২৮ আসনে জয়-পরাজয়ে যেভাবে প্রভাব রেখেছেন বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীরা
বিএনপির বিদ্রোহী ছিল—এমন ২১টিতে জিতেছেন জামায়াত জোটের প্রার্থীরা। ৭টিতে জিতেছেন বিদ্রোহীরা।
বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী ছিল ৭৮টি আসনে। এর মধ্যে ২১টি আসনে জিতেছেন জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের প্রার্থীরা। আর বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীরা জয়ী হয়েছেন সাতটি আসনে। সব মিলিয়ে ২৮টি আসনে জয়-পরাজয়ে প্রভাব রেখেছেন বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীরা।
যেসব আসনে বিদ্রোহীদের কাছে বিএনপি বা দলটির সমর্থিত প্রার্থীরা হেরেছেন, সেগুলো হলো ময়মনসিংহ-১, দিনাজপুর-৫, কুমিল্লা-৭, কিশোরগঞ্জ-৫, টাঙ্গাইল-৩, চাঁদপুর-৪ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২।
বিদ্রোহী প্রার্থীর কাছে হেরেছেন বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ। ময়মনসিংহ-১ আসনে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে তিনি পেয়েছেন ১ লাখ ১ হাজার ৯২৬ ভোট। তাঁর চেয়ে ৬ হাজার ৩৩৯ ভোট বেশি পেয়ে জয়ী হয়েছেন বিদ্রোহী প্রার্থী মোহাম্মদ সালমান ওমর।
বিদ্রোহীতে ধরাশায়ী বিএনপির জোটসঙ্গীরা
ঢাকা-১২ আসনে বিএনপির সমর্থনে নির্বাচন করেন বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক। ৩০ হাজার ৯৬৩ ভোট পেয়ে তিনি দ্বিতীয় হয়েছেন। এই আসনে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী সাইফুল আলম (নীরব) পেয়েছেন ২৯ হাজার ৮৬৯ ভোট। দুজনের সম্মিলিত ভোট ৬০ হাজার ৮৩২ ভোট।
বিএনপি-সমর্থিত প্রার্থী ও বিদ্রোহী প্রার্থীর মধ্যে ভোট ‘ভাগ’ হয়ে যাওয়ায় এই আসনে জয় পেয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী সাইফুল আলম খান মিলন। তিনি পেয়েছেন ৫৩ হাজার ৭৭৩ ভোট।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে বিএনপির সমর্থনে নির্বাচন করেন জোটসঙ্গী জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের প্রার্থী জুনায়েদ আল হাবিব। ৩৭ হাজার ৫৬৮ ভোটের ব্যবধানে তাঁকে পরাজিত করেছেন বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী রুমিন ফারহানা।
সিলেট-৫ আসনে বিএনপির সমর্থনে নির্বাচন করেন জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের সভাপতি উবায়দুল্লাহ ফারুক। তিনি পেয়েছেন ৬৯ হাজার ৭৭৪ ভোট। এই আসনে জয়ী হয়েছেন জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১–দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের প্রার্থী খেলাফত মজলিসের আবুল হাসান। দেয়ালঘড়ি প্রতীক নিয়ে তিনি পেয়েছেন ৭৯ হাজার ৩৫৫ ভোট। এই আসনে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী মামুনুর রশিদ পেয়েছেন ৫৬ হাজার ৩৬৯ ভোট।
নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের প্রার্থী মনির হোসেন কাসেমীকে সমর্থন দিয়েছিল বিএনপি। তিনি হেরেছেন জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলের প্রার্থী জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আব্দুল্লাহ আল আমিনের কাছে। কাসেমী পেয়েছেন ৮০ হাজার ৬১৯ ভোট। জয়ী হওয়া আব্দুল্লাহ আল আমিন পেয়েছেন ১ লাখ ৬ হাজার ১৭১ ভোট।
এই আসনে বিএনপির দুজন বিদ্রোহী প্রার্থী ছিলেন। তাঁরা হলেন মো. শাহ আলম ও মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন। শাহ আলম ৩৯ হাজার ৫৮৯ ভোট আর গিয়াস পেয়েছেন ৪ হাজার ৭৭৯ ভোট। অর্থাৎ ভোট ‘ভাগ’ না হলে কাসেমীর জয় নিশ্চিত ছিল।
ধানের শীষ পেতে দলত্যাগ, তবু হার
লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) মহাসচিবের পদ ছেড়ে বিএনপিতে যোগ দিয়ে কুমিল্লা-৭ আসনে নির্বাচন করেছেন রেদোয়ান আহমেদ। তাঁকে ৪৩ হাজার ১৮১ ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করেছেন বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী আতিকুল আলম (শাওন)।
ন্যাশনাল পিপলস পার্টির (এনপিপি) চেয়ারম্যান ফরিদুজ্জামান ফরহাদ বিএনপিতে যোগ দিয়ে নড়াইল-২ আসনে প্রার্থী হন। ভোটে তিনি তৃতীয় হয়েছেন। তাঁর প্রাপ্ত ভোট ৪৫ হাজার ৪৬৩। তাঁকে ৭২ হাজার ৬৭৯ ভোটে পরাজিত করেছেন জামায়াতের প্রার্থী আতাউর রহমান। এই আসনে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী মনিরুল ইসলাম ৭৮ হাজার ৪৫৭ ভোট পেয়ে দ্বিতীয় হয়েছেন।
ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করার জন্য গণ অধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদকের পদ ছেড়ে বিএনপিতে যোগ দিয়েছিলেন মো. রাশেদ খান। ঝিনাইদহ-৪ আসনে নির্বাচন করে তিনি ৫৬ হাজার ২২৪ ভোট পেয়ে তৃতীয় হয়েছেন। এই আসনে জিতেছেন জামায়াতের প্রার্থী আবু তালিব। তিনি পেয়েছেন ১ লাখ ৫ হাজার ৯৯ ভোট। এখানে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী মো. সাইফুল ইসলাম ফিরোজ পেয়েছেন ৭৭ হাজার ১০৪ ভোট।
বিএনপিতে বিদ্রোহী থাকায় যেসব আসনে সুবিধা পেল জামায়াত
বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী থাকায় যে ২১টি আসনে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলের প্রার্থীরা সুবিধা পেয়েছেন, সেগুলোর মধ্যে চট্টগ্রাম-১৬ আসন অন্যতম।
বাঁশখালী উপজেলা নিয়ে গঠিত চট্টগ্রামের এই আসনে ১০ হাজার ৬২ ভোটের ব্যবধানে বিএনপির প্রার্থী মিশকাতুল ইসলাম চৌধুরীকে পরাজিত করেছেন জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম। এই আসনে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী মোহাম্মদ লেয়াকত আলী ৫৫ হাজার ৪৯২ ভোট পেয়ে তৃতীয় হয়েছেন।
পাবনা-৪ আসনটির কথাও আলাদা করে উল্লেখ করার মতো। এই আসনে ১ লাখ ৩৭ হাজার ৫৭৫ ভোট পেয়ে জিতেছেন জামায়াতের প্রার্থী আবু তালেব মণ্ডল। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির প্রার্থী হাবিবুর রহমান পেয়েছেন ১ লাখ ৩৩ হাজার ৮৭৪ ভোট। দুজনের ভোটের পার্থক্য ৩ হাজার ৭০১।
এই আসনে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী জাকারিয়া পিন্টু পেয়েছেন ২৭ হাজার ৯৭০ ভোট। অর্থাৎ বিদ্রোহী প্রার্থীর সঙ্গে ভোট ভাগাভাগি হয়ে যাওয়ায় অল্প ব্যবধানে হারতে হয়েছে হাবিবকে।
বাগেরহাট-১ আসনে ৩ হাজার ২০৪ ভোটের ব্যবধানে বিএনপির প্রার্থী কপিল কৃষ্ণ মণ্ডলকে পরাজিত করেছেন জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মশিউর রহমান খান। এই আসনে বিএনপির দুজন বিদ্রোহী প্রার্থী ছিলেন। তাঁদের মধ্যে মো. শেখ মাছুদ রানা পেয়েছেন ৬ হাজার ৪৬৭ ভোট এবং এম এ এইচ সেলিম পেয়েছেন ৫ হাজার ২৮৩ ভোট। দুজনের মোট ভোট ১১ হাজার ৭৫০। অর্থাৎ এই দুই নেতা বিদ্রোহী না হলে বিএনপি প্রার্থী কপিলের সুবিধা হতে পারত।
একই রকম বা কাছাকাছি ঘটনা ঘটেছে যশোর-৫, মাদারীপুর-১, ঢাকা-১৪, সাতক্ষীরা-৩, পাবনা-৩, শেরপুর-১, গাইবান্ধা-৫, বাগেরহাট-২ এবং বাগেরহাট-৪ সংসদীয় আসনে।
ময়মনসিংহ-৬ সংসদীয় আসনে বিএনপি ও জামায়াত দুই দলেরই বিদ্রোহী প্রার্থী ছিল। এখানে জিতেছেন জামায়াতের প্রার্থী কামরুল হাসান। তিনি পেয়েছেন ৭৭ হাজার ৩২৫ ভোট। এই আসনে জামায়াতের বিদ্রোহী প্রার্থী মো. জসিম উদ্দিন পেয়েছেন ৫১ হাজার ৯৭০ ভোট।
এই আসনে বিএনপির প্রার্থী আখতারুল আলম পেয়েছেন ৪৯ হাজার ৪৭৬ ভোট পান। আর বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী আখতার সুলতানা পেয়েছেন ৫৩ হাজার ৩৩১ ভোট।