দলীয় সূত্র জানায়, সভায় আলোচনা হয়েছে, হঠাৎ করে জাপার সম্মেলন আহ্বান থেকে শুরু করে দলের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে রওশন এরশাদের নামে গণমাধ্যমে যেসব বিবৃতি-বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হচ্ছে, তা তিনি স্বেচ্ছায় করছেন না, তাঁকে বাধ্য করা হচ্ছে।

কো-চেয়ারম্যানদের সভার পর সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন জাপার মহাসচিব মো. মুজিবুল হক। তিনি বলেন, ‘জাতীয় পার্টির (জাপা) প্রধান পৃষ্ঠপোষক রওশন এরশাদ পার্টির বিরুদ্ধে স্বেচ্ছায় কিছু করছেন বলে বিশ্বাস করি না। তবে ম্যাডাম তাঁর ছেলে (সাদ এরশাদ) ও আরও দু-একজনের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছেন।’

জাপার কো-চেয়ারম্যানদের গতকালের সভায় সিদ্ধান্ত হয়েছে, আগামী ৮ অক্টোবর দলের সভাপতিমণ্ডলী (প্রেসিডিয়াম) ও সংসদীয় দলের যৌথ সভা হবে।

রওশনের নামে বিবৃতি

গত বুধবার বিভিন্ন গণমাধ্যমে রওশন এরশাদের নামে ‘জাপার অব্যাহতি, বহিষ্কার ও কমিটি থেকে বাদ দেওয়া সব নেতা-কর্মীকে দলে অন্তর্ভুক্তির আদেশ’ শীর্ষক একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তি পাঠানো হয়। বিজ্ঞপ্তিতে জাপার গঠনতন্ত্রের ২০ ধারার কয়েকটি উপধারাকে ‘গঠনতন্ত্রপরিপন্থী ও স্বেচ্ছাচারমূলক’ আখ্যা দিয়ে সেগুলো স্থগিত করতে জি এম কাদেরকে ‘নির্দেশ’ দেন রওশন।

জাপার সম্মেলন আহ্বান নিয়ে দলে বিতর্ক সৃষ্টির পর প্রায় প্রতিদিনই এ ধরনের বিজ্ঞপ্তি বা বিবৃতি আসছে রওশন এরশাদের নামে। জাপার একটি সূত্র বলছে, গত ৩০ আগস্ট গণমাধ্যমে বিজ্ঞপ্তি পাঠিয়ে সম্মেলন আহ্বানের পর থেকে গত বুধবার পর্যন্ত রওশনের নামে ২১টি বিজ্ঞপ্তি ও বিবৃতি বিভিন্ন গণমাধ্যমে পাঠানো হয়েছে। এসব বিবৃতি দলে আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি করছে।

বিষয়টি উল্লেখ করে জাপার মহাসচিব মুজিবুল হক বলেন, ‘গতকাল (বুধবার) বেগম রওশন এরশাদের যে চিঠি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে, সেই চিঠি আমরা আমলেই নিচ্ছি না।’

রওশন এরশাদ প্রায় এক বছর ধরে অসুস্থ। গত বছরের নভেম্বরে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁকে ব্যাংককে নেওয়া হয়। মাঝে এক সপ্তাহের জন্য তিনি দেশে এসেছিলেন। এখনো তিনি সেখানে চিকিৎসাধীন।

