকজন সমর্থক বিএনপিতে যোগ দেন। ইসলামী আন্দোলন শেষ সময়ে জামায়াত জোট থেকে বের হয়ে যাওয়ায় ভোটের হিসাবে তিনি কিছুটা চাপে পড়েছেন। তবে সবকিছুর পরও তিনি শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী।

এর মধ্যে আওয়ামী লীগ–সমর্থিত ভোটারদের ভোট কোন দিকে যাবে, সেটি ভোটের অঙ্কে একটা বিষয়। তবে এখানকার আওয়ামী লীগ দীর্ঘদিন ধরে দুই ভাগে বিভক্ত। এবারের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের স্থানীয় কর্মী-সমর্থকদের একটা অংশ বিএনপির সঙ্গে এবং আরেকটি অংশ হাতপাখার প্রার্থীর সঙ্গে যোগাযোগ রেখে চলেছে বলে স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে।

তবে এলাকা ঘুরে আরেক দিক চোখে পড়ল। সেটা হলো দলীয় প্রতীকের তিন প্রার্থীর বাইরে দুই স্বতন্ত্র প্রার্থী—তৌহিদুজ্জামান (ফুটবল) ও বাংলাদেশ জাসদের করিম সিকদারের (মোটরগাড়ি)—বেশ জোরেশোরে প্রচার চালাচ্ছেন।

ভোটের অন্য হিসাব

মঠবাড়িয়ায় বলেশ্বর নদের তীরে দাঁড়িয়ে নদীভাঙন আর সুপেয় পানির কষ্টের কথা বলছিলেন ৭২ বছর বয়সী খালেক খন্দকার। মঙ্গলবার, বিকেল পৌনে চারটা
ছবি: প্রথম আলো

সুপেয় পানি, নদীভাঙন, জীবিকা ও নিরাপত্তা—এসব পিরোজপুরের মানুষের কাছে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অতীতে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে দেওয়া ট্যাংক নিয়ে অনেক বিতর্ক হয়েছে। স্থানীয় লোকজন এসব ট্যাংককে ‘ড্রাম’ বলেন। অনেক ক্ষেত্রে এসব ড্রাম দিতে বাড়তি টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। ভোটের মাঠেও এসব বিষয় আলোচিত হচ্ছে।

মাছুয়া ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের ফেরিঘাটে কথা হয় ৭২ বছর বয়সী জেলে খালেক খন্দকারের সঙ্গে। সারা জীবন নদীর সঙ্গে লড়াই করে কাটিয়েছেন তিনি। মাঝনদীর দিকে ইশারা করে তিনি বলেন, ‘এই জায়গা পর্যন্ত আমাদের কৃষিজমি ছিল। জন্মভিটা নদীতে গেছে। পানির সঙ্গে যুদ্ধ করে আছি।’ খালেক খন্দকারের অভিযোগ, ‘এলাকায় ভালো পুকুর নেই। লোনাপানির কারণে টিউবওয়েল বসানো যায় না। এখন নদীর পানিই খেতে হয়। নেতারা পানির ড্রাম (বৃষ্টির পানি ধরার ট্যাংক) দেয় বড়লোকদের।’

একই ইউনিয়নের মাছ ব্যবসায়ী সাহাবুদ্দিন বলেন, ‘নির্বাচন দিয়ে কী করব, পেটের দায়ে কাজ করি। ভোট নিয়ে কোনো কথা বলতে চাই না।’ স্থানীয় ব্যক্তিদের একাংশের মধ্যে ভোট নিয়ে এমন অনীহাও লক্ষ করা গেছে।

নির্বাচনের দিন যত এগিয়ে আসছে, ততই স্পষ্ট হচ্ছে—পিরোজপুরে ভোটের অঙ্ক কেবল দলীয় প্রতীক দিয়ে মেলানো যাবে না। এখানে ব্যক্তির প্রভাব, স্থানীয় হিসাব-নিকাশ ও দলীয় কোন্দল ভোটের অঙ্ক মেলাতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।