default-image

মাহে রমজানে যে বছর মদিনায় প্রথম সিয়াম পালিত হয়, সেই দ্বিতীয় হিজরি সালের ১৭ রমজান, মাগফিরাতের সপ্তম দিন মোতাবেক ৬২৪ খ্রিষ্টাব্দের ১৭ মার্চ ইসলামের ইতিহাসের প্রথম আত্মরক্ষামূলক সশস্ত্র যুদ্ধ ‘গায্ওয়ায়ে বদরে’ ইসলামের বিজয় পতাকা উড্ডীন হয়েছিল বলে এ দিবসটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইসলামের ইতিহাসে ‘বদরের যুদ্ধ’ বিশেষভাবে স্মরণীয়। ওই যুদ্ধে মুসলমানদের ‘চূড়ান্ত মীমাংসা’ হয়েছিল। আজ থেকে ১৩৯১ বছর আগে ১৭ রোজার দিনে ৩১৩ জন পদাতিক মুসলমানের দল তৎকালীন রণকৌশলে পারদর্শী অস্ত্রশস্ত্রে সুসজ্জিত কাফের বাহিনীর সঙ্গে অসম যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়ে ইসলামের বিজয় ছিনিয়ে আনে। এ সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন, ‘বদরের যুদ্ধে যখন তোমরা হীনবল ছিলে, আল্লাহ তো তোমাদের সাহায্য করেছিলেন। সুতরাং তোমরা আল্লাহকে ভয় করো, যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো।’ (সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ১২৩)
মক্কার কুরাইশরা যখন দেখল যে নবী করিম (সা.) মদিনায় হিজরত করে তথায় পৌত্তলিক, ইহুদি, খ্রিষ্টান ও মুসলমানদের সমন্বয়ে পৃথিবীর প্রথম লিখিত শাসনতন্ত্র ‘মদিনা সনদ’-এর ভিত্তিতে শান্তিপূর্ণ ইসলামি রাষ্ট্র গঠন করলেন এবং জাতি-ধর্ম-বর্ণ-গোত্র-দলমতনির্বিশেষে তাঁর নেতৃত্বে মদিনাবাসী বিনা প্রতিবন্ধকতায় নিঃশঙ্ক জীবন যাপন করছিলেন এবং ইসলামের মর্মবাণী ধীরে ধীরে আরব উপদ্বীপ ছেড়ে বহির্বিশ্বে প্রচারিত হচ্ছিল, তখন মক্কার কাফের সম্প্রদায় ও মদিনার ষড়যন্ত্রকারী মুনাফিকেরা চক্রান্ত করে নবী করিম (সা.) ও ইসলামকে দুনিয়ার বুক থেকে চিরতরে উৎখাত করে দেওয়ার মানসে যুদ্ধের জন্য রণপ্রস্তুতি গ্রহণ করে। একদল কুরাইশ ব্যবসায়ী আবু সুফিয়ানের নেতৃত্বে যুদ্ধাস্ত্র কিনে মদিনা হয়ে সিরিয়া থেকে মক্কায় ফিরছিল। পথে সরঞ্জামাদি হারানোর আশঙ্কায় মক্কায় বিপৎসংকেত পাঠানো হয়। তখনই কুরাইশ নেতা আবু জেহেল এক হাজার অশ্বারোহী সশস্ত্র যোদ্ধাসহ মদিনা অভিমুখে ছুটে আসেন। এ সংবাদ জানতে পেয়ে মহানবী (সা.) রোজাদার সাহাবিদের সঙ্গে পরামর্শ সভায় বসলেন।
সাহাবায়ে কিরামের সুদৃঢ় ইমানি চেতনা ও ইস্পাত কঠিন মনোবল দেখে নবী করিম (সা.) অত্যন্ত খুশি হলেন। আবু জেহেলের রণযাত্রার খবর শুনে দ্বিতীয় হিজরির রমজান মাসের ১২ তারিখে নিখিল বিশ্বের ত্রাণকর্তা স্বয়ং সেনাপতি রাসুলুল্লাহও (সা.) প্রাণোৎসর্গে প্রস্তুত ৬০ জন মুহাজির ও ২৫৩ জন আনসারসহ মোট ৩১৩ জন সাহাবি সঙ্গে নিয়ে শত্রু বাহিনীকে বাধা প্রদান ও দেশের সার্বভৌমত্ব সুরক্ষার জন্য মদিনা থেকে যাত্রা শুরু করে ৮০ মাইল দূরে বদর প্রান্তরে উপস্থিত হলেন। মুসলমানদের অস্ত্র মাত্র তিনটি ঘোড়া, ৭০টি উট, ছয়টি বর্ম ও আটটি তলোয়ার হলেও বিজয়লাভের প্রধান উপকরণ ছিল ইমানের বল; অস্ত্রবল ও সংখ্যা নয়। নবী করিম (সা.) মুসলমানদের জিহাদ সম্বন্ধে উপদেশ ও উৎসাহ প্রদান করলেন। যুদ্ধে জয়লাভ করা সংখ্যা, অস্ত্রশস্ত্র ও সরঞ্জামাদির আধিক্যের ওপর নির্ভর করে না; বরং মহাপরীক্ষার সময় আল্লাহর প্রতি অটল বিশ্বাস রেখে ধৈর্য অবলম্বন করা এবং অটল থাকাই জয়লাভের উপায়—এ কথাগুলো তিনি উত্তমরূপে সাহাবিদের হৃদয়ঙ্গম করিয়ে দিলেন।
তিনি বদর প্রান্তরে আল্লাহর দরবারে ফরিয়াদ করেছিলেন, তাঁর দোয়া কবুল করে আল্লাহ তাআলা বদর যুদ্ধে ফেরেশতা দিয়ে মুজাহিদদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সাহায্য করেছিলেন। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘যখন তুমি মুমিনদের বলছিলে, “এটা কি তোমাদের জন্য যথেষ্ট নয় যে তোমাদের প্রতিপালক প্রেরিত তিন সহস্র ফেরেশতা দ্বারা তোমাদের সহায়তা করবেন?” হ্যাঁ, নিশ্চয়ই যদি তোমরা ধৈর্যধারণ করো এবং সাবধান হয়ে চলো, তবে তারা দ্রুতগতিতে তোমাদের ওপর আক্রমণ করলে আল্লাহ পাঁচ সহস্র চিহ্নিত ফেরেশতা দ্বারা তোমাদের সাহায্য করবেন।’ (সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ১২৪-১২৫)
আরবের তৎকালীন প্রথাগত যুদ্ধরীতি অনুযায়ী প্রথমে সংঘটিত মল্লযুদ্ধে মুসলিম বীরযোদ্ধাদের হাতে কাফের বাহিনী পরাজিত হয়। এরপর হক ও বাতিলের, নূর ও জুলুমাতের, ইসলাম ও কুফুরের উভয় বাহিনী পরস্পর সম্মুখীন। দুই পক্ষের তুমুল যুদ্ধে মুসলিম বাহিনী বীরবিক্রমে লড়াই করে ইসলামের বিজয় কেতন ছিনিয়ে আনেন। বদর যুদ্ধের প্রাক্কালে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছিলেন, ‘আজ যে ব্যক্তি কাফিরদের বিরুদ্ধে ধৈর্যের সঙ্গে সওয়াবের প্রত্যাশায় যুদ্ধ করবে, শহীদ হবে, আল্লাহ তাকে জান্নাত দান করবেন।’ (বায়হাকি) এমন আশ্বাসবাণী পেয়ে হক ও বাতিলের লড়াইয়ে স্বল্পসংখ্যক মুসলমান জানবাজি রেখে কাফেরদের মোকাবিলায় জয়লাভ করেছিলেন। বদর যুদ্ধে ৭০ জন কাফের নিহত ও ৭০ জন বন্দী হয়। অন্যদিকে মাত্র ১৪ জন মুসলিম বীর সেনা শহীদ হন; কাফেরদের বহু অস্ত্র ও রসদপত্র মুসলমানদের হস্তগত হলো।
দেশের সার্বভৌমত্ব অর্জন ও স্বদেশ রক্ষায় জীবনদানকে মহানবী (সা.) শাহাদতের সম্মানজনক মর্যাদা দিয়েছেন। পবিত্র কোরআনে শহীদদের মর্যাদা ঘোষণা করে বলা হয়েছে, ‘যারা আল্লাহর পথে নিহত হয়েছে, তাদের কখনোই মৃত মনে কোরো না, বরং তারা জীবিত ও তাদের প্রতিপালকের কাছ থেকে জীবিকাপ্রাপ্ত।’ (সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৬৯) আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠার জন্য ও মাতৃভূমি সুরক্ষার জন্য যাঁরা আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করেন, তাঁদের সম্পর্কে ইরশাদ হয়েছে, ‘আল্লাহর পথে যারা নিহত হয়, তাদের মৃত বোলো না, তারা জীবিত; কিন্তু তোমরা তা উপলব্ধি করতে পারো না।’ (সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ১৫৪) বদরের যুদ্ধে নিহত শহীদদের সম্পর্কে লোকেরা যখন বলাবলি করছিল যে ‘অমুকের ইন্তেকাল হয়েছে, সে পার্থিব সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য থেকে বঞ্চিত হয়েছে’ তখন তাদের মন্তব্যের জবাবে এ আয়াত অবতীর্ণ হয়।
১৭ রমজান বদর যুদ্ধ থেকেই আরম্ভ হয় ইসলামের মহাজয় যাত্রা। তওহিদ ও ইমান যে এক অজেয় শক্তি, এর সামনে যে দুনিয়ার সব শক্তিই মাথা নত করতে বাধ্য, এ কথা মুসলমানরা পূর্ণভাবে উপলব্ধি করতে পারলেন। সত্যাসত্যের পার্থক্য দিবা ভাস্করসম উজ্জ্বলরূপে মানব হৃদয়ে উদ্ভাসিত হয়ে উঠল। বস্তুত, বদর যুদ্ধ ছিল ইমানের মহাপরীক্ষা। এতে রোজাদার সাহাবিরা যেভাবে কৃতিত্বের সঙ্গে সফলকাম হতে সক্ষম হয়েছেন, জগতের ইতিহাসে তার তুলনা নেই। সাফল্যের অপূর্ব বিজয়গাথা ইসলামের ত্যাগের শিক্ষায় সত্য ও ন্যায়ের পথে মুসলমানদের যুগ যুগ ধরে প্রাণশক্তি জুগিয়ে আসছে।
ড. মুহাম্মদ আবদুল মুনিম খান: বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক, গবেষক ও কলাম লেখক।
dr.munimkhan@yahoo.com

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0