বিদ্রোহী প্রার্থীরা না সরলে ব্যবস্থা নেবে বিএনপি

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান। আজ শুক্রবার বিকেলে শেরেবাংলা নগরে দলের প্রয়াত চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার ওপর আলোকচিত্র প্রদর্শনী শেষেছবি: বিএনপির সৌজন্যে

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অনেক আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থীদের পাশাপাশি দলের নেতারা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। বিষয়টি বিএনপির জোটভুক্ত শরিক দলগুলোর নেতাদের পাশাপাশি দলটির কেন্দ্রীয় নেতাদের জন্যও দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগ ছাড়া হতে যাওয়া এই নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের মূল প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে রয়েছে জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ নেতৃত্বাধীন ১১–দলীয় জোট। সে কারণে ভোটে জয়ী হতে হলে প্রতিটি আসনে বিএনপির একক প্রার্থী থাকা গুরুত্বপূর্ণ। অপর দিকে দীর্ঘদিনের যুগপৎ আন্দোলনে যুক্ত থাকা দলগুলোর নেতারা যেসব আসনে বিএনপির সমর্থন পেয়েছেন, সেগুলোতেও বিএনপিদলীয় স্বতন্ত্র প্রার্থী থাকায় তাঁদের জন্যও নির্বাচন কঠিন হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

এই পরিস্থিতিতে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীদের বিষয়ে সাংবাদিকেরা জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেছেন, তফসিলে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের যে শেষ সময় দেওয়া হয়েছে, তার মধ্যে দলের বিদ্রোহী প্রার্থীরা প্রার্থিতা প্রত্যাহার করবেন। আর তা না হলে ওই নেতাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

আজ শুক্রবার বিকেলে রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে দলের প্রয়াত চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার ওপর আলোকচিত্র প্রদর্শনী শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেন নজরুল ইসলাম খান, যিনি এবার বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যানের দায়িত্বে রয়েছেন।

বিএনপির মতো এত বড় দলে যোগ্য প্রার্থী প্রচুর উল্লেখ করে নজরুল ইসলাম খান বলেন, সেখানে অনেকেই মনে করেছেন, তাঁকে মনোনীত করা হলে আরও ভালো হতো। তাঁরা সে জন্য চেষ্টা করছেন।

তিনি বলেন, ‘আমরা আহ্বান জানিয়েছি তাঁদের যে দলের সিদ্ধান্তের প্রতি যেন তাঁরা শ্রদ্ধাশীল হয়ে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করেন। আমরা আশা করছি যে তাঁরা প্রত্যাহার করবেন। অনেকেই অলরেডি (ইতিমধ্যে) প্রত্যাহার করার কথা জানিয়েছেন আমাদের। তো সে জন্য আমি মনে করি, প্রত্যাহার করার সময়ের মধ্যেই এই পরিস্থিতির অনেক উন্নতি হয়ে যাবে। নইলে দল তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেবে।’

ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী ২০ জানুয়ারি পর্যন্ত মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করতে পারবেন প্রার্থীরা। এরপর ২১ জানুয়ারি চূড়ান্ত প্রার্থীদের প্রতীক বরাদ্দের পর ২২ জানুয়ারি থেকে নির্বাচনী প্রচার শুরু হবে। ভোট হবে ১২ ফেব্রুয়ারি।

দলের নেতারা নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই প্রার্থিতা প্রত্যাহার করবেন বলে আশাবাদী হলেও ইতিমধ্যে বিদ্রোহী প্রার্থী হওয়া কয়েকজন নেতার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে বিএনপি। গত ৩০ ডিসেম্বর দলটির এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সহ-আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক রুমিন ফারহানা, ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক সাইফুল আলম (নীরব) ও কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য হাসান মামুনসহ ৯ জনকে বহিষ্কারের কথা জানানো হয়।

রুমিন ফারহানা, সাইফুল আলম ও হাসান মামুন—তিনজনই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন। রুমিন ফারহানার এলাকা ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে জোট শরিক জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় সহসভাপতি মাওলানা জুনায়েদ আল হাবিবকে জোটের প্রার্থী ঘোষণা করেছে বিএনপি।

