ইসলামের প্রথম বাহ্যিক ইবাদত হলো নামাজ। নামাজ বিষয়ে পবিত্র কোরআনে নির্দেশনা রয়েছে ৮২ বার। নামাজের উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর স্মরণ। আল্লাহ তাআলা কোরআন কারিমে বলেন, ‘আর তোমরা আমার স্মরণোদ্দেশ্যে নামাজ কায়েম করো।’ (সুরা-২০ তহা, আয়াত: ১৪)। নামাজ ইসলামের মূল পঞ্চস্তম্ভের অন্যতম। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘ইসলাম পাঁচটি খুঁটির ওপর প্রতিষ্ঠিত। এই সাক্ষ্য দেওয়া যে আল্লাহ ছাড়া কোনো মাবুদ নাই এবং হজরত মুহাম্মদ (সা.) আল্লাহর রাসুল, নামাজ কায়েম করা, জাকাত প্রদান করা, হজ করা ও রমজান মাসে রোজা পালন করা।’ (বুখারি শরিফ, প্রথম খণ্ড, ইমান অধ্যায়, পৃষ্ঠা: ১৬, হাদিস: ৭)।

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয় নামাজ অশ্লীল ও মন্দ কর্ম থেকে বিরত রাখে।’ (সুরা-২৯ আনকাবুত, আয়াত: ৪৫)। হাদিস শরিফে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘হুজুরে কলব (হৃদয়ের উপস্থিতি) ব্যতীত নামাজ প্রকৃত নামাজ হয় না।’ (ফিকহুর রিজা)। হুজুর অর্থ উপস্থিতি, হাজির অর্থ উপস্থিত, কলব মানে দিল, হৃদয়, মন। সফল মুমিনদের পরিচয় পবিত্র কোরআনে এভাবে এসেছে, ‘ওই সকল বিশ্বাসীগণ সফল, যারা তাদের নামাজে আল্লাহর ভয়ে ভীত হয়।’ (সুরা-২৩ মুমিনুন, আয়াত: ১-২)।

প্রিয় নবীজি (সা.)–এর মিরাজে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ চূড়ান্তভাবে ফরজ হয়েছিল। নামাজ মুমিনের মিরাজ। নামাজে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে মিরাজে আল্লাহর সঙ্গে রাসুলুল্লাহ (সা.)–এর সংলাপের বিশেষ অংশ ‘তাশাহহুদ’ বা আত্তাহিয়্যাতু। নবী করিম (সা.) আল্লাহর কুদরতি দরবারে আরশে আজিমে উপস্থিত হয়ে বললেন, ‘আমার সকল মৌখিক ইবাদত, সকল শারীরিক ইবাদত ও সকল আর্থিক ইবাদত আল্লাহ তাআলার জন্য।’ উত্তরে আল্লাহ তাআলা বললেন, ‘হে নবী (সা.)! আপনার প্রতি সালাম বা শান্তি বর্ষিত হোক এবং আল্লাহর রহমত, দয়া, করুণা ও তাঁর বরকত অবতীর্ণ হোক।’ প্রতি উত্তরে রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, ‘আমাদের প্রতি শান্তি বর্ষিত হোক এবং আল্লাহর নেক বান্দাদের প্রতি।’ এটা শুনে ফেরেশতারা বললেন, ‘আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি যে এক আল্লাহ ছাড়া আর দ্বিতীয় কোনো মাবুদ বা উপাস্য নাই, আমরা আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি নিশ্চয়ই হজরত মুহাম্মদ (সা.) আল্লাহর প্রিয় বান্দা ও রাসুল।’ (মুসলিম শরিফ)।

