আমরা এক অনিশ্চিত সময় পার করছি। পুরোনো চেনা আদর্শগুলো অর্থ হারিয়েছে, অথচ নতুন কোনো দিশা এখনো আমাদের সামনে স্পষ্ট হয়ে ওঠেনি। ২০১১ সালে প্রতিচিন্তা যাত্রা শুরু করেছিল। তখন আমাদের প্রধান অন্বেষণ ছিল প্রথাগত সমাজতন্ত্রের বিপর্যয়-পরবর্তী এক ‘তৃতীয় পথের’ সন্ধান। সে সময় আমরা ঔপনিবেশিক আধুনিকতা ও পুঁজিবাদী নৈতিকতার দ্বন্দ্বে দাঁড়িয়ে একটি মানবিক সমতাবাদের স্বপ্ন দেখেছিলাম। আজ, ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে এসে, সেই মানদণ্ডগুলো কেবল পর্যুদস্তই হয়নি, বরং বিশ্বজুড়ে জ্ঞানচর্চার মানচিত্রটি সম্পূর্ণ বদলে গেছে। আজকের সংকট কেবল অর্থনৈতিক বৈষম্য বা রাজনৈতিক মডেলের ব্যর্থতায় সীমাবদ্ধ নেই; বরং তা সত্যের ধারণা, ইতিহাসের স্মৃতি এবং খোদ মানুষের অস্তিত্বের সংজ্ঞাকেই এক অনভিপ্রেত চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। ফলে নতুন সময়ের প্রতিচিন্তা আর কেবল পুরোনো ক্ষতের প্রলেপ হতে পারে না, একে হতে হবে এক নতুন ও নির্মোহ জ্ঞানকাণ্ডের সূচনাবিন্দু।
বর্তমান বিশ্বপরিস্থিতি বিচার করলে দেখা যায়, গত এক দশকে আমরা তথাকথিত ‘লিবারেল ওয়ার্ল্ড অর্ডার’ বা উদারনৈতিক বিশ্বব্যবস্থার চাক্ষুষ পতন প্রত্যক্ষ করেছি। ফ্রান্সিস ফুকোয়ামার ‘ইতিহাসের পরিসমাপ্তি’র বিপরীতে আজ ইতিহাস ফিরে এসেছে এক ভয়াবহ ও বিকৃত রূপে। বিশ্বজুড়ে আজ যে নয়া-ডানপন্থার উত্থান ঘটেছে, তার চরিত্র নব্বইয়ের দশকের রক্ষণশীলতার চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা। আজকের এই কর্তৃত্ববাদী নয়া-উদারতাবাদ কেবল রাষ্ট্রক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ করে না, বরং তা মানুষের জ্ঞানতাত্ত্বিক জগতের দখল নিতে চায়। আন্তোনিও গ্রামসি যে ‘সাংস্কৃতিক আধিপত্যের’ কথা বলেছিলেন, আজকের বৈশ্বিক শক্তিগুলো সে তত্ত্বকেই প্রযুক্তিনির্ভর ‘ডিসকোর্স’ তৈরির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। তারা মানুষের সম্মিলিত স্মৃতিকে বদলে দেওয়ার এক সূক্ষ্ম অথচ পদ্ধতিগত যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছে। ইতিহাসের মীমাংসিত সত্যগুলোকে বিতর্কিত করে একধরনের ‘পোস্ট-ট্রুথ’ বা সত্য-উত্তর গোলকধাঁধা তৈরি করা হচ্ছে, যেখানে জঁ বদ্রিলারের ভাষায় ‘সিমুলেশন’ বা কৃত্রিম চিত্রই আসল বাস্তবতার চেয়ে বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠছে। এ পরিস্থিতিতে জ্ঞানচর্চার কাজ কেবল তথ্য পরিবেশন নয়, বরং এই সুপরিকল্পিত বিস্মৃতির বিরুদ্ধে স্মৃতির লড়াই জারি রাখা।
তাত্ত্বিকভাবে আমরা এখন এমন এক অন্ধকার কালপর্বে আছি, যা হান্না আরেন্ডট বর্ণিত সেই ‘টোটালিটারিয়ান’ বাস্তবতার ডিজিটাল সংস্করণ। শশানা জুবফের ‘সারভেইল্যান্স ক্যাপিটালিজম’ বা নজরদারি পুঁজিবাদের এই যুগে প্রযুক্তি এখন আর কেবল মুক্তির মাধ্যম নয়, বরং নিয়ন্ত্রণের এক অদৃশ্য জাল। বিশ্বজুড়ে উগ্র জাতীয়তাবাদ ও পরিচয়-রাজনীতির যে বিস্তার আমরা দেখছি, তা আসলে পুঁজিবাদের কাঠামোগত সংকট থেকেই উদ্ভূত—পঙ্কজ মিশ্র যাকে বলেছেন ‘এইজ অব অ্যাঙ্গার’ বা ক্রোধের যুগ। মানুষ যখন তার আর্থসামাজিক নিরাপত্তা হারায়, তখন তাকে বীরত্বপূর্ণ অতীত বা কাল্পনিক শ্রেষ্ঠত্বের মিথ দিয়ে ভুলিয়ে রাখা হয়। বৈশ্বিক ডানপন্থার বৈশিষ্ট্যই হলো যৌক্তিক বিতর্কের বদলে আবেগময় উন্মাদনা আর ইতিহাসের বিকৃতি। এটি আজ বিশ্বের প্রতিটি কোণে বিষবাষ্পের মতো ছড়িয়ে পড়েছে। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোতেও এই প্রবণতা অত্যন্ত স্পষ্ট। উন্নয়নবাদী এক সর্বগ্রাসী বয়ানের আড়ালে নাগরিক স্বাধীনতা ও ভিন্নমতের পরিসর সংকুচিত হচ্ছে, আর সেই শূন্যস্থানে জায়গা করে নিচ্ছে একধরনের প্রতিক্রিয়াশীল চিন্তাকাঠামো।
এই পটভূমিতে প্রতিচিন্তার নতুন যাত্রায় আমাদের তাকাতে হবে এক বহুমাত্রিক দিগন্তের দিকে। আমাদের জ্ঞানচর্চাকে এখন কেবল দেশীয় রাজনীতির সংকীর্ণ বৃত্তে আটকে রাখলে চলবে না। আইন, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, সুশাসন, পরিবেশ ও অর্থনীতির মতো ক্ষেত্রগুলোতে যে আমূল পরিবর্তন আসছে, তাকে বৈশ্বিক তাত্ত্বিক বিতর্কের আলোকে বিচার করতে হবে। আইন আজ আর কেবল বিচারিক প্রক্রিয়া নয়, বরং তা ক্ষমতার এক কৌশলগত হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে আমরা দেখছি এক ‘মাল্টি-পোলার’ বা বহুমুখী বিশ্বের লড়াই, যেখানে স্নায়ুযুদ্ধের পুরোনো সমীকরণগুলো আর কাজ করছে না। বৈশ্বিক পরিবর্তনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ সুশাসনের লক্ষ্যে রাষ্ট্রের প্রয়োজনীয় সংস্কারের প্রচেষ্টা বারবার হোঁচট খেয়েছে। অন্যদিকে পরিবেশ আজ আর কোনো আলাদা ‘ইস্যু’ নয়, বরং মানুষের টিকে থাকার অস্তিত্ববাদী সংকট। ব্রুনো লাতুর বা ডোনা হারাওয়ের মতো চিন্তকেরা যেভাবে মানুষ ও প্রকৃতির সম্পর্ককে নতুনভাবে দেখার প্রস্তাব দিয়েছেন, তাকে আমাদের স্থানীয় পটভূমিতে আত্মস্থ করতে হবে। নিউ লিবারেল অর্থনীতি-সৃষ্ট বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশ বিপর্যয়ের এই মহাপ্রলয়ের যুগে আমাদের অর্থনীতির মডেল কী হবে, তা নিয়ে নতুন বিতর্কের সূচনা করা আজ সময়ের দাবি।
অর্থনীতির ক্ষেত্রে আমরা দেখেছি, কীভাবে বাজারমুখীন প্রবৃদ্ধি শেষ পর্যন্ত এক ভয়াবহ সম্পদ-বৈষম্য ও সামাজিক অস্থিরতার জন্ম দেয়। টমাস পিকেটির দেখানো বৈষম্যের চিত্র আজ বিশ্বব্যাপী এক স্বীকৃত সত্য। কিন্তু কেবল এই পরিসংখ্যান জানাই যথেষ্ট নয়, আমাদের দরকার এমন এক অর্থনৈতিক দর্শন, যা প্রবৃদ্ধির মোহের বাইরে গিয়ে মানুষের মর্যাদা ও ন্যায়বিচারকে কেন্দ্রবিন্দুতে স্থাপন করবে। বাংলাদেশের গত কয়েক দশকের উন্নয়ন-অভিজ্ঞতাকে এখন আর কেবল জিডিপি বা মাথাপিছু আয়ের সূচক দিয়ে বিচার করা সম্ভব নয়। এখানে যে ‘অনুপার্জিত আয়ের’ পাহাড় তৈরি হয়েছে এবং এর ফলে যে সামাজিক নৈতিকতার অবক্ষয় ঘটেছে, তার ব্যবচ্ছেদ প্রয়োজন। প্রতিচিন্তায় তাই এমন সব লেখাকে আমরা উৎসাহিত করতে চাই, যা প্রচলিত উন্নয়ন-মডেলের তাত্ত্বিক সীমাবদ্ধতাগুলো উন্মোচন করবে এবং একটি মানবিক সমতাবাদের প্রায় অসম্ভব প্রস্তাবকে সম্ভব করে তোলার বৌদ্ধিক রসদ জোগাবে।
