গণতন্ত্রকে উদ্ধার করাই বড় কাজ

পঙ্কজ ভট্টাচার্য
পঙ্কজ ভট্টাচার্য

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে যে দল গড়ে উঠেছিল এবং মুক্তিযুদ্ধসহ গণমানুষের জন্য দলটির যে অর্জন বা অবদান, তা এখন ধরে রাখাটা কঠিন হয়ে পড়েছে। সেই সামর্থ্য এখন বর্তমান নেতৃত্বের কতটুকু আছে, সেটা বড় প্রশ্ন। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে গোটা জাতি ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল। সেই ঐক্যের চেষ্টা এখন আর দেখা যায় না।

এখনকার সময়ে বড় কাজ হচ্ছে গণতন্ত্রকে উদ্ধার করা। রাষ্ট্রায়ত্ত নির্বাচন নয়, এ দেশের জনগণ ক্ষমতার মালিক, মালিকের নির্বাচন করতে হবে। মালিকের মালিকানা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। সেখানে আওয়ামী লীগের ভূমিকা দেখতে চাই। কারণ, শুরু থেকে ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াই করে আসছে দলটি, সেই ভূমিকাতেই আমরা দলটিকে দেখতে চাই।

আসলে আওয়ামী লীগ শুরু থেকেই সাধারণ মানুষের স্বার্থে লড়াই-সংগ্রাম করেছে। যদিও দলের মধ্যে ধনী, বিত্তবান ও প্রভাবশালী আগেও ছিল। কিন্তু এখন সেই সংখ্যাটা অস্বাভাবিক বেড়েছে। তবে এ কথাও সত্য যে নানা ক্ষেত্রে সরকার ও দলের সাফল্য আছে। অনেক উন্নয়ন হয়েছে। কিন্তু উন্নয়নের হাত ধরে বৈষম্য অগ্রসর হচ্ছে। আওয়ামী লীগের মতো জনসম্পৃক্ত দলকে এখনই এ বিষয়ে সতর্ক হতে হবে। জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্র ও সরকার উপহার দেওয়াটা এই দলের ওপর বর্তায়।

বাংলাদেশে রাজনৈতিক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের অবদান অনস্বীকার্য। বিরোধী দলকে সঙ্গে নিয়ে কাজ করা, বাম প্রগতিশীল শক্তিকে সঙ্গে নিয়ে মুক্তিযুদ্ধ করা এবং জাতীয় ঐক্যের জন্য কাজ করার সেই চেতনা এখন আওয়ামী লীগের মধ্যে অনেকাংশে অনুপস্থিত। মানুষ রাজনৈতিক সহিষ্ণুতা ও উদারতা প্রত্যাশা করে ঐতিহ্যবাহী এই দলের কাছ থেকে। বাক্স্বাধীনতা ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত সাফল্যগুলোর অন্যতম। এগুলো সংকুচিত হচ্ছে, আঘাতপ্রাপ্ত হচ্ছে। আওয়ামী লীগ এসব নিশ্চিত করতে উদ্যোগ নিতে পারে।

জঙ্গিবাদ দমনে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন সরকারের কঠোর অবস্থান সবার সমর্থন পেয়েছে। ক্যাসিনো-বাণিজ্য, দুর্নীতিবিরোধী অভিযান, চাঁদাবাজি ও দখলবাজির বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রীর ভূমিকা প্রশংসনীয়। তবে এসব ঘটনার নেপথ্যে জড়িত রাঘববোয়ালেরা ধরা পড়বে কি না, জনমনে যে সন্দেহ, তা এখনো দূরীভূত হয়নি।

>

ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ২১ তম জাতীয় সম্মেলন আজ। দলের তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত সম্মেলন ঘিরে চলছে নানা আলোচনা। প্রবীণ একজন রাজনীতিবিদের পাশাপাশি সরাসরি রাজনীতিতে জড়িত নন, এমন নাগরিক জানিয়েছেন দলটির কাছে তাঁদের প্রত্যাশার কথা।

সাম্প্রতিক বছরগুলোকে বৈদেশিক নীতির ক্ষেত্রে বেশ কিছু সাফল্য আছে। ভারত, চীন, জাপান, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশ ও সংস্থার নানা সহায়তা পাওয়া যাচ্ছে। যদিও রোহিঙ্গা ইস্যুতে প্রতিবেশীসহ দুটি রাষ্ট্রের আশানুরূপ সাড়া পাওয়া যায়নি।

সাম্প্রতিক সময়ে জাতীয় নাগরিকত্ব আইন ও জাতীয় নাগরিকপঞ্জি নিয়ে ভারতের পদক্ষেপ দুই দেশের সংখ্যাগুরু ও সংখ্যালঘুদের মধ্যে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। এর ফলে দুই দেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের মধ্যে সহজে দেশ ছাড়ার প্রবণতা বাড়তে পারে। লড়াই-সংগ্রাম করে নিজ দেশে মাথা উঁচু করে টিকে থাকার পরিবর্তে সংখ্যালঘুদের মধ্যে সুবিধাবাদী মনোভাব তৈরি হতে পারে। এ ছাড়া মৌলবাদী ও সাম্প্রদায়িক শক্তি নতুন করে তুরুপের তাস হিসেবে সহজেই বাজিমাত করতে পারবে। তাই ধর্মীয় সংখ্যালঘু ও জাতিগত সংখ্যালঘুর অধিকার প্রশ্নে আওয়ামী লীগকে আরও সংবেদনশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।

আরেকটি বিষয় হচ্ছে, ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে সুসম্পর্ক প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে এবং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বিভিন্ন ইস্যুতে বাংলাদেশের অধিকার ও প্রাপ্তির বিষয়ে বিশেষভাবে চেষ্টা করতে হবে।

এই কাউন্সিলের মাধ্যমে আসা দলটির নতুন নেতৃত্ব এসব দিকে আরও নজর দেবে—এই প্রত্যাশা ও শুভ কামনা রইল।

পঙ্কজ ভট্টাচার্য: প্রবীণ রাজনীতিবিদ ও ঐক্য ন্যাপের সভাপতি