ইউপি নির্বাচন, গাবতলীতে গুলিতে নিহত ৪
‘এখন মেয়েকে কীভাবে মানুষ করব’
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গুলিতে নিহত চারজনই হতদরিদ্র। তাঁদের বাড়িতে এখন চলছে মাতম।
বগুড়ার গাবতলী উপজেলার বালিয়াদীঘি ইউনিয়নের কালাইহাটা মধ্যপাড়ার রিকশাচালক আলমগীর হোসেন (৪০)। অল্প টাকায় বাসা ভাড়া নিয়ে থাকতেন বগুড়া শহরের কইপাড়া এলাকায়। গত বুধবার ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) নির্বাচনে ভোট দিতে সপরিবার কালাইহাটা গ্রামে যান আলমগীর। ভোট গ্রহণ শেষে ফলাফল জানতে বিকেলে কালাইহাটা হাটখোলা বাজারে যান। সেখানে গিয়ে গুলিতে লাশ হয়ে বাড়ি ফেরেন আলমগীর।
গত বুধবার কালাইহাটা উচ্চবিদ্যালয় কেন্দ্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গুলিতে আলমগীরসহ চারজন নিহত হন। কেন্দ্রে দায়িত্বরত নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও শাজাহানপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আসিফ আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, শান্তিপূর্ণভাবে ভোট গ্রহণ শেষ হলেও নৌকার প্রার্থীর সমর্থকেরা গণনায় বাধা দেন। তাঁরা ভোটকেন্দ্রে হামলা চালান। জানমাল রক্ষার স্বার্থে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা গুলি ছুড়তে বাধ্য হন।
গুলিতে নিহত আলমগীরের বাড়িতে গতকাল দুপুরে গিয়ে দেখা যায়, টিনের বেড়ার ভাঙা ঘরের সামনে একমাত্র কন্যা আদরী খাতুনকে (১২) বুকে জড়িয়ে আহাজারি করছিলেন আলমগীরের স্ত্রী হোসনে আরা বেগম (৩৪)। কান্নাজড়িত কণ্ঠে হোসনে আরা বলেন, ‘আলমগীরের উপার্জনে সংসার চলত। এখন মেয়েকে নিয়ে কোথায় যাব, কীভাবে মানুষ করব? সরকারের কাছে আমার আকুতি, স্বামী হত্যার বিচার চাই।’
হোসনে আরা বলেন, আলমগীর কোনো দলের সমর্থক ছিলেন না। দুপুরের আগেই ভোট দেন আলমগীর। ফলাফল জানতে সন্ধ্যার আগে হাটখোলা বাজারে গেলে গুলিতে মারা যান তিনি।
গুলিতে নিহত আবদুর রশিদ প্রামাণিকের (৬০) বাড়িতেও চলছে মাতম। হতদরিদ্র এই দিনমজুরের স্ত্রী বুলবুলি বেগম (৫০) বলেন, তাঁর স্বামী দিনমজুর। অন্যের কিছু জমি বর্গা নিয়ে চাষাবাদ করেন। কেনাকাটা করতে আবদুর রশিদ বুধবার বিকেলে বাড়ির কাছের হাটখোলা বাজারে যান। বাজার থেকে বাড়ি ফেরার সময় তিনি গুলিবিদ্ধ হন।
কালাইহাটা গ্রামের নিহত খোরশেদ আকন্দের বাড়িতেও চলছে স্বজনদের আহাজারি। ৬৮ বছর বয়সী এই দিনমজুরের লাশ এখনো মর্গে। খোরশেদের বড় ছেলে এরশাদ আকন্দ (৩০) বলেন, দিনমজুরির পাশাপাশি বাবা অন্যের জমি বর্গা নিয়ে চাষাবাদ করতেন। বুধবার বিকেলে খেত থেকে ওঠানো শাক বিক্রি করতে কালাইহাটা হাটখোলা বাজারে যান। শাক বিক্রি করে বাড়িতে ফেরার পথে গুলিতে তিনি ঘটনাস্থলেই মারা যান।
নিহত কুলসুম বেগমের (৫০) পরিবারও হতদরিদ্র। তাঁর স্বামী খোকন মণ্ডল দিনমজুর। তিনি বলেন, কালাইহাটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সংরক্ষিত ওয়ার্ডের সদস্য প্রার্থী জোবেদা বেগমের নির্বাচনী এজেন্ট ছিলেন কুলসুম বেগম। ভোট গণনা নিয়ে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়লে কুলসুম বাড়িতে ফেরার জন্য বের হন। পাকা রাস্তায় ওঠামাত্র গুলিতে কুলসুম সড়কে ঢলে পড়েন। সঙ্গে সঙ্গেই তিনি প্রাণ হারান।
গুলিতে চারজন নিহত হওয়ার পর কালাইহাটা হাটখোলা বাজারে থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। বন্ধ রয়েছে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান।