বিএনপির পরবর্তী বিভাগীয় গণসমাবেশ বরিশালে—৫ নভেম্বর। খুলনা ও রংপুরের মতো ইতিমধ্যে বরিশাল পরিবহন মালিক সমিতি ওই দিন ধর্মঘট ডেকেছে। স্থানীয় আওয়ামী লীগও বিএনপির সমাবেশের দিন মাঠে থাকার ঘোষণা দিয়েছে। গত সোমবার রাতে বরিশাল নগরের ৩০টি ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা একযোগে মিছিল-সমাবেশ করার পর উত্তেজনা ছড়ানোর আভাস পাওয়া যাচ্ছে।

বরিশালের পর ১২ নভেম্বর ফরিদপুর, ১৯ নভেম্বর সিলেট এবং ৩ ডিসেম্বর রাজশাহীতে গণসমাবেশ। তারপর ১০ ডিসেম্বর ঢাকায় মহাসমাবেশ করবে বিএনপি।

আওয়ামী লীগ সূত্র জানায়, বিএনপির ঢাকার সমাবেশ ঘিরে আওয়ামী লীগের ব্যাপক প্রস্তুতি থাকবে। ওই দিন আওয়ামী লীগের ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সম্মেলন আয়োজনের প্রস্তাব দিয়েছে সংগঠনটি। দলীয় প্রধান শেখ হাসিনা ছাত্রলীগের সম্মেলনে উপস্থিত থাকেন। তবে এখনো তারিখ নিশ্চিত করা হয়নি। তবে দলীয় সূত্র জানায়, বিএনপির কর্মসূচির দিন ঢাকায় সহযোগী সংগঠনের সম্মেলন না থাকলেও মহানগর আওয়ামী লীগ বিজয় দিবসের কোনো না কোনো কর্মসূচি পালন করবে। অর্থাৎ ওই দিন বিএনপিকে চাপে রাখার সব ধরনের কৌশল প্রয়োগ করবে আওয়ামী লীগ।

এর বাইরে মহিলা আওয়ামী লীগ, যুব মহিলা লীগ, আওয়ামী আইনজীবী পরিষদ ও স্বাধীনতা চিকিৎসক ফোরামের (স্বাচিপ) জাতীয় সম্মেলন আগামী ২৪ ডিসেম্বরের মধ্যে হবে। প্রতিটিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উপস্থিত থাকবেন এবং সব কটি ঢাকায় হবে। এ ছাড়া ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণের সম্মেলনও ডিসেম্বরে হবে।

আওয়ামী লীগের মাঠ পর্যায়ে এবং সহযোগী সংগঠনগুলোর কর্মসূচি নিয়ে কাজ করেন আওয়ামী লীগের এমন একজন নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, বিএনপি বড় জমায়েতের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের মনোবলে চিড় ধরানোর কৌশল নিয়েছে। একই সঙ্গে আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তা হ্রাস পেয়েছে বলে দেশে-বিদেশে প্রমাণ করতে চাইছে। এ জন্য আওয়ামী লীগও রাজপথে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

তবে আওয়ামী লীগ বিএনপির পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি পালন করতে যাচ্ছে, এ কথা মানতে রাজি নন আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য কাজী জাফর উল্যাহ। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, আওয়ামী লীগ নিজেদের দল গোছানোর কাজে আছে। আর তা শুরু হয়েছে বেশ আগেই। বিএনপি তাদের কর্মসূচি পালন করবে। আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক দল হিসেবে তারাও রাজপথে থাকবে—এটাই স্বাভাবিক।

প্রচার ভাগাভাগির কৌশল

আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী সূত্র বলছে, চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ ও খুলনায় বিএনপির গণসমাবেশের দিন আওয়ামী লীগের তেমন বড় কোনো কর্মসূচি ছিল না। ফলে গণমাধ্যমে বিএনপির এসব কর্মসূচি ব্যাপক প্রচার পেয়েছে। কিন্তু গত শনিবার বিএনপির রংপুরের সমাবেশের দিন ঢাকা জেলা আওয়ামী লীগেরও সম্মেলন হওয়ায় দুই দলের কর্মসূচিই সমান গুরুত্ব পেয়েছে গণমাধ্যমে। এ বিবেচনা থেকে বিএনপির বাকি পাঁচটি গণসমাবেশের দিন আওয়ামী লীগের জেলা কিংবা সহযোগী সংগঠনের সম্মেলন করার কথা ভাবা হচ্ছে। সব কর্মসূচিতেই কেন্দ্রীয় নেতাদের উপস্থিতি নিশ্চিত করা হবে। যাতে কর্মসূচি ভালোভাবে গুরুত্ব পায়।

আওয়ামী লীগের জেলা পদমর্যাদার কমিটি আছে ৭৮টি। এ পর্যন্ত ৪৮টির সম্মেলন সম্পন্ন হয়েছে। বাকি ৩০টি জাতীয় সম্মেলনের আগে সম্পন্ন করার কথা। এর বাইরে আছে উপজেলা সম্মেলন। বিএনপির সাম্প্রতিক সমাবেশগুলোতে বড় জমায়েত দেখাচ্ছে। আওয়ামী লীগও জেলা সম্মেলন ও দলের সভাপতি শেখ হাসিনার জেলা সমাবেশগুলোতে বড় জমায়েত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

আওয়ামী লীগের একজন কেন্দ্রীয় নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, বিএনপির বিভাগীয় সমাবেশ একেবারে পণ্ড করার পরিকল্পনা আওয়ামী লীগের নেই। তবে যাতে বড় জমায়েত না করতে পারে, সে জন্য নানা চাপ অব্যাহত রাখা হবে। পাশাপাশি ওই দিন যতটা সম্ভব গণমাধ্যমে আওয়ামী লীগের উপস্থিতি নিশ্চিত করার লক্ষ্য আছে। তবে এর বাইরে স্থানীয়ভাবে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা বিএনপির সমাবেশে কিছুটা প্রতিরোধ গড়তে পারেন।

ডিসেম্বরের পর নতুন চিন্তা

আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী সূত্র জানায়, ডিসেম্বরের পর কিছুটা পরিষ্কার হবে বিএনপি নির্বাচনে অংশ নেওয়ার জন্য মাঠে নেমেছে, নাকি রাজপথ দখলে নিয়ে সরকারের পতনের স্বপ্ন দেখছে। যদি সরকার পতনের লক্ষ্য নিয়ে বিএনপি এগোতে চায়, তাহলে তাদের আওয়ামী লীগ ও সরকার যৌথভাবে কোণঠাসা করার কৌশল নেবে।

এর আগে আওয়ামী লীগকে গোছানো ও প্রশাসন প্রস্তুত করার কাজ সম্পন্ন করবে। এ ছাড়া ১০ ডিসেম্বরের সমাবেশ থেকে বিএনপি পরবর্তী কী কর্মসূচি ঘোষণা করে, সেটা দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে ভবিষ্যতে তাদের কর্মসূচি পালন করতে দেওয়া হবে কি না।

আওয়ামী লীগের একজন কেন্দ্রীয় নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ২৪ ডিসেম্বরের পর কেন্দ্রীয় ও তৃণমূল আওয়ামী লীগ, সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনগুলোর সম্মেলন ও কমিটি গঠনের কাজ শেষ হয়ে যাবে। তখন সরকার ও আওয়ামী লীগ আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতি ও বিরোধীদের চাপে রাখার কাজে বেশি মনোযোগ দিতে পারবে।