মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর পেলেন স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়
আওয়ামী লীগের দেড় দশকের শাসনকালে দমন–পীড়নের মধ্যে যে কয়েকজন বিএনপির ঝান্ডা ধরে রেখেছিলেন, তাদেরই একজন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। হামলার শিকার হয়েছেন, জেলে গিয়েছেন, তার মধ্যেই দলের মহাসচিবের দায়িত্ব পালনে অবিচল ছিলেন তিনি। খালেদা জিয়ার সরকারে প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা নিয়ে এবার পূর্ণ মন্ত্রী হলেন তিনি।
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ আসনে জয়ী হয়ে গতকাল মঙ্গলবার বিএনপি নতুন সরকার গঠন করে। দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমান তাঁর মন্ত্রিসভার সদস্যদের নিয়ে শপথ নেন। নতুন মন্ত্রিসভায় মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর পেয়েছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব।
৭৭ বছর বয়সী মির্জা ফখরুল ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও–১ আসন থেকে জয়ী হন। এ নিয়ে চতুর্থবার আইনসভায় প্রতিনিধিত্ব করছেন তিনি। এর আগে ১৯৯৬ সালে (১৫ ফেব্রুয়ারি) ও ২০০১ সালে ঠাকুরগাঁও–১ আসন থেকে তিনি নির্বাচিত হন। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকাকালে ২০১৮ সালে অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি ঠাকুরগাঁও–১ ও বগুড়া–৬ আসন থেকে প্রার্থী হয়েছিলেন। এর মধ্যে বগুড়া–৬ আসন থেকে নির্বাচিত হলেও তিনি শপথ নেননি।
ওই সময় বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ছিলেন কারাগারে। আর তারেক রহমান ছিলেন লন্ডনে নির্বাসিত। তখন মির্জা ফখরুলসহ ছয়জন সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। মির্জা ফখরুল ছাড়া বাকি পাঁচজনই শপথ নেন। নির্ধারিত সময়ে শপথ না নেওয়ায় মির্জা ফখরুলের আসনটি শূন্য ঘোষণা করে উপনির্বাচন হয়। আর তাতে জয়ী হন বিএনপির প্রার্থী জি এম সিরাজ। পরে ২০২২ সালের ডিসেম্বরে বিএনপির সংসদ সদস্যদের সবাই পদত্যাগ করেন। তাঁরা বলেছিলেন, সরকারের গুম, খুন, বিচারবহির্ভূত হত্যা, বিরোধী দলের ওপর নির্যাতন, প্রকাশ্য লুটপাট—সবকিছুর প্রতিবাদে তাঁরা পদত্যাগ করেছেন।
মির্জা ফখরুলের জন্ম ১৯৪৮ সালের ১ আগস্ট। তাঁর বাবা মির্জা রুহুল আমিন ও মা ফাতেমা আমিন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতি বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিয়ে মির্জা ফখরুল যোগ দেন শিক্ষকতায়। শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তা হিসেবে ১৭ বছর তিনি ঢাকা কলেজসহ বেশ কয়েকটি সরকারি কলেজে পড়িয়েছেন। আশির দশকে তিনি সরকারি চাকরি ছেড়ে রাজনীতিতে সক্রিয় হন।
মির্জা ফখরুলের রাজনীতিতে সম্পৃক্ততা ছাত্রজীবনেই। তখন তিনি বাম সংগঠনে যুক্ত ছিলেন। সরকারি চাকরি ছেড়ে তিনি ১৯৮৮ সালে ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপিতে যোগ দেন, ১৯৯২ সালে বিএনপির ঠাকুরগাঁও জেলা শাখার সভাপতি হন। ২০০১ সালে খালেদা জিয়ার সরকারে তিনি প্রথমে কৃষি প্রতিমন্ত্রী হয়েছিলেন, পরে তাঁকে বেসামরিক বিমান পরিবহন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হয়।
২০০৯ সালে মির্জা ফখরুল বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব হন। এই পদে এর আগে বিএনপির বর্তমান চেয়ারম্যান তারেক রহমান ছিলেন। ২০১১ সালে বিএনপির তৎকালীন মহাসচিব খন্দকার দেলোয়ার হোসেনের মৃত্যু হলে মির্জা ফখরুল ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হন। পাঁচ বছর পর তিনি মহাসচিব নির্বাচিত হন।
এবারের নির্বাচনী হলফনামা অনুসারে মির্জা ফখরুলের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে ৩ লাখ ৮২ লাখ টাকার বেশি অর্থ রয়েছে। তাঁর বছরে আয় ১১ লাখ ৮৩ হাজার টাকার বেশি। তাঁর নগদ অর্থ রয়েছে সোয়া কোটি টাকা। তাঁর অস্থাবর সম্পদ ১ কোটি ৩৩ লাখ টাকার ওপর। স্থাবর সম্পদ রয়েছে ১৯ লাখ টাকার। হলফনামায় তিনি পেশা হিসেবে লিখেছেন ব্যবসা, পরামর্শক, কৃষি আয়, ব্যাংক, মুনাফা ও সম্মানী ভাতা।
হলফনামা অনুসারে, ৫০টি মামলায় অভিযুক্ত ছিলেন বিএনপি মহাসচিব। সবগুলো মামলা থেকে অব্যাহতি পেয়েছেন। এর মধ্যে ৪৩টি মামলা থেকে অব্যাহতি পান জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের পর ২০২৪ ও ২০২৫ সালে। ৬টি মামলা থেকে অব্যাহতি পান ২০১৫ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে।
মির্জা ফখরুলের স্ত্রী রাহাত আরা বেগম বেসরকারি চাকরিজীবী ছিলেন। তার দুই মেয়ে মির্জা শামারুহ ও মির্জা সাফারুহ শিক্ষকতায় যুক্ত।