রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী না হলে গণতন্ত্র টেকসই হতে পারে না: আবদুল মঈন খান
রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালী না হলে কোনো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাই দীর্ঘ মেয়াদে টেকসই হতে পারে না বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আবদুল মঈন খান। তিনি বলেছেন, গণতন্ত্রের ভিত্তি শুধু নির্বাচন বা সংখ্যাগরিষ্ঠতার ওপর নয়; বরং শক্তিশালী ও কার্যকর প্রতিষ্ঠানই এর মূল ভরসা।
আবদুল মঈন খান বলেন, গণতন্ত্রকে টিকিয়ে রাখতে হলে সংসদ, বিচারব্যবস্থা, প্রশাসনসহ সব রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে স্বাধীন, কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক হতে হবে। তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠান দুর্বল হলে গণতন্ত্রও ধীরে ধীরে অকার্যকর হয়ে পড়ে।
সিটিজেনস ফোরাম, বাংলাদেশ (সিএফবি) আয়োজিত গোলটেবিল বৈঠকে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এ কথা বলেন আবদুল মঈন খান। আজ বুধবার বিকেলে রাজধানীর মিন্টো রোডের একটি হোটেলে ‘ন্যাশনাল পার্লামেন্ট: আ নিউ মাইলস্টোন ইন ডেমোক্রেটিক পলিটিকস’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়।
আবদুল মঈন খান বলেন, গণতন্ত্র কেবল সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসন নয়; এটি এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে সংখ্যালঘুর মতামতও গুরুত্ব পায় এবং পারস্পরিক সহনশীলতা বজায় থাকে। তিনি বলেন, এই ভারসাম্য রক্ষা করাও একটি শক্তিশালী গণতান্ত্রিক কাঠামোর অংশ।
২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের প্রসঙ্গ টেনে বিএনপির স্থায়ী কমিটির এই সদস্য বলেন, সাম্প্রতিক সময়ের অভিজ্ঞতা ও পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা সামনে রেখে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন ও শক্তিশালী করার দিকে মনোযোগ দেওয়া জরুরি।
আন্তর্জাতিক উদাহরণ টেনে আবদুল মঈন খান বলেন, দীর্ঘ সময় ধরে গড়ে ওঠা প্রতিষ্ঠানই উন্নত গণতন্ত্রকে স্থিতিশীল রেখেছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রতিষ্ঠান নির্মাণ ও সংস্কারের মাধ্যমে গণতন্ত্রকে আরও সুসংহত করার সুযোগ রয়েছে।
ভবিষ্যতের সংসদকে শুধু আইন প্রণয়নের কেন্দ্র নয়, বরং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করার একটি কার্যকর প্ল্যাটফর্ম হিসেবে গড়ে তুলতে হবে বলে উল্লেখ করেন আবদুল মঈন খান। তিনি বলেন, তাহলেই গণতন্ত্র টেকসই ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে পারবে।
অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক ও বিলিয়ার চেয়ারম্যান বোরহান উদ্দিন খান। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ ঘিরে দেশে ‘নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা’র জন্ম হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, দীর্ঘ সময় ধরে বিতর্কিত নির্বাচন, ভোটাধিকার সংকট ও একতরফা রাজনৈতিক পরিবেশের পর জনগণ আবারও নিজেদের প্রতিনিধি নির্বাচনের সুযোগ পেয়েছে। এ কারণেই বর্তমান সংসদকে শুরু থেকেই একটি ‘নতুন মাইলফলক’ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
নবম থেকে দ্বাদশ সংসদ পর্যন্ত সময়কালে জনগণের ভোটাধিকার নিয়ে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছিল বলে মন্তব্য করেন বোরহান উদ্দিন খান। তিনি বলেন, জুলাই-আগস্টের গণ–অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির অনুপস্থিতিতে বিএনপি-জামায়াত সমর্থিত দলগুলোর অংশগ্রহণে গঠিত এই সংসদ আগের সংসদগুলোর তুলনায় ভিন্ন চরিত্র ধারণ করেছে।
বোরহান উদ্দিন খান বলেন, সংসদের শুরুতে শপথ গ্রহণ নিয়ে কিছু বিভ্রান্তি থাকলেও পরে প্রাণবন্ত আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে নতুন সংসদের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ সংবিধান সংস্কার। আগের সরকার রেখে যাওয়া ১৩৩টি অধ্যাদেশ, জুলাই সনদ ও জুলাই আদেশের সাংবিধানিক অবস্থান এবং সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদ ঘিরে জটিল প্রশ্নের সমাধান করতে হবে এই সংসদকেই।
গণতন্ত্র কোনো গন্তব্য নয়, এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া উল্লেখ করে বোরহান উদ্দিন খান বলেন, তাই বর্তমান সংসদকে ‘স্বৈরাচারী’ প্রবণতা থেকে দূরে থেকে জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করতে হবে। তিনি বলেন, সংসদকে এমন এক জায়গায় পরিণত করতে হবে যেখানে ঘৃণা নয়, যুক্তি ও বিতর্কের চর্চা হবে; আর সাধারণ মানুষ পাবে আস্থা ও ন্যায়বিচারের প্রতিফলন।
বৈষম্য অব্যাহত থাকলে গণতন্ত্র কার্যকর হবে না
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ও অর্থনীতিবিদ মাহবুব উল্লাহ বলেন, বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা একধরনের সাংবিধানিক ও অসাংবিধানিক ব্যবস্থার মিশ্র রূপে পরিচালিত হচ্ছে, যা রাষ্ট্র পরিচালনায় অনিশ্চয়তা ও বিতর্ককে আরও জটিল করে তুলেছে। তিনি বলেন, কেবল আইন বা অধ্যাদেশের মাধ্যমে সংস্কার আনলেই গণতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি পাবে না, বরং ধ্বংসপ্রাপ্ত রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে পুনর্গঠন, রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য কমানোই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
বৈষম্য ও ‘প্রান্তিকীকরণ’ অব্যাহত থাকলে গণতন্ত্র কার্যকর হবে না এবং অতীতের কর্তৃত্ববাদী শক্তির পুনরুত্থানের ঝুঁকিও থেকে যাবে বলে মন্তব্য করেন মাহবুব উল্লাহ। তিনি বলেন, তাই আত্মতুষ্টি নয়, বাস্তববাদী রাজনৈতিক উদ্যোগ, ধৈর্য ও গণতান্ত্রিক দায়বদ্ধতার মধ্য দিয়েই দেশকে স্থিতিশীল ও অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্রের পথে এগোতে হবে।
প্রয়োজন নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি
সম্প্রতি সংসদ সদস্যদের উপজেলা পর্যায়ে ‘বসার জায়গা’ নির্ধারণ করে দেওয়ার উদ্যোগ উদ্বেগজনক বলে মন্তব্য করেন সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার। তিনি সতর্ক করে বলেন, সংসদ সদস্যদের স্থানীয় প্রশাসন ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করার প্রবণতা সংবিধানের চেতনার পরিপন্থী এবং এতে রাষ্ট্র ও দলের সীমারেখা ঝাপসা হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। একই সঙ্গে তিনি সংসদ সদস্যদের ‘স্বার্থের দ্বন্দ্ব’ ও আচরণবিধি নিয়ন্ত্রণে জরুরি আইন প্রণয়নের তাগিদ দেন। বলেন, গণতন্ত্র টিকিয়ে রাখতে হলে কেবল নতুন আইন নয়, প্রয়োজন নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি।
বদিউল আলম মজুমদার বলেন, দুই-তৃতীয়াংশের বেশি সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে গঠিত বাংলাদেশের আগের সংসদগুলো শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তরের নজির রাখতে পারেনি—এবারও তাই নতুন সংসদের সামনে বড় প্রশ্ন সফলতার। সংসদ কেবল আইন পাসের যান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান নয়, এর সফলতা নির্ভর করবে সদস্যদের গণতান্ত্রিক মানসিকতা, জবাবদিহি ও সংবিধানসম্মত আচরণের ওপর।
আলোকচিত্রী শহিদুল আলম বলেন, শুধু নির্বাচিত সংসদ থাকাই গণতন্ত্রের মাইলফলক নয়। বরং এমন প্রতিষ্ঠান ও রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলা জরুরি, যা ভবিষ্যতের সরকারকেও জবাবদিহির মধ্যে রাখবে।
গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, সাইবার নিরাপত্তা আইনের ব্যবহার, বিচারপ্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা এবং ভিন্নমতের প্রতি সহনশীলতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, সমালোচনাকে দমন করে কিংবা তোষণ সংস্কৃতিকে প্রশ্রয় দিয়ে গণতন্ত্র শক্তিশালী হয় না। বরং নাগরিক সমাজ, রাজনৈতিক দল ও রাষ্ট্র—সবারই আত্মসমালোচনার সাহস থাকতে হবে।
রাজনৈতিক বৈধতা প্রশ্নবিদ্ধ করার প্রবণতা গণতন্ত্রের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ
আলোচনায় জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, সাম্প্রতিক সংসদ নির্বাচন ও রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় কিছু অগ্রগতি থাকলেও জন–আকাঙ্ক্ষা পূরণ ও সংস্কার বাস্তবায়ন নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। তিনি সংসদে নতুন মুখের উপস্থিতি বাড়লেও ব্যবসায়ীদের প্রভাব ও প্রতিনিধিত্বের ভারসাম্য নিয়ে প্রশ্ন তোলেন এবং চলমান সংস্কার উদ্যোগ ও জুলাই জাতীয় সনদের বাস্তবায়ন নিয়ে ধীরগতির সমালোচনা করেন। পাশাপাশি রাজনৈতিক সহনশীলতা ও নারীর অংশগ্রহণ বাড়িয়ে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতান্ত্রিক পরিবেশ গড়ে তোলার আহ্বান জানান।
জাতীয় সংসদকে গণতান্ত্রিক চর্চার একটি ইতিবাচক অগ্রযাত্রা হিসেবে উল্লেখ করেন কুড়িগ্রাম–২ আসনের সংসদ সদস্য আতিক মুজাহিদ। তিনি বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে সংসদীয় সংস্কৃতিতে কিছু উন্নতি ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ তৈরি হয়েছে। তবে তিনি রাজনৈতিক বৈধতা প্রশ্নবিদ্ধ করার প্রবণতাকে গণতন্ত্রের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বলে সতর্ক করেন এবং জনগণের ‘ম্যান্ডেট’কে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার ওপর জোর দেন।
জনগণের ভোটে গঠিত সরকারের বৈধতা নিয়ে অতিরিক্ত প্রশ্ন না তুলে তাদের মূল শক্তি হিসেবে জনগণের ম্যান্ডেটকেই গুরুত্ব দেন সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য নুসরাত তাবাসসুম। তিনি আশা করেন, সরকার সমালোচনা ও পরামর্শ গ্রহণে উন্মুক্ত থাকবে। পাশাপাশি তিনি নারীর প্রতি সহিংসতা ও বিচারব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতা তুলে ধরে দ্রুত ন্যায়বিচার এবং সামাজিক সচেতনতার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন।
‘সংরক্ষিত আসনের ব্যবস্থা পুরোপুরি গণতান্ত্রিক নয়’
সংসদ কার্যকর করতে সরকার ও বিরোধী দলের আরও বেশি স্বচ্ছতা ও দায়িত্বশীলতা প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্য মারদিয়া মমতাজ। তিনি বলেন, জাতীয় সংকট ও গণমাধ্যম–সংক্রান্ত বিষয়ে সরকারের খোলামেলা অবস্থান জনগণের আস্থা বাড়াবে। একই সঙ্গে জেন্ডার বাজেট, কর্মসংস্থান ও নিয়োগে দলীয়করণের অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, কথার সঙ্গে কাজের অসামঞ্জস্য জনগণের মধ্যে হতাশা তৈরি করছে।
নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বাড়াতে তাঁদের সরাসরি নির্বাচনের বিকল্প নেই মন্তব্য করে সাবেক রাষ্ট্রদূত নাসিম ফেরদৌস বলেন, সংসদে নারীদের প্রতিনিধিত্ব এখনো খুব সীমিত এবং সংরক্ষিত আসনের বর্তমান ব্যবস্থা পুরোপুরি গণতান্ত্রিক নয়। ২০০৮ সালের নির্বাচনের তুলনায় এবার নারীদের আরও বেশি সরাসরি মনোনয়ন দেওয়ার প্রত্যাশা ছিল, বিশেষ করে গত কয়েক বছরে বিরোধী দলের নারী নেত্রীরা আত্মবিশ্বাস ও রাজনৈতিক সক্ষমতা বাড়িয়েছেন। তবে সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি।
আলোচনায় সভাপতির বক্তব্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও ইমেরিটাস অধ্যাপক এম আনোয়ারুল্লাহ চৌধুরী জুলাই গণ–অভ্যুত্থান পরবর্তী রাজনৈতিক পরিবর্তনকে ‘বিপ্লব’ নয়, বরং একটি সফল গণ–অভ্যুত্থান হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি একে জনতার জাগরণ বা ‘রেনেসাঁ’ হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি শিক্ষাব্যবস্থা ও অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করতে জ্ঞানভিত্তিক ও মানবিক সমাজ গঠনের ওপর গুরুত্ব দেন এবং শিক্ষা কমিশন গঠনের আহ্বান জানান।
সিটিজেনস ফোরাম, বাংলাদেশের (সিএফবি) সমন্বয়কারী ইশারফ হোসেনের সঞ্চালনায় গোলটেবিল বৈঠকে আরও বক্তব্য দেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক কামরুল আহসান, সাবেক প্রতিমন্ত্রী আবুল হাসান চৌধুরী, যুগান্তর সম্পাদক ও কবি আবদুল হাই শিকদার, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সাখাওয়াত হোসেন সায়ন্ত, আমার দেশের যুগ্ম সম্পাদক এম আব্দুল্লাহসহ আরও অনেকে। অনুষ্ঠানে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন ইউজিসির চেয়ারম্যান অধ্যাপক মামুন আহমেদ।