সাইফুল আলমকে প্রাথমিকভাবে ঢাকা–১২ আসনের জন্য প্রার্থী হিসেবে মনোনীত করেছিল বিএনপি। পরে আরেক জোট শরিক বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হককে ওই আসন ছেড়ে দিয়েছে বিএনপি। এরপর স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন সাইফুল আলম।

আর ছাত্রদলের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাবেক সভাপতি হাসান মামুনের বাড়ি পটুয়াখালী জেলায়। গলাচিপা-দশমিনা নিয়ে গঠিত পটুয়াখালী–৩ আসনটি যুগপৎ আন্দোলনের আরেক শরিক দল গণ অধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হককে ছেড়ে দিয়েছে বিএনপি। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হবেন বলে দীর্ঘদিন কার্যক্রম চালিয়ে আসা হাসান মামুনও সেখানে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন।

দীর্ঘদিন বিএনপি ও এর বিভিন্ন অঙ্গ–সহযোগী সংগঠনে প্রভাবশালী এই নেতারা স্বতন্ত্র প্রার্থী হলেও এলাকায় দলের নেতা–কর্মীদের বড় অংশ তাঁদের পক্ষেই অবস্থান নিচ্ছেন। এটা প্রত্যাশিত নয় বলে মন্তব্য করেছেন জোট শরিক দলের এক নেতা।

জাতীয় নির্বাচনের কার্যক্রম চলার মধ্যে ঢাকায় বিএনপির অঙ্গসংগঠনের এক নেতাকে গুলি করে হত্যার বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে নজরুল ইসলাম খান বলেন, ‘গণতন্ত্র উত্তরণের পথে সব ভালো কাজের শত্রু থাকে, সব ভালো উদ্যোগের বিরোধিতা থাকে। কাজেই এটা অস্বাভাবিক কিছু না। আমাদের শহীদ হাদির (শহীদ শরিফ ওসমান বিন হাদি) ঘটনাটাও এরই অংশ। যাঁরাই দেশের জন্য, দেশের স্বাধীনতা–সার্বভৌমত্বের জন্য এবং দেশের কল্যাণের জন্য কাজ করতে চান, তাঁদেরও শত্রু থাকে।’

এ প্রসঙ্গে বিএনপির এই জ্যেষ্ঠ নেতা আরও বলেন, ‘সে শত্রুরা চেষ্টা করে যাতে এই ভালো কাজের, মঙ্গলময় কাজের গতি থামানো না গেলেও যেন ধীরও করা যায়। কিন্তু আমি বিশ্বাস করি যে এ দেশের মানুষ তারা আন্দোলন–সংগ্রামে পুড়ে খাঁটি সোনা হয়ে গেছে। কাজেই তাদের এসব কোনো অপকর্মের দ্বারা ঠেকায়া রাখা সম্ভব হবে না।’

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নজরুল ইসলাম খান বলেন, ‘দৈনন্দিন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি রক্ষার দায়িত্ব তো সরকারের। এ ব্যাপারে আমরা সরকারকে আহ্বান জানিয়েছি এবং আবার আহ্বান জানাব যে তারা যেন অত্যন্ত সক্রিয় হয় এবং কৌশলী হয়। মনে রাখতে হবে যে যারা নির্বাচনটা এই সময় হোক চায় না, কিংবা যারা নির্বাচনের মাধ্যমে দেশে গণতন্ত্র উত্তরণ ঘটুক এটা চায় না, কিংবা যারা বাংলাদেশেরই একটা স্থিতিশীলতার বিপক্ষে, তারা তো সবাই চেষ্টা করবেই।...আমরা ধারণা করি যে সরকার প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেবে এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হবে।’

এ সময় নজরুল ইসলাম খান ‘বগুড়া মিডিয়া অ্যান্ড কালচারাল সোসাইটি’র সদস্যদের নিয়ে খালেদা জিয়ার কবর জিয়ারত করেন।