অসুস্থতার মধ্যেই গত ৩০ আগস্ট রওশন এরশাদ জাতীয় পার্টির দশম জাতীয় সম্মেলন আহ্বান করে গণমাধ্যমে বিজ্ঞপ্তি পাঠালে দলে বিতর্ক সৃষ্টি হয়। এর রেশ ধরে ৩১ আগস্ট তাঁকে বিরোধীদলীয় নেতার পদ থেকে সরিয়ে উপনেতা জি এম কাদেরকে স্থলাভিষিক্ত করার সিদ্ধান্ত নেয় জাপার সংসদীয় দল। এর ১৩ দিন পর রওশনকে সরানোর সিদ্ধান্তের প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তোলেন বিরোধীদলীয় চিফ হুইপের দায়িত্বে থাকা মসিউর রহমান। রওশনকে সরানোর জন্য তিনি জি এম কাদেরকে দোষারোপ করেন। এর রেশ ধরে মসিউরকেও দলের সব পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। এর পর থেকে মসিউর দলের গঠনতন্ত্রের ২০ ধারা নিয়ে সমালোচনামুখর হন।

বিকেলে ঢাকায় নিজ বাসভবনে মসিউর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, ‘গঠনতন্ত্রের ২০ ধারায় দলের প্রধানকে যে বিশেষ ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, তা অবৈধ। অবিলম্বে এ ধারা বাতিল করতে হবে। প্রয়োজনে এমপি পদও ছেড়ে দেব। তবু জি এম কাদের যত দিন থাকবেন, তত দিন দলে ফেরত যাব না।’

অবশ্য জাপার নেতারা দলের গঠনতন্ত্র ও ২০ ধারা নিয়ে মসিউরের বক্তব্যকে স্ববিরোধিতা বলে মনে করেন। কারণ, এইচ এম এরশাদ গঠনতন্ত্রের ২০ ধারা ব্যবহার করেই এ বি এম রুহুল আমিন হাওলাদারকে সরিয়ে মসিউর রহমানকে মহাসচিব করেছিলেন। তিনি গঠনতন্ত্রের ওই ধারার সুবিধাভোগী এবং তিনি তখন এই ধারার বিরোধিতা করেননি। এমনকি তিনি দলের তৎকালীন মহাসচিব হিসেবে ২০১৮ সালে জাপার সম্মেলনে গঠনতন্ত্র অনুমোদন প্রক্রিয়ায় যুক্ত ছিলেন।

দলের মহাসচিব মুজিবুল হক প্রথম আলোকে বলেন, সম্মেলনের পর মসিউর রহমান নিজেই তো স্বাক্ষর করে জাতীয় পার্টির গঠনতন্ত্র নির্বাচন কমিশনে জমা দি‌য়ে‌ছেন। এটি নির্বাচন কমিশনে আছে। এরপরও এখন তিনি যা বলছেন, তাতে তিনি নিজেই হাস্যকর হয়ে যাচ্ছেন।

যদিও মসিউর দাবির করছেন তাঁর স্বাক্ষর ছাড়াই গঠনতন্ত্র জমা দেওয়া হয়েছে। দলীয় সূত্র জানায়, সভাপতিমণ্ডলীর পদ থেকে অব্যাহতি পাওয়ার পর মসিউর রহমান জাপার শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে আপস করার চেষ্টা করেন। কিন্তু শীর্ষ নেতৃত্ব তা আমলে নেননি। এরপর মসিউর আরও সমালোচনামুখর হয়ে ওঠেন। গতকাল তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘জাতীয় পার্টি এরশাদ ও তাঁর স্ত্রী রওশন এরশা‌দের দল। পিতার মৃত্যুর পর সম্পত্তির ভাগ পায় স্ত্রী ও সন্তান। সুতরাং উনি (জি এম কাদের) ভাই হি‌সে‌বে দা‌বি কর‌তে পা‌রেন না জাতীয় পার্টি তাঁর দল। তাঁর এ ধরনের বক্তব্য ও কর্মকাণ্ডে দলের শীর্ষ নেতৃত্ব বিরক্ত।’

এ বিষয়ে জাপার এক কো–চেয়ারম্যান প্রথম আলোকে বলেন, তিনি যা করছেন, এ জন্য তাঁকে দলের প্রাথমিক সদস্যপদ থেকেও অব্যাহতি দেওয়া ছাড়া উপায় থাকবে না।

রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন