তারেক রহমানের হাত ধরে বাংলাদেশের নতুন পথচলা শুরু

বাংলাদেশের নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গতকাল মঙ্গলবার জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায়ছবি: রয়টার্স

বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক নতুন অধ্যায় শুরু হলো। দেশের নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে যাত্রা শুরু করেছেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। এর মাধ্যমে প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের পরিবারের তৃতীয় প্রজন্মের হাতে রাষ্ট্রক্ষমতা ন্যস্ত করল জাতি, যা বাংলাদেশে আগে ঘটেনি। তারেক রহমানের নেতৃত্বে নবগঠিত ৫০ সদস্যের মন্ত্রিসভার হাত ধরে আগামীর বাংলাদেশের নতুন পথচলা শুরু হলো।

গতকাল মঙ্গলবার জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন তারেক রহমান। এরপর মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের শপথের মাধ্যমে নতুন সরকারের যাত্রা শুরু হয়। তারেক রহমান দীর্ঘদিন রাজনীতিতে যুক্ত থাকলেও অতীতে সংসদ নির্বাচনে অংশ নেননি। এবার ঢাকায় ও পিতৃভূমি বগুড়ায় দুটি আসনে নির্বাচনে জয়ী হয়েছেন।

১৯৯১ সালের পর প্রথম কোনো পুরুষ প্রধানমন্ত্রী পেয়েছে দেশ। এর আগে বিএনপির প্রয়াত চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া এবং আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনা প্রায় তিন যুগ দেশের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে। শেখ হাসিনা পালিয়ে যান ভারতে। দেড় বছরের অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনের পর তারেক রহমানের হাত ধরে শুরু হলো নির্বাচিত সরকারের পথচলা।

আরও পড়ুন
গতকাল মঙ্গলবার জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন তারেক রহমান। তাঁকে শপথ পড়ান রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন
ছবি: রয়টার্স

গত ৩০ ডিসেম্বর বিএনপির সাবেক চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া মারা যান। মায়ের মৃত্যুর পর গত ৯ জানুয়ারি তারেক রহমান বিএনপির চেয়ারম্যান হন। অভিষিক্ত হয়ে তাঁর নেতৃত্বেই দলের নির্বাচনী প্রচার ও সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালিত হয়। বিএনপিও তাঁকে একক নেতা হিসেবে উপস্থাপন করেছে। নির্বাচনী প্রচারের সময়ই তাঁকে বাংলাদেশের সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী হিসেবে উপস্থাপন করে দেশ-বিদেশের গণমাধ্যম ও বিএনপির নেতা-কর্মীরা। ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে তাঁর নেতৃত্বে দলটি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়। দীর্ঘ দুই দশক পর সরকারে ফেরে বিএনপি।

এর আগে গত ২৫ ডিসেম্বর দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসিত জীবনের ইতি টেনে যুক্তরাজ্যের লন্ডন থেকে দেশের মাটিতে ফেরেন তারেক রহমান। বিপুল মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত হন তিনি।

লন্ডনে থাকা অবস্থায় ২০০৯ সালে দলের কাউন্সিলে বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন তারেক রহমান। এরপর ধীরে ধীরে বিএনপির পুনর্গঠনে যুক্ত হন। ২০১৮ সালে খালেদা জিয়া কারাগারে বন্দী হন। তখন তারেক রহমান দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন মনোনীত হন। খালেদা জিয়ার অবর্তমানে তিনিই দলকে শেখ হাসিনার নিপীড়নমূলক শাসনের বিরুদ্ধে এবং ভোটাধিকার অর্জনের আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন।
আরও পড়ুন

তৃণমূল থেকে সর্বোচ্চ শিখরে

অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরের শাসনের পর তারেক রহমানের হাত ধরে শুরু হলো নির্বাচিত সরকারের পথচলা।গতকাল মঙ্গলবার জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায়
ছবি: এএফপি

১৯৬৫ সালের ২০ নভেম্বর জন্ম নেন তারেক রহমান। বিএনপির দলীয় ওয়েবসাইটে দেওয়া তারেক রহমানের জীবনীতে বলা হয়, স্বৈরশাসক এইচ এম এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় তারেক রহমান তাঁর মা খালেদা জিয়ার সঙ্গে রাজপথে আন্দোলনে যোগ দেন। তিনি ১৯৮৮ সালে বগুড়ার গাবতলী উপজেলা ইউনিটে সাধারণ সদস্য হিসেবে বিএনপিতে যোগদান করেন। তৃণমূল থেকে জনগণকে সংগঠিত করেছিলেন এবং এইচ এম এরশাদের সরকারের পতনে অবদান রেখেছিলেন তারেক রহমান। ১৯৯১ সালের নির্বাচনের আগে তিনি তাঁর মা খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেশের প্রায় প্রতিটি জেলায় প্রচারণা চালিয়ে নির্বাচনে বিজয় অর্জন করেন। খালেদা জিয়া হন দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী।

২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের সময় তিনি দলকে সংগঠিত করতে ইউনিয়ন পর্যায়ে দলের সম্মেলন করে আলোচনায় আসেন তারেক রহমান। সাংগঠনিক প্রচেষ্টার স্বীকৃতি হিসেবে ২০০২ সালে স্থায়ী কমিটি তাঁকে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক পদে মনোনীত করে।

বাংলাদেশে ২০০৭ সালে সেনা–সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে দুর্নীতির অভিযোগে আটক হয়েছিলেন তারেক রহমান। সরকারটি এক–এগারোর সরকার নামে পরিচিত। এরপর ১৮ মাস কারাগারে থাকার পর ২০০৮ সালের সেপ্টেম্বরে মুক্তি পেয়ে সপরিবার লন্ডনে চলে যান তিনি।

লন্ডনে থাকা অবস্থায় ২০০৯ সালে দলের কাউন্সিলে বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন তারেক রহমান। এরপর ধীরে ধীরে বিএনপির পুনর্গঠনে যুক্ত হন। ২০১৮ সালে খালেদা জিয়া কারাগারে বন্দী হন। তখন তারেক রহমান দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন মনোনীত হন। খালেদা জিয়ার অবর্তমানে তিনিই দলকে শেখ হাসিনার নিপীড়নমূলক শাসনের বিরুদ্ধে এবং ভোটাধিকার অর্জনের আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন।

আরও পড়ুন

বাংলাদেশে জিয়া পরিবার

জিয়াউর রহমান, খালেদা জিয়া ও তারেক রহমান
ছবি: কোলাজ

১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর সিপাহি জনতার বিপ্লবের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে অধিষ্ঠিত হন বীর মুক্তিযোদ্ধা প্রয়াত জিয়াউর রহমান। সেনাপ্রধান হন তিনি। এরপর প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক করা হয় তাঁকে। বিএনপির ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল তৎকালীন রাষ্ট্রপতি এ এস এম সায়েম পদত্যাগ করলে জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হন।

১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর জিয়াউর রহমান নিজে চেয়ারম্যান হিসেবে থেকে নতুন রাজনৈতিক দল বিএনপি গঠন করেন। ১৯৯১ সালের পর থেকে জিয়ার প্রতিষ্ঠিত এই দলটি চারবার রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন হলো।

১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে সেনাবাহিনীর কিছু বিপথগামী সদস্যের হাতে জিয়াউর রহমান নিহত হন। তখন খালেদা জিয়া ছিলেন পুরোদস্তুর গৃহিণী। স্বামীহারা খালেদা দলের হাল ধরেন। যুক্ত হন স্বৈরাচার এরশাদবিরোধী গণতান্ত্রিক আন্দোলনে।

আরও পড়ুন

বিশ্বে অল্প কয়েকটি রাজনৈতিক পরিবার আছে, যাদের তিন সদস্য কোনো দেশের রাষ্ট্র কিংবা সরকারপ্রধানের গুরুদায়িত্ব সামলেছেন। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী পদে তারেক রহমানের শপথের মধ্য দিয়ে এই পরিবারগুলোর তালিকায় নাম লেখাল জিয়া পরিবারও। বাবা জিয়াউর রহমান ও মা খালেদা জিয়ার পর এবার বাংলাদেশ পরিচালনার ভার নিলেন ছেলে তারেক রহমান।

প্রয়াত জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার আরেক ছেলে ছিলেন আরাফাত রহমান কোকো। তারেক রহমানের এই ছোট ভাই ২০১৫ সালের ২৪ জানুয়ারি মাত্র ৪৪ বছর বয়সে হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সহধর্মিণী জুবাইদা রহমান। তিনি পেশায় চিকিৎসক। এই দম্পতির একমাত্র সন্তান ব্যারিস্টার জাইমা রহমান।

আরও পড়ুন