পাপ ক্ষমার সর্বোত্তম মাস হলো রমজান। হজরত আবু সাঈদ খুদরি (রা.) বর্ণনা করেন, মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন, ‘যে বান্দা খোদার পথে এক দিন রোজা রাখে, আল্লাহতায়ালা তার চেহারা থেকে আগুনকে দূরে সরিয়ে দেন’ (সহিহ মুসলিম)। একবার মহানবী (সা.) বললেন, ‘ফেরেশতা রোজাদারের জন্য দিন-রাত ইস্তিগফার করতে থাকে’ (মাজমাউজ যাওয়ায়েদ)।

এ ছাড়া হাদিসে এ বিষয়ে আরও বর্ণিত হয়েছে যে হজরত আবদুর রহমান বিন আওফ (রা.) বর্ণনা করেন, হজরত মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি রমজান মাসে ইমানের সঙ্গে সওয়াব এবং এখলাসের সঙ্গে ইবাদত করে, সে নিজ গুনাহ থেকে এভাবে পবিত্র হয়ে যায়, যেভাবে সেদিন সে তার মাতৃগর্ভ থেকে জন্ম লাভ করেছিল’ (সুনানে নিশাই, কিতাবুস সাওম)। ‘যে ব্যক্তি ইমানের সহিত সওয়াবের নিয়তে শবে কদরে ইবাদত করবে, তার অতীতের সব গুনাহ মাফ করে দেওয়া হবে’ (বুখারি ও মুসলিম)।

রমজানের দিনগুলোতে আমরা যদি একান্তই আল্লাহর জন্য রোজা রাখি এবং নিজের দোষ-ত্রুটির ক্ষমা চাই, তাহলে তিনি ক্ষমা করবেন, শুধু ক্ষমাই করবেন না, বরং আমাদের পূর্বেকার সব পাপও ক্ষমা করবেন বলে আমাদের আশ্বাস দিয়েছেন। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘তিন ব্যক্তির দোয়া বাতিল করা হয় না, তাদের একজন হলো সিয়াম পালনকারী, যতক্ষণ না সে ইফতার করছে’ (তিরমিজি, দোয়া অধ্যায়, হাদিস নম্বর-৩৫৯৮)।

হজরত আবু সাঈদ খুদরি (রা.) বর্ণনা করেন, হুজুর (সা.) বলেছেন, ‘যখন কেউ রমজানের প্রথম দিন রোজা রাখে, তখন তার পূর্বেকার সব গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হয়। এমনিভাবে রমজান মাসের সব দিন চলতে থাকে এবং প্রতিদিন তার জন্য সত্তর হাজার ফেরেশতা সকালের নামাজ থেকে শুরু করে তাদের পর্দার অন্তরালে যাওয়ার আগপর্যন্ত তার ক্ষমার জন্য দোয়া করতে থাকে’ (কানজুল উম্মাল, কিতাবুস সাওম)। হজরত উম্মে সালমা (রা.) বর্ণনা করেন, নবী করিম (সা.) বলেন, ‘রজব আল্লাহর মাস, শাবান আমার মাস, রমজান আমার উম্মতের মাস।’ রাসুল (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি ইমানের সঙ্গে সওয়াবের নিয়তে রমজান মাসে রোজা রাখবে, তার অতীতের সব গুনাহ মাফ করে দেওয়া হবে।’

রমজানে পাঁচ ওয়াক্ত ফরজ নামাজ অবশ্যই মসজিদে জামাতে পড়ার চেষ্টা করতে হবে। তারাবিহর নামাজ জামাতে পড়ার জন্য যথাসময়ে মসজিদে যাওয়ার পূর্বপ্রস্তুতি থাকতে হবে। খতমে তারাবিহ পড়া সবচেয়ে উত্তম। ইবাদতের সময়ের সঙ্গে মিলিয়ে কাজকর্মের রুটিন পরিবর্তন করে পুনর্নির্ধারণ করতে হবে। রমজানের পাঁচটি সুন্নত পালনে সচেষ্ট থাকতে হবে। যথা: ১. সাহ্‌রি খাওয়া, ২. ইফতার করা, ৩. তারাবিহর নামাজ পড়া, ৪. কোরআন তিলাওয়াত করা ও ৫. ইতিকাফ করা। যাঁরা কোরআন তিলাওয়াত জানেন না, তাঁরা শেখার চেষ্টা করবেন। যাঁরা তিলাওয়াত জানেন, তাঁরা শুদ্ধ করে তিলাওয়াত করার চেষ্টা করবেন। যাঁরা বিশুদ্ধ তিলাওয়াত জানেন, তাঁরা অর্থ বোঝার চেষ্টা করবেন। যাঁরা তরজমা জানেন, তাঁরা তফসির অধ্যয়ন করবেন।

রমজানের বিশেষ তিনটি আমল হলো: ১. কম খাওয়া, ২. কম ঘুমানো ও ৩. কম কথা বলা। হারাম থেকে বেঁচে থাকা; চোখের হেফাজত করা, কানের হেফাজত করা, জবানের হেফাজত করা।

রমজানের অতীব গুরুত্বপূর্ণ একটি সুন্নত হলো ইতিকাফ। রমজানের শেষ দশক ইতিকাফ করা সুন্নতে মুআক্কাহ কিফায়া। এর কম সময় ইতিকাফ করলে তা নফল হিসেবেই গণ্য হবে। পুরুষেরা মসজিদে ইতিকাফ করবেন। নারীরাও নিজ নিজ ঘরে নির্দিষ্ট কক্ষে ইতিকাফ করতে পারবেন।

তাকওয়া অর্জনই রমজানের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে বলেছেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমাদের প্রতি রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেরূপ ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের প্রতি; আশা করা যায় যে তোমরা তাকওয়া অর্জন করবে’ (সুরা বাকারার ১৮৩ নম্বর আয়াত)।

রমজান হলো তাকওয়ার প্রশিক্ষণ। লক্ষ্য হলো রমজানের বাইরের বাকি এগারো মাস রমজানের মতো পালন করার সামর্থ্য অর্জন করা, দেহকে হারাম খাদ্য গ্রহণ ও হারাম কর্ম থেকে বিরত রাখা এবং মনকে অপবিত্র চিন্তাভাবনা, হারাম কল্পনা ও পরিকল্পনা থেকে পবিত্র রাখা। যে ব্যক্তি রোজার হেফাজত করে এবং পরিপূর্ণ শর্ত সাপেক্ষে রোজা রাখে আর এ দিনগুলো ইবাদতে রঙিন করে, তার জন্যই কেবল এই রোজা শয়তানি শক্তির মোকাবিলায় ঢাল হিসেবে কাজ করবে।

ফেরদৌস ফয়সাল: প্রথম আলোর হজ প্রতিবেদক
afef78@gmail.com

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য করুন