গত সাড়ে পাঁচ বছর হামের বিশেষ টিকা কর্মসূচি হয়নি: সংসদে স্বাস্থ্যমন্ত্রী
গত সাড়ে পাঁচ বছর হাম-রুবেলার বিশেষ টিকা দেওয়ার কর্মসূচি হয়নি বলে জাতীয় সংসদকে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন। ফলে নবজাতকসহ যারা হামের টিকা আওতার বাইরে থেকে যায়, তারাই এখন হামে আক্রান্ত হচ্ছে।
আজ সোমবার জাতীয় সংসদের অধিবেশনে দেশে হামের প্রাদুর্ভাব রোধে জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ নিয়ে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সংসদ সদস্য আখতার হোসেনের নোটিশের জবাবে মন্ত্রী এ কথা জানান।
গত ২৯ মার্চ সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানিয়েছিলেন, গত ৮ বছর দেশে হামের টিকা দেওয়া হয়নি। আজ মন্ত্রী সংসদকে জানান, ২০২০ সালের ডিসেম্বরের পর দীর্ঘ সাড়ে পাঁচ বছর যাবৎ বিশেষ টিকা কর্মসূচি হয়নি। চার বছর পর এই কর্মসূচি হওয়ার কথা। তিনি দাবি করেন, ফ্যাসিস্ট সরকার ও অন্তর্বর্তী সরকারের ব্যর্থতার কারণে বর্তমানে দেশে হামের প্রাদুর্ভাব বেড়েছে।
নোটিশে আখতার হোসেন বলেন, গত তিন সপ্তাহে সন্দেহজনক হামে মৃত্যুর সংখ্যা ১১৫-এর বেশি, নিশ্চিত মৃত্যু ২০ জন। হাজার হাজার শিশু হামে আক্রান্ত হচ্ছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেছেন, ‘গত ৮ বছর হামের টিকা দেওয়া হয়নি। এটা সঠিক তথ্য কি না, সেটা নিয়ে হামের টিকা প্রদানকারী মাঠপর্যায়ের কর্মীদের উৎকণ্ঠা বা ভিন্নমত খেয়াল করছি। সে ক্ষেত্রে কেন হামের টিকা দেওয়া হয়নি, তা আমাদের অবাক করে। আমরা জানি, হামের চিকিৎসার জন্য আইসোলেশন প্রয়োজন। কিন্তু আমাদের হাসপাতালগুলোতে আইসোলেশন একেবারেই নেই। জেলা-উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালসহ বড় বড় হাসপাতালেও নেই। বিশেষ করে রাজশাহী অঞ্চলের কথা বেশি সামনে এসেছে। হাসপাতালে আইসিইউ ও এনআইসিইউ নেই।’
আখতার হোসেন বলেন, ‘আমাদের দেশে হামের টিকা দেওয়া হয় ৯ মাস থেকে। কিন্তু এখন ৬ মাস বয়সীরা আক্রান্ত হচ্ছে। আমাদের রোগতত্ত্ববিশারদেরা কী কারণে এটা চিহ্নিত করতে পারলেন না, সেটা নিয়ে তদন্ত করা উচিত।’ হাম মোকাবিলায় সরকারের উদ্যোগের কথা জানতে চান তিনি।
জবাবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘অতীতের সরকারগুলোর সম্পূর্ণ ভুল ব্যবস্থাপনা ও ব্যর্থতার কারণে...সরকারগুলো বলতে ফ্যাসিস্ট সরকার এবং সর্বশেষ অন্তর্বর্তী সরকারকে ইঙ্গিত করতেছি। তাদের ভুল ব্যবস্থাপনার কারণে হামের প্রাদুর্ভাব বেড়েছে। হাম- রুবেলার বিশেষ টিকা দেওয়ার কর্মসূচি সর্বশেষ ২০২০ সালের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত হওয়ার পর দীর্ঘ সাড়ে পাঁচ বছর যাবৎ হয়নি; যা চার বছর পর পর হওয়ার কথা। ফলে নতুন জন্ম নেওয়া শিশুসহ অন্যরা হামের টিকার আওতার বাইরে থেকে যায়, যারা এখন হামে আক্রান্ত হচ্ছে। টিকা কেনা ও সংগ্রহে পূর্ববর্তী সরকারের অদূরদর্শী সিদ্ধান্তের কারণে টিকার মজুতে সংকট দেখা দিয়েছে। এতে হামের টিকাসহ আরও ছয় ধরনের টিকার অভাব দেখা দেয়। যার কারণে সংকট তৈরি হয়েছে।
৩ মে থেকে সারা দেশে অবশিষ্ট এলাকায় টিকা কর্মসূচি
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশনায় ৫ এপ্রিল থেকে ১৮টি জেলার ৩০টি ঝুঁকিপূর্ণ উপজেলায় জরুরি টিকাদান শুরু হয়েছে। ৬ মাস থেকে ৫ বছরের কম বয়সী সব শিশুকে এই টিকা দেওয়া হচ্ছে। প্রথম ধাপে ১২ লাখ শিশুকে টিকার আওতায় আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রথম দিনেই ৩০টি উপজেলায় ৭৬ হাজার লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ৭৩ হাজার শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছে (সাফল্য ৯৬%)। এ ছাড়া ১২ এপ্রিল থেকে ঢাকা, ময়মনসিংহ ও বরিশাল সিটি করপোরেশন এবং ৩ মে থেকে সারা দেশে অবশিষ্ট এলাকায় কর্মসূচি শুরু হবে। একই সঙ্গে রোববার থেকে দেশে ভিটামিন এ ক্যাপসুল খাওয়ানো হচ্ছে।
হাসপাতালে সুযোগ-সুবিধা নিয়ে মন্ত্রী জানান, দেশের সব সরকারি হাসপাতালে আইসোলেশন ওয়ার্ডের ব্যবস্থা করা হয়েছে। বিশেষ করে রাজশাহীতে আরও ২৫০টি আইসোলেশন বেড প্রস্তুত করা হচ্ছে। আইসিইউ ও ভেন্টিলেটর প্রস্তুতির পাশাপাশি আইসিডিডিআরবির মাধ্যমে মাত্র ৩০০ টাকা ব্যয়ে উদ্ভাবিত নতুন অক্সিজেন প্রবাহ সিস্টেম ব্যবহার করে ফুসফুসে অক্সিজেন দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
জরুরি ভিত্তিতে টিকা কেনা হচ্ছে বলে জানিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, হাম মোকাবিলায় বিশ্বব্যাংক সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে। এ খাতে ঋণ ও অনুদান পাওয়ার আশা করেন মন্ত্রী।
স্বাস্থ্যমন্ত্রীর বক্তব্যের পর সম্পূরক প্রশ্নে সংসদ সদস্য আখতার হোসেন মাঠপর্যায়ের অব্যবস্থাপনার অভিযোগ তুলে বলেন, কাগজে-কলমে বরাদ্দ থাকলেও সাধারণ মানুষ হাসপাতালে আইসোলেশন বা আইসিইউ–সুবিধা পাচ্ছে না। এ ছাড়া স্বাস্থ্য খাতের বাজেটের প্রায় ২৫ শতাংশ অব্যয়িত থেকে যায়। ২০২৪-২৫ অর্থবছরেও ১১ হাজার কোটি টাকা খরচ করা সম্ভব হয়নি।
জবাবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, করোনাকালীন সময়ের অব্যয়িত ৬০৪ কোটি টাকা দিয়ে ইউনিসেফ থেকে অতিরিক্ত হামের টিকা সংগ্রহ করা হচ্ছে। ভবিষ্যতে যাতে টিকার কোনো ঘাটতি না হয়, সে বিষয়ে মন্ত্রণালয় সতর্ক রয়েছে। মাঠপর্যায়ের তদারকি বাড়াতে স্বাস্থ্যকর্মীদের সব ছুটি বাতিল করা হয়েছে এবং উন্নয়ন সহযোগীদের (বিশ্বব্যাংক, ইউনিসেফ) সঙ্গে সমন্বয় জোরদার করা হয়েছে।