গাজী নজরুল সংসদ সদস্য থাকবেন কি না, সিদ্ধান্ত স্পিকার–ইসির

গাজী নজরুল ইসলাম

সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে জাতীয় সংসদের স্পিকার ও প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে (সিইসি) চিঠি দিয়েছে জামায়াতে ইসলামী। জামায়াতের নেতারা বলছেন, নৈতিক স্খলনের অভিযোগে দল থেকে বহিষ্কৃত গাজী নজরুলের সংসদ সদস্য পদ থাকবে কি না, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার স্পিকার ও নির্বাচন কমিশনের (ইসি)।

গতকাল বৃহস্পতিবার স্পিকার ও সিইসিকে পাঠানো পৃথক চিঠিতে জামায়াত বলেছে, গাজী নজরুল ইসলামকে নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে খবর প্রকাশের পর দলের পক্ষ থেকে তদন্ত করা হয়। এতে গাজী নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধে নৈতিক স্খলনের অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। এ কারণে দলের গঠনতন্ত্রের ৬২ নম্বর ধারা অনুযায়ী তাঁকে বহিষ্কার করা হয়েছে।

নৈতিক স্খলনের দায় নিয়ে পদত্যাগ করবেন কি না—এই বিষয়ে জানার জন্য চেষ্টা করেও গাজী নজরুল ইসলামের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। আরেকটি পথ হচ্ছে জামায়াতের পক্ষ থেকে তাঁকে পদত্যাগের অনুরোধ জানানো। তবে জামায়াতের দলীয় সূত্র জানিয়েছে, দলটির পক্ষ থেকে গাজী নজরুল ইসলামকে পদত্যাগ করতে অনুরোধ জানানো হয়নি।

জামায়াতে ইসলামী থেকে বহিষ্কারের ফলে সরাসরি গাজী নজরুল ইসলামের সংসদ সদস্য পদ বাতিল হচ্ছে না। প্রথমে স্পিকার আইনি দিক বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত দেবেন। স্পিকার সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে না পারলে বিষয়টি ইসিতেও পাঠাতে পারেন। তবে সংবিধান অনুসারে, গাজী নজরুল ইসলাম নিজে পদত্যাগ করলে সংসদ সদস্য পদ শূন্য হয়ে যাবে।

নৈতিক স্খলনের দায় নিয়ে পদত্যাগ করবেন কি না—এই বিষয়ে জানার জন্য চেষ্টা করেও গাজী নজরুল ইসলামের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। আরেকটি পথ হচ্ছে জামায়াতের পক্ষ থেকে তাঁকে পদত্যাগের অনুরোধ জানানো। তবে জামায়াতের দলীয় সূত্র জানিয়েছে, দলটির পক্ষ থেকে গাজী নজরুল ইসলামকে পদত্যাগ করতে অনুরোধ জানানো হয়নি।

সম্প্রতি গাজী নজরুলের ব্যক্তিগত মুহূর্তের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এতে এক তরুণীর সঙ্গে তাঁকে দেখা যায়। জামায়াতের পক্ষ থেকে দুই সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।

জানতে চাইলে জামায়াতের প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের সেক্রেটারি এহসানুল মাহবুব জুবায়ের গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, গাজী নজরুল ইসলামকে দল থেকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত স্পিকার ও সিইসিকে জানানো হয়েছে। এখন এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া তাঁদের এখতিয়ার।

সম্প্রতি গাজী নজরুলের ব্যক্তিগত মুহূর্তের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এতে এক তরুণীর সঙ্গে তাঁকে দেখা যায়। জামায়াতের পক্ষ থেকে দুই সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।

তদন্ত কমিটি তাদের প্রতিবেদনে গাজী নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধে ‘পর্দা লঙ্ঘন’-এর প্রমাণ পায়; যা দলের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। বিষয়টি নিয়ে দলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদে আলোচনার পর গত বুধবার গাজী নজরুল ইসলামকে দল থেকে বহিষ্কার করে জামায়াত। দলের আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমানের সভাপতিত্বে কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের জরুরি বৈঠকে সর্বসম্মতিক্রমে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

আরও পড়ুন

জামায়াত সূত্র জানায়, নির্বাহী পরিষদের বৈঠক শেষে ওই দিনই চিঠি পাঠানোর বিষয়টি বিবেচনায় ছিল। তবে দলীয় বৈঠকের পর ইসিতে চিঠি পাঠানোর সময় ছিল না। এ ছাড়া বিগত সময়ে বিএনপি এবং আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দুটি ঘটনায় স্পিকারকে আগে চিঠি দেওয়া হয়েছিল। তাই আগে স্পিকারকে চিঠি দেওয়া হবে নাকি সিইসি তা নিয়ে পর্যালোচনা করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে, সে ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিয়েছে দলটি। এরপর বৃহস্পতিবার সিইসি ও স্পিকার দুজনকেই চিঠি দেওয়া হয়।

তবে সংবিধান ও সংসদ সদস্য বিরোধ নিষ্পত্তি আইন অনুযায়ী, সংসদ সদস্য পদ থাকবে কি না—এ প্রশ্নে কোনো বিতর্ক দেখা দিলে স্পিকার সেটা প্রধান নির্বাচন কমিশনারের কাছে পাঠাবেন। তখন ইসি শুনানির মাধ্যমে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেবে।

পরবর্তী করণীয় কী

জামায়াতের পক্ষ থেকে স্পিকার ও সিইসিকে চিঠি দেওয়ার পর গাজী নজরুল ইসলামের সংসদ সদস্য পদ বহাল থাকবে কি না, তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।

ইসি ও সংসদ সচিবালয় সূত্র জানিয়েছে, জামায়াতের চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে শুরুতে নির্বাচন কমিশনের করণীয় কিছু নেই। সংসদের আসন শূন্য ঘোষণা করে সংসদ সচিবালয়। গাজী নজরুল ইসলামের সংসদ সদস্য পদ থাকবে কি না, এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেওয়ার প্রাথমিক এখতিয়ার সংসদের স্পিকারের। তবে সংবিধান ও সংসদ সদস্য বিরোধ নিষ্পত্তি আইন অনুযায়ী, সংসদ সদস্য পদ থাকবে কি না—এ প্রশ্নে কোনো বিতর্ক দেখা দিলে স্পিকার সেটা প্রধান নির্বাচন কমিশনারের কাছে পাঠাবেন। তখন ইসি শুনানির মাধ্যমে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেবে।

আরও পড়ুন

সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে বলা আছে, কোনো রাজনৈতিক দলের প্রার্থী হিসেবে মনোনীত হয়ে কোনো ব্যক্তি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে তিনি যদি ওই দল থেকে পদত্যাগ করেন অথবা সংসদে ওই দলের বিপক্ষে ভোট দেন, তাহলে সংসদে তাঁর আসন শূন্য হবে। দলের বিরুদ্ধে ভোট দিলে কিংবা দল ছাড়লে সংসদ সদস্য পদ থাকবে না, তা সংবিধানে স্পষ্ট বলা আছে। কিন্তু কোনো ব্যক্তি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর যদি দল তাঁকে বহিষ্কার করে, সে ক্ষেত্রে কী হবে—তা সংবিধানে স্পষ্ট করে উল্লেখ নেই।

শুধু দলের বহিষ্কারের চিঠি দিয়ে সংসদ সদস্য পদ থাকা না-থাকার আলোচনা একটা বিতর্কিত বিষয়। সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের পদ নিয়ে স্পিকার বা জাতীয় সংসদের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক রেফারেন্স বা চিঠি পেলে আইন ও সংবিধান পর্যালোচনা করে ব্যবস্থা নেবে নির্বাচন কমিশন।
নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমান মাছউদ

সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, গাজী নজরুল ইসলামের সংসদ সদস্য পদ শূন্য হবে কি না, তা নিয়ে বিতর্ক আছে। ফলে স্পিকার সিইসির কাছে পাঠাতে পারেন।

এ বিষয়ে গতকাল নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমান মাছউদ সাংবাদিকদের বলেন, শুধু দলের বহিষ্কারের চিঠি দিয়ে সংসদ সদস্য পদ থাকা না-থাকার আলোচনা একটা বিতর্কিত বিষয়। সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের পদ নিয়ে স্পিকার বা জাতীয় সংসদের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক রেফারেন্স বা চিঠি পেলে আইন ও সংবিধান পর্যালোচনা করে ব্যবস্থা নেবে নির্বাচন কমিশন।

আরও পড়ুন

পদত্যাগ করতে বলবে না দল

গাজী নজরুল ইসলামের বিষয়ে দলীয় তদন্ত, এরপর দল থেকে বহিষ্কার, সিইসি ও স্পিকারকে চিঠি দেওয়া—এখানেই নিজেদের দায়িত্ব শেষ দেখছে জামায়াতে ইসলামী। দলটির একাধিক কেন্দ্রীয় নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, দল থেকে বহিষ্কারের পর গাজী নজরুল ইসলাম আর জামায়াতের সদস্য নন। তাই তাঁকে পদত্যাগ করতে বলার প্রশ্নও আসে না। জামায়াত তাঁর দায়ও নেবে না। এখন তিনি সংসদ সদস্য পদ থেকে পদত্যাগ করবেন কি না, সেটি তাঁর ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত।

গতকাল একাধিকবার ফোন করলে গাজী নজরুল ইসলামের মুঠোফোন নম্বরটি বন্ধ পাওয়া গেছে। হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগের চেষ্টা করলেও সাড়া পাওয়া যায়নি।

এই বিষয়ে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ প্রথম আলোকে বলেন, একজন সংসদ সদস্যকে নৈতিক স্খলনের কারণে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। নির্বাচন কমিশন ও স্পিকারকে বিষয়টি জানানো হয়েছে। এখন তাঁরা কী ব্যবস্থা নেবেন, সেটি তাঁদের এখতিয়ার। জামায়াত শুধু তার নৈতিক দায়িত্ব পালন করেছে।

গাজী নজরুল ইসলামের সংসদ সদস্য পদ নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের পর কেন্দ্রীয় জামায়াতের নির্দেশনা অনুযায়ী পরবর্তী নির্বাচনী তৎপরতা শুরু হবে।
সাতক্ষীরা জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি মাওলানা আজিজুর রহমান

বিকল্প প্রার্থী নিয়ে জামায়াতের ভাবনা

সাতক্ষীরা-৪ আসন শূন্য হলে উপনির্বাচনের জন্য বিকল্প প্রার্থী খোঁজা শুরু করবে জামায়াত। জামায়াতের দলীয় সূত্র বলছে, প্রার্থী নির্বাচনের ক্ষেত্রে প্রথমে সংশ্লিষ্ট আসনের রুকনদের (শপথধারী কর্মী) মতামত নেওয়া হবে। পাশাপাশি মহিলা বিভাগ, যুব বিভাগসহ অন্যদেরও পরামর্শ নেওয়া হবে। এ ছাড়া ওই আসনের ভোটার, তবে বর্তমানে অন্য এলাকায় থাকেন, তাঁদেরও মতামত নেওয়া হবে। তারপর কেন্দ্রে তিন সদস্যের প্যানেল পাঠানো হবে। সেখান থেকে কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ একজনকে প্রার্থী হিসেবে চূড়ান্ত করবে।

এই বিষয়ে সাতক্ষীরা জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি মাওলানা আজিজুর রহমান গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, গাজী নজরুল ইসলামের সংসদ সদস্য পদ নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের পর কেন্দ্রীয় জামায়াতের নির্দেশনা অনুযায়ী পরবর্তী নির্বাচনী তৎপরতা শুরু হবে।