সাহিত্যের ক্ষেত্রেও আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি হতে হবে প্রথাবিরোধী। সাহিত্য কেবল জীবনের দর্পণ নয়, বরং তা প্রতিবাদের এক নান্দনিক ভাষা। যখন চারপাশের জগৎ মিথ্যা আর বিকৃতির আবরণে ঢাকা পড়ে যায়, তখন সাহিত্যই পারে সত্যের জগৎ সমুন্নত করতে। হেনরি জেমস বলেছিলেন, একটু সাহিত্য রচনার জন্য প্রয়োজন বিপুল ইতিহাসের জ্ঞান। আর সে প্রস্তুতি থাকলেই সম্ভব মিথ্যা ও বিকৃত ইতিহাসের বিরুদ্ধে লড়াই করা। মিশেল ফুকো ক্ষমতার যে অস্তিত্বের কথা বলেছিলেন, তার বিপরীতে প্রতিরোধের সবচেয়ে বড় কেন্দ্র হতে পারে সৃজনশীল জ্ঞানচর্চা। আমরা চাই এমন এক সাহিত্য সমালোচনা ও সৃজনশীল চর্চা, যা আমাদের স্বদেশি ঐতিহ্যকে ধারণ করবে কিন্তু বৈশ্বিক আধুনিকতার সঙ্গে তার এক নিরন্তর সংলাপ জারি রাখবে। বুদ্ধিবৃত্তিক সাহস কিংবা প্রথাবিরোধী চেতনার যে উত্তরাধিকার আমাদের আছে, তাকে একবিংশ শতাব্দীর জটিল বাস্তবতায় নতুন করে আবিষ্কার করতে হবে। প্রতিচিন্তা হবে এমন এক মঞ্চ, যেখানে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের জটিল তত্ত্ব থেকে শুরু করে প্রান্তিক মানুষের বেঁচে থাকার লড়াই—সবই এক সূত্রে গাঁথা হবে। আমরা বিশ্বাস করি, আজকের এই বৈশ্বিক ও জাতীয় সংকটের দিনে কেবল বিচ্ছিন্ন পাণ্ডিত্য দিয়ে মুক্তি আসবে না; দরকার এক সমষ্টিগত সাহস ও বৌদ্ধিক সংহতি।
বাংলাদেশের পটভূমিতে প্রতিচিন্তার গুরুত্ব অপরিসীম। আমরা এমন এক মোড়বিন্দুতে দাঁড়িয়ে আছি, যেখানে আমাদের রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক পরিচয় নতুন করে সংজ্ঞায়িত হচ্ছে। ইতিহাসের পাতা যারা ছিঁড়ে ফেলতে চায় কিংবা যারা মানুষের স্মৃতিকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায়, তাদের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অস্ত্র হলো নির্মোহ জ্ঞানচর্চা। উন্নয়নবাদী বয়ানের আড়ালে হারিয়ে যাওয়া মানবাধিকারের প্রশ্নটি আমাদের আবারও সামনে আনতে হবে। এই সামগ্রিক লড়াইয়ের নামই হলো প্রতিচিন্তা।
আমাদের আকাঙ্ক্ষা আমাদের সামর্থ্যকে ছাড়িয়ে যায়, এটি সত্য। কিন্তু এই মোহভঙ্গের যুগে নতুন করে স্বপ্ন দেখার সাহসটুকুই আমাদের একমাত্র পুঁজি। আমরা ‘শুরুর বিন্দু’তে ফিরে যেতে চাই, যেখানে এক শোষণমুক্ত, মানবিক ও যুক্তিনির্ভর সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে একদা আমাদের পূর্বপুরুষদের যাত্রা শুরু হয়েছিল। তবে এবারের যাত্রা পুরোনো কোনো ইশতেহারের অন্ধ অনুসরণ নয়, বরং একবিংশ শতাব্দীর জ্ঞানতাত্ত্বিক জটিলতাকে স্বীকার করে নিয়ে নতুন এক মানবিক ঐক্যের রূপরেখা অঙ্কন। প্রতিচিন্তার এই নতুন যাত্রায় আমরা আমন্ত্রণ জানাই সেসব মানুষকে, যাঁরা প্রচলিত স্রোতের বিপরীতে দাঁড়িয়ে চিন্তা করার সাহস রাখেন, যাঁরা ইতিহাসের বিকৃতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে প্রস্তুত এবং যাঁরা এক বহুত্ববাদী ও ন্যায়বিচারকামী জগতের স্বপ্ন দেখেন। এই অন্বেষণ কোনো বিমূর্ত দার্শনিক কল্পনা নয়, বরং আমাদের ভূখণ্ডের মানুষের দৈনন্দিনের সংগ্রাম ও বৌদ্ধিক অনুশীলনের এক সমন্বিত প্রয়াস। বাংলাদেশের পটভূমিতে আমাদের এই ভিন্ন পথ খোঁজার অভিযাত্রাই হোক আগামী দিনের প্রতিচিন্তার মূল প্রেরণা।