বিএনপি সরকার অতীত থেকে শিক্ষা নেয়নি: বদিউল আলম মজুমদার
স্বচ্ছতা-জবাবদিহি ও অধিকারের সুরক্ষার আইনগুলো বিএনপি সরকার কেন বাতিল করছে, তা বুঝতে পারছেন না সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার। এ বিষয়টি দুই-তৃতীয়াংশের বেশি সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার ‘অভিশাপ’ কি না, সেই প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। বদিউল আলম মজুমদার অভিযোগ করে বলেন, ‘বর্তমান বিএনপি সরকার যেভাবে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, তারা অতীত থেকে অবশ্যই শিক্ষা নেয়নি।’
আজ বৃহস্পতিবার বিকেলে রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবে এক গোলটেবিল আলোচনায় অংশ নিয়ে বদিউল আলম মজুমদার এ কথা বলেন। ‘মানবাধিকার সুরক্ষা ও স্বাধীন বিচার বিভাগ-সম্পর্কিত অধ্যাদেশগুলোর বিষয়ে নাগরিক ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক এই আলোচনার আয়োজন করে হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস)।
আলোচনায় অংশ নিয়ে বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনামলে প্রণীত সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ ও সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ রহিত করা হলো। আমাদের বোধগম্য হচ্ছে না যে কেন বিএনপি এ কাজটা করল?’ এ সময় ২০১৮ সালের অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে বদিউল আলম বলেন, ‘উচ্চ আদালতে গিয়ে বিএনপির হাজার হাজার নেতা-কর্মীকে জামিনের জন্য ধরনা দিতে দেখেছি। কী করুণ অবস্থা! অনেক নির্যাতন-নিপীড়নের শিকার হয়ে আদালতে গিয়েও তাঁরা প্রতিকার পাচ্ছিলেন না। এখন বর্তমান বিএনপি সরকার এই যে সিদ্ধান্তগুলো নিচ্ছে, তারা অতীত থেকে অবশ্যই শিক্ষা নেয়নি।’
বিএনপি ‘শপথপ্রাপ্ত বিচারপতিদের’ আবারও নিয়ে আসতে চায় কি না, সে রকম বিচারপতি নিয়োগ করতে চায় কি না, সেই প্রশ্নও তোলেন বদিউল আলম মজুমদার। তিনি বলেন, ‘এটা সবার জন্য অশনিসংকেত। তারা এ পথে হাঁটলে আমরা কেউ নিরাপদ থাকব না। এবার তারা এমন কয়েকটা অধ্যাদেশ অনুমোদন করেছে, যেগুলোর অপব্যবহার হতে পারে।’
স্থানীয় সরকারে প্রশাসক বসানোকে আইনসিদ্ধ করার জন্য অন্তর্বর্তী সরকার চারটি অধ্যাদেশ জারি করেছিল উল্লেখ করে বদিউল আলম মজুমদার বলেন, গণ-অভ্যুত্থানের পর স্থানীয় সরকারের অনেক জনপ্রতিনিধি পালিয়ে গিয়েছিলেন, এ ছাড়া অনেকগুলো স্থানীয় সরকারের মেয়াদ শেষ হয়ে গিয়েছিল। এগুলো পূরণ করতে চারটি অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছিল। বিগত সরকার জাতীয় নির্বাচনের আগে স্থানীয় সরকারের নির্বাচনও করতে চেয়েছিল; কিন্তু তখন বিএনপির প্রবল বিরোধিতায় তা হয়নি। তখন বিএনপি আশ্বাস দিয়েছিল, জাতীয় নির্বাচনের পর স্থানীয় সরকারের নির্বাচন করা হবে; কিন্তু হলো তার উল্টো।
স্থানীয় সরকারে প্রশাসক বসানো বিএনপির ৩১ দফা ও তাদের নির্বাচনী ইশতেহারের পাশাপাশি সংবিধানের ৫৯ অনুচ্ছেদেরও সুস্পষ্ট লঙ্ঘন বলে মন্তব্য করেন বদিউল আলম মজুমদার। তিনি বলেন, বিষয়টি উচ্চ আদালতের একটি রায়েরও লঙ্ঘন। সব লঙ্ঘন করে তারা প্রশাসক নিয়োগ কেন করল, তা বোধগম্য নয়।
বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘আমার বিবেচনায়, যখন যে দল ক্ষমতায় থাকে, তখন তাদের এমন আইন প্রণয়ন করা দরকার, যা বিরোধী দলে গেলে তাদের সুরক্ষা দেবে; কিন্তু বিএনপি উল্টো পথে হাঁটছে। এর পরিণতি কী? আমি শঙ্কিত। আমার আশঙ্কা, এর পরিণতি নাগরিকদের জন্য ভালো হবে না এবং ক্ষমতাসীনদের জন্যও মঙ্গলজনক হবে না।’
গণভোটের রায় বাস্তবায়নে অনীহা এবং স্বচ্ছতা-জবাবদিহি ও অধিকারের সুরক্ষার আইনগুলো বিএনপি সরকার কেন বাতিল করছে, তা বুঝতে পারছেন না বলে উল্লেখ করেন বদিউল আলম মজুমদার। এটি দুই-তৃতীয়াংশের বেশি সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার অভিশাপ কি না, সেই প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, অতীতে সে রকম দৃষ্টান্ত আছে। ১৯৭৩ সালের নির্বাচন, ২০০১ সালের নির্বাচনে কি ক্ষমতার শান্তিপূর্ণ রদবদল হয়েছিল? ২০০৮ সালের পর তো স্বৈরাচারের আবির্ভাব হলো। ফলে এসব সিদ্ধান্তের পরিণতি জাতি ও তাদের নিজেদের জন্য কী হবে, সে সম্পর্কে বর্তমান সংসদের সদস্য ও যাঁরা সরকার পরিচালনা করছেন, তাঁদের ভাবা দরকার।
অনুষ্ঠানের সূচনা ও সমাপনী বক্তব্য দেন এইচআরএসএসের চেয়ারম্যান শাহজাদা আল আমীন কবির। এইচআরএসএসের পক্ষ থেকে একটি প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সংস্থার নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম। আরও বক্তব্য দেন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক আবু সাঈদ খান ও মাসুদ কামাল, অধিকারের পরিচালক এ এস এম নাসির উদ্দিন, জি-নাইনের সাধারণ সম্পাদক সাখাওয়াত হোসেন, নাগরিক উদ্যোগের প্রধান নির্বাহী জাকির হোসেন, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী শিশির মনির ও ইমরান সিদ্দিক, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্তা শারমিন, বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সদস্য দীপায়ন খিসা, আওয়ামী লীগ শাসনামলে গুমের শিকার মোহন মিয়ার বাবা জামশেদ মিয়া এবং ‘জুলাই যোদ্ধা’ আহমেদ সামরান।