গৃহায়ণের বরাদ্দকৃত প্লটে মাঠ চান মেয়র ও বাসিন্দারা

মেয়রের উপস্থিতিতে এক্সকাভেটর ও পে-লোডার দিয়ে জায়গাটির আবর্জনা পরিষ্কার করা হয়ছবি: প্রথম আলো

জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের বরাদ্দকৃত প্লটকে খেলার মাঠের জায়গা দাবি করে  মাঠ পুনরুদ্ধারের দাবিতে মানববন্ধন ও অনশন কর্মসূচি পালিত হয়েছে। আজ বৃহস্পতিবার রাজধানীর মিরপুর-১১ নম্বর সেকশনের প্যারিস রোড এলাকায় ওই কর্মসূচি পালিত হয়।

ঢাকা উত্তর সিটির ৩ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর জহিরুল ইসলামের আহ্বানে স্থানীয় বাসিন্দারা এই কর্মসূচি পালন করেন। কর্মসূচিতে উপস্থিত হয়ে সংহতি জানান ঢাকা উত্তর সিটির (ডিএনসিসি) মেয়র আতিকুল ইসলাম।

জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ বলছে, খেলার মাঠ বলে যে জায়গার দাবি করা হচ্ছে, সেটা প্লটের জায়গা। সেখানে ৬৪ দশমিক ১৩ কাঠা জায়গায় পৌনে ২ কাঠা আয়তনের ৩২টি প্লট রয়েছে। এর মধ্যে ৮ কাঠা জায়গায় ৩০ ফুট প্রশস্ত ও ২০০ ফুটের রাস্তা রয়েছে। প্লটমালিকদের ইজারা দলিল ও জমি খারিজের কাজও সম্পন্ন হয়েছে। জায়গাটি কখনোই মাঠের জায়গা ছিল না।

স্থানীয় বাসিন্দারাও বলছেন, সেখানে অতীতে কখনো খেলাধুলার পরিবেশ ছিল না। ৮০-৯০-এর দশকে জায়গাটি জলাশয়ের মতো ছিল। পরে সেখানে বাঁশের মাচার ঘর বানিয়ে অবৈধ বস্তি গড়ে ওঠে। সেটি নিয়ন্ত্রণ করতেন ঢাকা মহানগর স্বেচ্ছাসেবক লীগের কার্যকরী সদস্য রফিকুল ইসলাম ওরফে কালা। জায়গাটি এখন কালার মোড় বা কালার বস্তি নামেই স্থানীয় ব্যক্তিদের কাছে পরিচিত।

আজকে গিয়ে দেখা যায়, মাঠের চারপাশে আবর্জনা ও ভাঙা ইট কংক্রিটের (রাবিশ) স্তূপ হয়ে আছে। কিছুদিন আগেও সেখানে অবৈধ দোকান, ইটের খোয়া ও বালু বিক্রির ভিট, রিকশা ও ভ্যানের গ্যারেজও ছিল। স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারা এসব পরিচালনা করতেন। খালি জায়গার দক্ষিণ-পূর্ব কোণে গৃহস্থালি থেকে সংগ্রহ করা ময়লা-আবর্জনার স্তূপ। আজ মেয়রের উপস্থিতিতে এক্সকাভেটর ও পে-লোডার নামিয়ে আবর্জনা পরিষ্কার করা হয়। পরে তিনি বাচ্চাদের নিয়ে সেখানে ফুটবল খেলেন।

মেয়র আতিকুল ইসলাম সেখানে বলেন, ‘জনগণের উন্মুক্ত জায়গা নেই। সবই দখল হচ্ছে। গৃহায়ণের মূল নকশাতেও এটি খেলার মাঠ। সরকার ড্যাপেও (ডিটেইল এরিয়া প্ল্যান) এটা উন্মুক্ত স্থান। উন্মুক্ত স্থানটি কে বা কারা, কাদের জোরে ভবন করবে, জনগণ এটা দেখতে চায়, আমিও দেখতে চাই।’

কাউন্সিলর মানিক (জহিরুল ইসলাম) তাঁকে বারবার সেখানে যাওয়ার অনুরোধ করেছেন জানিয়ে বলেন, আজকে আসার একমাত্র কারণ ভবিষ্যৎ গড়তে, সুষ্ঠু সমাজ ও শহর গড়তে খেলার মাঠের কোনো বিকল্প নেই।

জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের মিরপুর গৃহসংস্থান বিভাগ-২-এর নির্বাহী প্রকৌশলী কাওসার মোর্শেদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘মেয়র হয়তো জানেন না সেখানে প্লট বরাদ্দ হয়েছে। বরাদ্দ যেটা হয়েছে সেটা কি বাতিল করা সম্ভব? বিকল্প বরাদ্দের চিন্তা করলে তাহলে উনি (মেয়র) জায়গা দিক। সিটি করপোরেশন আমাদের জায়গা দিলে সেখানে বরাদ্দের ব্যবস্থা করে দেব।’

জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এডিবির সঙ্গে ঋণ চুক্তির আওতায় ১৯৯৫ সালে মিরপুরে ৬৪২টি পৌনে ২ কাঠার প্লট বরাদ্দের বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়। ৩২টি প্লট এরই অংশ। ১৯৯৬ সালের জানুয়ারিতে নকশাসহ প্লট বরাদ্দ দেওয়া হয়।

কর্মকর্তারা জানান, বরাদ্দের সময় সেখানে অবৈধ বস্তি ছিল। বস্তি উচ্ছেদে উচ্চ আদালত অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। তাই বাস্তব দখল বুঝিয়ে দেওয়া সম্ভব হয়নি। প্রায় ১৭ বছর পর ২০১৩ সালে নিষেধাজ্ঞাটি প্রত্যাহার হয়। আর ২০১৬ সালের মে মাসে বস্তি উচ্ছেদ করা হয়। তখন গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ প্লটের সীমানা চিহ্নিত করে বরাদ্দ পাওয়া মালিকদের দখল বুঝিয়ে দেন। ওই সময় সেখানে অবৈধ দখল ঠেকাতে চারপাশে সাত ফুট উঁচু সীমানা দেয়ালও নির্মাণ করা হয়েছিল।

জায়গাটির আবর্জনা পরিষ্কার শেষে মেয়র বাচ্চাদের সঙ্গে ফুটবল খেলেন
ছবি: প্রথম আলো

তবে এর কিছুদিন পরই আবার উচ্ছেদে অনিয়মের অভিযোগে সেখানে উভয় পক্ষের প্রবেশ নিষিদ্ধ করে উচ্চ আদালত আরেকটি স্থিতাবস্থা জারি করেন। প্লটমালিকেরা মামলা নিষ্পত্তির জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়লে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারা সীমানাপ্রাচীর ভেঙে অবৈধ দোকান বসিয়ে ভাড়া দেওয়া শুরু করেন। ২০১৭ সালের ২১ আগস্ট উচ্ছেদ কার্যক্রম বিধি মোতাবেক হয়েছে জানিয়ে চূড়ান্ত রায় দেন। এ রায়ের কপি নিয়ে প্লটমালিকেরা ভবন নির্মাণ করতে গেলে স্থানীয় সংসদ সদস্য ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লা ও স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর জহিরুল ইসলামের নাম ব্যবহার করে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারা তাতে বাধা দেন।

প্লটমালিকদের একজন আসলাম পারভেজ প্রথম আলোকে বলেন, সংসদ সদস্য ও ওয়ার্ড কাউন্সিলরের উদ্দেশ্য ছিল, ওই জায়গাটি মাঠের নামে বরাদ্দ নিয়ে চারপাশে দোকান ও মার্কেট নির্মাণ করে দখল করবেন। তখন তাঁদের বিশাল অঙ্কের বেনিফিট হবে। আসলামের প্লট নম্বর ১৪।

প্লট বরাদ্দ পাওয়া মালিকদের দাবি, ২০১৬ সালে বস্তি উচ্ছেদের সময় ওয়ার্ড কাউন্সিলর জহিরুল ইসলাম টাকা নিয়ে প্লটের সীমানা নির্ধারণ ও দেয়াল নির্মাণে সহায়তা করেছেন। এখন আবার অসৎ কোনো উদ্দেশ্য নিয়ে মাঠের নামে জায়গাটি দখল করতে চাচ্ছেন। কাউন্সিলরের এই ফাঁদে পা দিয়েছেন মেয়রও।

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে ওয়ার্ড কাউন্সিলর জহিরুল ইসলামের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।

আর মেয়র আতিকুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি বুঝি ওই ওয়ার্ডে খেলার কোনো জায়গা নেই। সেখানে প্রচুর মানুষ দেখেছি। সবার দাবি একটাই, মাঠ চাই। তাদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সেখানে গিয়েছি, বলেছি এখানে খেলাধুলা হবে। গৃহায়ণের অন্য জায়গায় প্লটের জায়গা রয়েছে। সেখানে বরাদ্দ দিক।’

‘ওয়ার্ড কাউন্সিলর কিংবা সংসদ সদস্যের অন্য কোনো অভিসন্ধি আমার জানা নেই’ উল্লেখ করে মেয়র আরও বলেন, ওয়ার্ড কাউন্সিলর কিংবা সংসদ সদস্য ওরা নিজের জন্য সেখানে কিছু করতে পারবে না। ড্যাপও ২০৩৫ সাল পর্যন্ত সেখানে কোনো ভবন নির্মাণের অনুমতি দেবে না।