নামাজের মধ্যে পবিত্র কোরআনের অংশবিশেষ তিলাওয়াত করা অন্যতম প্রধান ফরজ। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা পাঠ করো কোরআন থেকে যা তোমাদের জন্য সহজ হয়।’ (সুরা-৭৩ মুয্যাম্মিল, আয়াত: ২০)। সুরা ফাতিহা হলো ‘উম্মুল কোরআন’ বা কোরআনের জননী। নামাজে সুরা ফাতিহা পাঠ করা বিশেষভাবে ওয়াজিব।

কোরআন হলো আল্লাহর কালাম, কালাম অর্থ কথা। কোরআন তিলাওয়াত করা মানে আল্লাহর সঙ্গে কথা বলা। নামাজে কোরআন তিলাওয়াত হলো আল্লাহর সঙ্গে আনুষ্ঠানিক কথাবার্তা বলা। আল্লাহ তাআলা বান্দার প্রত্যেক প্রশ্নের জবাব দেন, প্রতিটি আহ্বানে সাড়া দেন, সকল আবেদন মঞ্জুর করেন, সব দোয়া কবুল করেন। (মিশকাত শরিফ)।

সুরা ফাতিহায় আমরা যখন বলি, ‘আলহামদু লিল্লাহি রাব্বিল আলামিন (সকল প্রশংসা বিশ্বজগতের প্রভু আল্লাহর জন্যই)’ তখন আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হামিদা নি, আবদি (আমার বান্দা আমার প্রশংসা করল)।’ অতঃপর আমরা যখন বলি ‘আর রাহমানির রাহিম (তিনি পরম করুণাময় অতি দয়ালু)’ তখন আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আছনা আলাইয়া আবদি (আমার বান্দা আমার বিশেষ প্রশংসা করল)।’ এরপর যখন আমরা বলি, ‘মালিকি ইয়াওমিদ্দিন (তিনি বিচারদিনের মালিক)’ তখন আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘মাজ্জাদানি আবদি (আমার বান্দা আমাকে সম্মানিত করল)’। এরপর আমরা যখন বলি, ‘ইয়্যাকা নাবুদু ওয়া ইয়্যাকা নাস্তায়িন (শুধু আপনারই ইবাদত করি আর শুধু আপনার কাছেই সাহায্য চাই)’ তখন আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হাজা বাইনি ওয়া বাইনা আবদি (এই ফয়সালাই হলো আমার ও আমার বান্দার মাঝে—বান্দা আমার ইবাদত ও আনুগত্য করবে, আমি তাকে সাহায্য–সহযোগিতা করব)।’ আমরা যখন বলি, ‘ইহদিনাছ ছিরাতল মুস্তাকিম, ছিরাতল্লাজিনা আনআমতা আলাইহিম, গয়রিল মাগদুবি আলাইহিম ওয়ালাদ্দল্লিন! (আমাদের সঠিক পথ দেখান, তাদের পথ যাদের আপনি নিয়ামত দিয়েছেন; তাদের পথ নয় যারা পথভ্রষ্ট; আর না যারা অভিশপ্ত)।’ তখন আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘লিআবদি মা ছাআল (আমার বান্দা যা চায়, তার জন্য তা-ই)।’

বিখ্যাত হাদিসে জিবরাইলে উল্লেখ রয়েছে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘এভাবে ইবাদত করো যে যেন তুমি তাঁকে (আল্লাহকে) দেখতে পাচ্ছ; যদি তুমি তাঁকে দেখতে না-ও পাও, তবে নিশ্চয় তিনি তোমাকে দেখছেন।’ (মুত্তাফাকুন আলাইহি; বুখারি শরিফ, প্রথম খণ্ড, ইমান অধ্যায়, পৃষ্ঠা: ৩৮, হাদিস: ৪৮)।

শাঈখ মুহাম্মাদ উছমান গনী: বাংলাদেশ জাতীয় ইমাম সমিতির যুগ্ম মহাসচিব ও আহ্ছানিয়া ইনস্টিটিউট অব সুফিজমের সহকারী অধ্যাপক
[email protected]

বিজ্ঞাপন
ধর্ম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন