জামায়াত লড়বে ১৭৯টিতে, সমঝোতা ২৫৩ আসনে

জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ ১০ দলের নেতারা আসন সমঝোতার মাধ্যমে ঐক্যবদ্ধভাবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। বৃহস্পতিবার রাতে রাজধানীর কাকরাইলে ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্সেছবি: প্রথম আলো

অনেক টানাপোড়েন, দেনদরবার ও শেষ মুহূর্তে টানা বৈঠকের পর জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে ১০টি দল নির্বাচনী সমঝোতায় পৌঁছেছে। যদিও এর নাম দেওয়া হয়েছে ‘১১–দলীয় নির্বাচনী ঐক‍্য’। তবে এই উদ্যোগে শুরু থেকে যুক্ত থাকা ইসলামী আন্দোলনের সঙ্গে গতকাল বৃহস্পতিবার রাত পর্যন্ত সমঝোতা হয়নি। দলটির জন্য ৪৭টি আসন ফাঁকা রেখে বাকি ২৫৩ আসেন প্রার্থীর নাম ঘোষণা করা হয়।

গতকাল রাতে রাজধানীর ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে সংবাদ সম্মেলন করে এই নির্বাচনী মোর্চার প্রার্থীদের নাম ঘোষণা করা হয়। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, চরমোনাই পীরের নেতৃত্বাধীন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের জন্য তাঁরা শেষ পর্যন্ত অপেক্ষা করবেন। দলটি নির্বাচনী ঐক্যে শামিল হলে ওই আসনগুলো ঘোষণা করা হবে।

ঘোষিত নির্বাচনী সমঝোতা অনুযায়ী, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এককভাবে ১৭৯ আসনে প্রার্থী দেবে। বাকি আসনগুলোর মধ্যে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ৩০টি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ২০টি, খেলাফত মজলিস ১০টি, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি) ৭টি, আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টি ৩টি, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি (বিডিপি) ও নেজামে ইসলাম পার্টি ২টি করে আসনে প্রার্থী দেবে। কিছু আসন উন্মুক্ত থাকবে।

এই নির্বাচনী মোর্চার অন্য দুটি দল বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন ও জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা) কোনো প্রার্থী দেবে না। তবে দল দুটি নির্বাচনী ঐক্যে শরিক থাকছে।

গত রাতে সংবাদ সম্মেলনে নির্বাচনী ঐক্যের দলভিত্তিক আসনসংখ্যা ঘোষণা করেন জামায়াতের নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের। তিনি বলেন, এবারের নির্বাচনটি অতীতের নির্বাচনের মতো নয়। অতীতে ক্ষমতার পালাবদলের নির্বাচন হয়েছে। এবার অস্তিত্ব রক্ষার নির্বাচন, নতুন বাংলাদেশ গড়ার নির্বাচন।

সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের বলেন, আসন বণ্টনের বিষয়ে টুকটাক কিছু কিছু জায়গায় সমস্যা রয়েছে। সেগুলো প্রার্থিতা প্রত্যাহারের আগে সমাধান হয়ে যাবে বলে আশা করছেন।

সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, এখানে যে আসনসংখ্যা জানানো হচ্ছে, তা বৈঠকে উপস্থিত দলগুলোর। উপস্থিত দুটি দলের ক্ষেত্রে আসনসংখ্যা নির্ণয় হয়নি। সে দল দুটি খেলাফত আন্দোলন ও জাগপা।

মঞ্চে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমির ও চরমোনাই পীর মুফতি সৈয়দ মুহাম্মাদ রেজাউল করীমের জন্য চেয়ার রাখা হলেও তিনি বা তাঁর দলের কেউ সেখানে যোগ দেননি। বাকি ১০টি দলের শীর্ষ নেতারা সেখানে উপস্থিত ছিলেন।

আশা করছি তাঁরা থাকবেন: জামায়াত আমির

সংবাদ সম্মেলনে কথা বলেন জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান। বৃহস্পতিবার রাতে রাজধানীর কাকরাইলে ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্সে
ছবি: প্রথম আলো

সংবাদ সম্মেলনে সূচনা বক্তব্য দেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক। এরপর এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, এলডিপির সভাপতি অলি আহমদ, খেলাফত মজলিসের মহাসচিব আহমদ আবদুল কাদের বক্তব্য দেন। সবার শেষে নির্বাচনী ঐক্যের মুখ্য বক্তব্য দেন জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান। সঞ্চালনা করেন ১১ দলের সমন্বয়ক ও জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ। মঞ্চে আরও ছিলেন এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের আমির হাবীবুল্লাহ মিয়াজী, নেজামে ইসলাম পার্টির আমির সরওয়ার কামাল আজিজী, বিডিপির সভাপতি এ কে এম আনোয়ারুল হক, জাগপার জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি ও মুখপাত্র রাশেদ প্রধান প্রমুখ।

সংবাদ সম্মেলন শেষে ১০ দলের শীর্ষ নেতারা হাতে হাত ধরে ওপরে তুলে ধরে ঐক্যের বার্তা দেন। এ সময় উপস্থিত নেতা-কর্মীরা ‘নারায়ে তাকবির, আল্লাহু আকবার’, ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ বলে স্লোগান দেন।

পরে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান বলেন, জোট ভাঙেনি, জোট আছে। কোনো একটা দল যে কারণেই হোক একমত হলো না। এর মানে তো জোট ভাঙা নয়। এটি আসলে জোটও নয়, নির্বাচনী ঐক্য।

ইসলামী আন্দোলনের নাম উল্লেখ না করে জামায়াতের আমির বলেন, ‘একটি দল সূচনায় আমাদের সঙ্গে ছিল, কিন্তু এখানে দেখা যাচ্ছে না। এটা ভাঙনের কোনো ব্যাপার নয়। তাঁরা নিজেদের নিয়ে আরও বোঝাপড়া করছেন। তাঁদের সঙ্গে আমাদের নিয়মিত যোগাযোগ আছে। তাঁরা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানাবেন। আমরা আশা করছি, তাঁরা আমাদের সঙ্গে থাকবেন।’

আজ অবস্থান জানাবে ইসলামী আন্দোলন

গতকাল রাতে জামায়াতসহ ১০টি দল যখন আসন সমঝোতার ঘোষণা দিতে সংবাদ সম্মেলনের প্রস্তুতি নিচ্ছিল, তখন ইসলামী আন্দোলন এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, তারাও ‘নির্বাচনী সমঝোতার বিষয়’ ব্রিফিং করবে। সেটা করবে আজ শুক্রবার বেলা তিনটায় দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে। এতে ইসলামী আন্দোলনের আমির সৈয়দ রেজাউল করীমসহ শীর্ষস্থানীয় নেতারা এতে উপস্থিত থাকবেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ইসলামী আন্দোলনের একজন দায়িত্বশীল নেতা গত রাতে প্রথম আলোকে বলেন, ‘জামায়াতের সঙ্গে আমাদের নির্বাচনী ঐক্যের সম্ভাবনা মোটামুটি নেই বললেই চলে।’

ইসলামপন্থীদের ভোট ‘এক বাক্সে’ নেওয়ার লক্ষ্যে জামায়াত, ইসলামী আন্দোলনসহ শুরুতে ৮টি, পরে ১১টি দল ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল। ইসলামপন্থীদের ভোট এক বাক্সে আনতে ভোটযুদ্ধে নামার আগেই আসনবণ্টন নিয়ে রীতিমতো স্নায়ুযুদ্ধ চলে ১১টি দলে। গত ২৯ ডিসেম্বর মনোনয়নপত্র দাখিলের পর থেকে দফায় দফায় বৈঠক-আলোচনা করেও সমঝোতায় পৌঁছানো যায়নি। বিশেষ করে এক সপ্তাহ ধরে একাধিক দফায় আলোচনা এবং গত বুধবার রাতে টানা বৈঠক হলেও জামায়াত এবং ইসলামী আন্দোলন কোনো চূড়ান্ত সমঝোতায় পৌঁছাতে পারেনি। শেষ পর্যন্ত ইসলামী আন্দোলনকে বাদ রেখেই ১০ দলের সঙ্গে আসন সমঝোতা চূড়ান্ত হয়।

টানাপোড়েন, রাতে ঘুমাননি নেতারা

সংবাদ সম্মেলনে একান্ত আলাপে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক ও জামায়াতে ইসলামির আমির শফিকুর রহমান। বৃহস্পতিবার রাতে
ছবি: প্রথম আলো

১১ দলের নির্বাচনী সমঝোতা প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত একাধিক নেতা প্রথম আলোকে জানান, ইসলামী আন্দোলনের সঙ্গে আসন সমঝোতা নিয়েই মূলত এত টানাপোড়েন চলে। দলটি আনুষ্ঠানিকভাবে ৮০টি আসনে সমঝোতার মাধ্যমে নির্বাচন করতে চেয়েছে। সেটি কমিয়ে ৭০টিতে তারা অনড় অবস্থান নেয়। বিপরীতে জামায়াত তাদের জন্য শুরুতে ৪০টি, পরে ৪৫টিতে গিয়ে স্থির সিদ্ধান্তে পৌঁছায়। এ অবস্থায় সমঝোতার প্রক্রিয়া ভাঙনের মুখে পড়ে।

এমন একটি পরিস্থিতিতে গত বুধবার রাতে জামায়াতের নেতারা ইসলামী আন্দোলনের সঙ্গে মধ্যস্থতার জন্য বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হককে দায়িত্ব দেন। তিনি ঢাকায় অবস্থানরত ইসলামী আন্দোলনের আমির ও চরমোনাই পীর সৈয়দ রেজাউল করীমের সঙ্গে কথা বলেন। বরিশালে থাকা দলটির দ্বিতীয় শীর্ষ নেতা সৈয়দ ফয়জুল করীমের সঙ্গেও কথা বলেন। মামুনুল হকের অনুরোধে তিনি রাত সাড়ে তিনটায় ঢাকায় পৌঁছান। তাঁর জন্য দলের পুরানা পল্টনের কার্যালয়ে নেতারা অপেক্ষায় থাকেন।

অন্য দিকে জামায়াত নির্বাচনী মোর্চার অন্য শরিক ১০টি দল নিয়ে বিকল্প ভাবনা শুরু করে। বুধবার রাতেই তাদের সঙ্গে কথা বলে গতকাল সকালে মগবাজারে জামায়াতের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে দলগুলোর শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে আলোচনায় বসে। সেখানে কোন দলকে কতটি আসনে ছাড় দেওয়া হবে, সেটি চূড়ান্ত হয়। বৈঠকে সবাই একমত হন যে ইসলামী আন্দোলন না এলেও তাঁরা ইসলামপন্থীদের নির্বাচনী ঐক্য অটুট রাখবেন।

জামায়াতের কার্যালয়ে ১০ দলের শীর্ষ নেতাদের বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন এমন একাধিক নেতা জানিয়েছেন, বৈঠকে ইসলামী আন্দোলনের থাকা না থাকা নিয়ে বিশদ আলোচনা হয়েছে। আলোচনায় প্রায় সবাই ঐকমত্য পোষণ করেন যে শুধু আসন সমঝোতা না হওয়ার অসন্তুষ্টি নিয়ে এই নির্বাচনী ঐক্যের অন্যতম উদ্যোক্তা ইসলামী আন্দোলনের ছিটকে যাওয়াটা শোভন হবে না। আলোচনায় ইসলামী আন্দোলনের সঙ্গে মধ্যস্থতার জন্য মাওলানা মামুনুল হককে দায়িত্ব দেওয়া হয়। একই সঙ্গে সম্মানসূচক ইসলামী আন্দোলনের জন্য ৪৭টি আসন ফাঁকা রেখে বাকি ২৫৩ আসনে জামায়াতসহ ১০ দলের প্রার্থীর নাম প্রকাশ করার সিদ্ধান্ত হয়। ইসলামী আন্দোলন শেষ মুহূর্তে নির্বাচনী মোর্চায় যোগ দিলে ওই আসনগুলো পরে ঘোষণার সিদ্ধান্ত হয়।

পরে মূল্যায়নের আশ্বাস দুটি দলকে

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও সংস্কার বাস্তবায়নে গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। সারা দেশে ৩০০ আসনে দলীয় ও স্বতন্ত্র মিলিয়ে মোট ২ হাজার ৫৬৮টি মনোনয়নপত্র জমা পড়ে। ২০ জানুয়ারি মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ সময়। সমঝোতার আলোচনার মধ্যেই জামায়াত ২৭৬টি আসনে এবং ইসলামী আন্দোলন ২৭২টি আসনে প্রার্থী মনোনয়ন দেয়। এ ছাড়া বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ৯৪টি, এনসিপি ৪৭টি, এবি পার্টি ৫৩টি, খেলাফত মজলিস ৬৮টি, এলডিপি ২৪টি আসনে প্রার্থী দিয়েছে।

অন্যদিকে জাগপা ৩টি, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন ১১টি, নেজামে ইসলাম পার্টি ৬টি এবং বিডিপি ২টি আসনে নিজেদের প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র জমা দেয়। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, সমঝোতার পর এসব আসনে জোটের একজন প্রার্থী রেখে অন্যরা প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে নেবেন।

তবে বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন ১১টি আসনে ও জাগপা ৩টি আসনে মনোনয়নপত্র জমা দিলেও তারা নির্বাচন করছে না। জানা গেছে, নির্বাচনী সমঝোতার অংশ হিসেবে দল দুটির নেতাদের অন্যভাবে মূল্যায়ন করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনকে নিয়ে এনসিপির দিক থেকে আপত্তি তোলা হয়েছে যে তারা পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের অধীন ২০২৪ সালের সাজানো নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছে। তারা নির্বাচনী ঐক্যে শরিক থাকতে পারে, প্রার্থী দিতে পারবে না। এ নিয়ে তিক্ততা এড়াতে খেলাফত আন্দোলন প্রার্থী না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। আর জাগপা নিজে থেকেই পরে মূল্যায়নের আশ্বাস পেয়ে প্রার্থী না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।

সব মিলিয়ে ইসলামপন্থীদের ঐক্য গড়ার যে উদ্যোগ ইসলামী আন্দোলনের হাত ধরে শুরু হয়েছিল, সেই উদ্যোগই শেষ পর্যন্ত তাদের বাইরে রেখেই বাস্তব রূপ পেল। ভোটের মাঠে এর প্রভাব কী হবে, তা নিয়ে এখন রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা শুরু হয়েছে।