চাঁদাবাজি রোধে নতুন আইনের চিন্তা সরকারের

চাঁদাবাজিপ্রতীকী ছবি

চাঁদাবাজির শিকার হলেও অনেকে ভয়ে মামলা করতে চান না। এ সুযোগে চাঁদাবাজেরা পার পেয়ে যান। এমন পরিস্থিতিতে চাঁদাবাজি প্রতিরোধে ফৌজদারি দণ্ডবিধি সংশোধন অথবা পৃথক নতুন আইন করার চিন্তা করছে সরকার। নতুন আইনি ব্যবস্থায় ভুক্তভোগী মামলা করতে না চাইলেও পুলিশ যেন নিজে বাদী হয়ে ব্যবস্থা নিতে পারে, সেই সুযোগ রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়–সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির গত ১৩ আগস্টের  বৈঠকে সরকারের এ পরিকল্পনার কথা জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দীন আহমদ। ওই বৈঠকের কার্যবিবরণীতে বিষয়টি উঠে এসেছে। বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) সংসদীয় কমিটির বৈঠকে ওই কার্যবিবরণী উপস্থাপন করা হয়।

কার্যবিবরণী সূত্রে জানা গেছে, বৈঠকে চাঁদাবাজি প্রতিরোধের বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, পেনাল কোডের বিদ্যমান আইনি দুর্বলতা দূর করতে আইন সংশোধন অথবা পৃথক নতুন আইন করার চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে। এর উদ্দেশ্য, চাঁদাবাজির শিকার ব্যবসায়ী বা অন্য কোনো ব্যক্তি ভয়ে মামলা করা থেকে পিছিয়ে গেলেও পুলিশ যেন নিজে বাদী হয়ে মামলা করতে পারে।

চাঁদাবাজদের পাশাপাশি তাঁদের পেছনে থাকা গডফাদারদের শনাক্ত করতেও নতুন পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি সংসদীয় কমিটিকে জানান, চাঁদা আদায়কারী এবং তাঁদের পেছনের গডফাদারদের সঠিকভাবে চিহ্নিত করতে বডি ক্যামেরা ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে ধারণ করা অডিও ও ভিডিও রেকর্ড আদালতে গ্রহণযোগ্য সাক্ষ্য হিসেবে ব্যবহার করার পরিকল্পনা রয়েছে।

এ ছাড়া অপরাধীরা যেন সামান্য শাস্তি পেয়ে বা জামিনে মুক্ত হয়ে আবার একই অপরাধে জড়িয়ে পড়তে না পারে, সে বিষয়েও আইনি সংস্কারের পরিকল্পনার কথা জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে সামান্য শাস্তি দেওয়ার পরিবর্তে কঠোর সাজা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে আইনি সংস্কারের চিন্তাভাবনা রয়েছে।
এরই মধ্যে বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) অনুষ্ঠিত স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির বৈঠকে সারা দেশে চাঁদাবাজি, ছিনতাই, কিশোর গ্যাং, মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার ও সংঘবদ্ধ অপরাধ প্রতিরোধে সরকারের নেওয়া কার্যক্রম নিয়ে আলোচনা হয়েছে। একই বৈঠকে দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং ২০২৪ সালের গণ–অভ্যুত্থানে বিতর্কিত ভূমিকা থাকা পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে নেওয়া বিভাগীয় ব্যবস্থার তথ্য তুলে ধরেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

১৪৭ কর্মকর্তার বাধ্যতামূলক অবসর ও

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ‘পলায়নের অভিযোগে’ বিসিএস পুলিশ ক্যাডারের ৬২ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করেছে পুলিশ। তাঁদের মধ্যে ৩১ জনকে গুরুদণ্ড দেওয়া হয়েছে বা চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়েছে। বাকি ৩১ জনের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা চলমান রয়েছে।

বৃহস্পতিবার সংসদীয় কমিটিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দেওয়া প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। সংসদীয় কমিটির সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের গণ–অভ্যুত্থানে বিতর্কিত বা নেতিবাচক ভূমিকায় থাকা পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত কী ধরনের বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, গণ–অভ্যুত্থানকেন্দ্রিক বিভিন্ন ঘটনায় পুলিশের সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) থেকে তদূর্ধ্ব পদমর্যাদার ১৪৭ কর্মকর্তাকে এখন পর্যন্ত বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া পুলিশ পরিদর্শক পদমর্যাদার ৭৩ কর্মকর্তাকে জনস্বার্থে অবসর দেওয়া হয়েছে। অন্য পুলিশ পরিদর্শকদের বিষয়ে বিধিসম্মত ব্যবস্থা গ্রহণের কার্যক্রম চলমান রয়েছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, গণ–অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত বিভিন্ন ঘটনায় আইসিটির মামলার রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে এএসপি থেকে ওপরের পদমর্যাদার ১৩ কর্মকর্তার মধ্যে পাঁচজনকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। বাকি আটজনের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা চলছে।

এ ছাড়া গণ–অভ্যুত্থানকেন্দ্রিক বিভিন্ন ফৌজদারি, সিআর ও আইসিটি মামলায় গ্রেপ্তার ২৯ পুলিশ কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তারের তারিখ থেকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) পদমর্যাদার দুজন কর্মকর্তাকে জনস্বার্থে চাকরি থেকে বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়া হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সংসদীয় কমিটির আগের বৈঠকে গণ–অভ্যুত্থানে বিতর্কিত বা নেতিবাচক ভূমিকা পালনকারী পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছিল। সেই সুপারিশের পরিপ্রেক্ষিতেই গতকালের বৈঠকে নেওয়া ব্যবস্থার হিসাব তুলে ধরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

অপরাধের কিছু মামলা বেড়েছে, কিছু কমেছে

বৃহস্পতিবারের বৈঠকে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে তুলনামূলক তথ্য উপস্থাপন করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এতে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নয় মাসে বিভিন্ন অপরাধে দায়ের হওয়া মামলার সঙ্গে গত বছরের একই সময়ের মামলার সংখ্যা তুলনা করা হয়।

কমিটির সূত্র জানায়, উপস্থাপিত প্রতিবেদনে দেখা গেছে, চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ধর্ষণের অভিযোগে দায়ের হওয়া মামলা বেড়েছে। মাদকদ্রব্য–সংক্রান্ত মামলাও বেড়েছে। একইভাবে সিঁধেল চুরি ও সাধারণ চুরির ঘটনায় মামলা বেড়েছে।

অন্যদিকে খুন, ডাকাতি, দস্যুতা ও নারী নির্যাতনের অভিযোগে দায়ের হওয়া মামলার সংখ্যা আগের বছরের তুলনায় কমেছে। পুলিশ আক্রান্ত হওয়ার ঘটনাও কিছুটা কমেছে।

তবে বৈঠক শেষে সংসদ সচিবালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতির কথা জানানো হয়। এতে বলা হয়, বৈঠকে উপস্থাপিত তথ্য-উপাত্তে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্য উন্নতির চিত্র উঠে এসেছে। এ উন্নতিতে বৈঠকে উপস্থিত সংসদীয় কমিটির সদস্যরা সন্তোষ প্রকাশ করেছেন।

বৈঠকে রাজধানীর মিরপুরে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্য সেবাকেন্দ্রে হামলার ঘটনাও আলোচনায় আসে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, কমিটিকে জানানো হয়েছে, ওই ঘটনায় যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। অভিযোগ ওঠার পরিপ্রেক্ষিতে বিএনপির একজন নারী সংসদ সদস্য দলীয় প্রধানের নির্দেশে পদত্যাগ করেছেন।

সংসদ সচিবালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, বৈঠকে মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার নিয়ন্ত্রণ এবং সাইবার অপরাধ দমনে পৃথক সাইবার পুলিশ ইউনিট গঠনসহ সরকারের নেওয়া প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা হয়েছে। অপরাধ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে যুগোপযোগী প্রযুক্তি ব্যবহারের সুপারিশ করেছে সংসদীয় কমিটি।

বৈঠকে সংসদীয় কমিটির সদস্য মো. নূরুল ইসলাম রাজধানীতে সাম্প্রতিক সময়ে সংঘটিত অপরাধ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, তা জানতে চান। এর জবাবে কমিটির সদস্য ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দীন আহমদ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নেওয়া কার্যক্রম এবং এসব কার্যক্রমের অগ্রগতি তুলে ধরেন।

জাতীয় সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন কমিটির সভাপতি জয়নুল আবেদীন। বৈঠকে আরও অংশ নেন স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, হুইপ মিয়া নুরুদ্দিন আহাম্মেদ এবং কমিটির সদস্য মনোয়ার হোসেন, শিরীন সুলতানা, মো. নূরুল ইসলাম ও মো. আব্দুল বাতেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ইয়াবায় আসক্ত করার অভিযোগ

এদিকে সংসদীয় কমিটির ১৩ আগস্টের কার্যবিবরণী সূত্রে জানা গেছে, ওই বৈঠকে মাদকের বিস্তার ও তা প্রতিরোধের বিষয়েও আলোচনা হয়েছিল। সেখানে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির বলেছেন, বেকারত্বের কারণে যুবসমাজ মাদকে আসক্ত হচ্ছে। মেডিক্যাল ও ইঞ্জিনিয়ারিং বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে রাত জেগে পড়ার প্রলোভন দেখিয়ে শিক্ষার্থীদের ইয়াবায় অভ্যস্ত করা হচ্ছে।

মাদক প্রতিরোধে কার্যকর নীতি গ্রহণের পাশাপাশি মোটিভেশনাল কর্মসূচি চালুর ওপরও জোর দেন আইজিপি।