আন্তধর্মীয় সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে জীবনধারণ

বুদ্ধের মূর্তি, হংকংছবি: পেক্সেলস

শুভ বুদ্ধপূর্ণিমা বিশ্ববৌদ্ধদের শ্রেষ্ঠ ধর্মীয় উৎসব। বৈশাখী পূর্ণিমার বিশাখা নক্ষত্রে রাজকুমার সিদ্ধার্থ রূপে কপিলাবস্তুর লুম্বিনী কাননে জন্ম গ্রহণ করেছিলেন ভগবান বুদ্ধ। এই একই তিথিতে তিনি বোধিজ্ঞান লাভ করে ‘বুদ্ধ’ হয়েছিলেন এবং মহাপরিনির্বাণ লাভ করেছিলেন। বুদ্ধের জীবনের এই পবিত্র ত্রি-স্মৃতি বিজড়িত দিনটি বৌদ্ধদের কাছে অতি গৌরবের।

বুদ্ধপূর্ণিমার আলোকে কীভাবে শান্তি ও সম্প্রীতিতে বসবাস করা যায়, সে বিষয়েই আজকের আলোচনা।

শুধু বিশেষ আকার বা কাঠামোর জন্য মানুষ হিসেবে কেউ বিবেচিত হয় না। মানুষের বুদ্ধিবৃত্তি নামক বিশেষ একটি গুণ রয়েছে, যার ধর্ম হলো বিচারিক ক্ষমতা বা মূল্যায়ন। আড়াই হাজার বছর আগে বুদ্ধ সব জীবের স্বাধীন অবস্থানের দাবি করেছিলেন। তাঁর মৈত্রীভাব শুধু মানুষের জন্য নয়, বরং দৃশ্যমান ও অদৃশ্য সকল প্রাণীর জন্যই ছিল।

তিনি বলেছিলেন, ‘সব্বে সত্ত্বা সুখিতা হোন্তু’ অর্থাৎ জগতের সকল প্রাণী সুখী হোক। প্রাজ্ঞরা স্বীকার করেন যে জাতপ্রথা, ধর্ম-বর্ণ-গোত্র বিভাজন নিষ্ফল। বোধের বাতায়ন রুদ্ধ থাকার কারণেই মানুষে-মানুষে বা ধর্মে-ধর্মে কলহ সৃষ্টি হয়।

বুদ্ধ বলেন, কলহে জর্জরিত মানুষ জানে না সে নিজেই যেখানে নিজের নয়, অন্যকে বশ করতে চায় কী করে? পারিবারিক, সামাজিক বা ধর্মীয়ভাবে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলেই স্বাধীন অংশগ্রহণ ও স্বতন্ত্র জীবনযাপনের অধিকার রাখে। এখানে কোনো প্রকার বৈষম্য দেখা দিলে তা বৌদ্ধধর্মের পরিপন্থি হিসেবেই গণ্য হবে।

আত্মস্বার্থ চরিতার্থ করা নয়, বরং অর্পিত দায়িত্ব নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করাই মানুষের ধর্ম। সর্বজীবের প্রতি মানবিক কর্তব্য পালনের জন্য কারো নির্দেশের অপেক্ষায় থাকা অমানবিক।

মা যেমন সকল আপদ-বিপদ থেকে নিজের সন্তানকে অপার মৈত্রীবন্ধনে রক্ষা করেন, তথাগত বুদ্ধ আমাদের সকল জীবের প্রতি সেইরূপ মৈত্রীভাব পোষণ করার শিক্ষা দিয়েছেন।
আরও পড়ুন

মা যেমন সকল আপদ-বিপদ থেকে নিজের সন্তানকে অপার মৈত্রীবন্ধনে রক্ষা করেন, তথাগত বুদ্ধ আমাদের সকল জীবের প্রতি সেইরূপ মৈত্রীভাব পোষণ করার শিক্ষা দিয়েছেন।

বাংলাদেশ মুসলিম অধ্যুষিত একটি জনবহুল দেশ। তবে ঐতিহাসিকভাবে বৌদ্ধরা কখনো ধর্মীয় উন্মাদনায় আস্থাশীল নয়; তারা জ্ঞানের মাধ্যমে জীবনযাপনে আগ্রহী। ঐতিহাসিকদের মতে, বৌদ্ধ পাল রাজাদের চারশত বছরের রাজত্বকাল ছিল বাংলার ‘স্বর্ণযুগ’।

পালদের রাজত্বকালে সকল ধর্মের সহাবস্থান সোনার মতো ঔজ্জ্বল্য ছড়াত। আমরা বুদ্ধের এই কথা ভুলি না যে কর্মই ফলদায়ী; প্রত্যেকে নিজ নিজ কর্মফল ভোগ করবে। এমতাবস্থায় আমরা বিশেষ কোনো ধর্মের বাণী বা ব্যক্তিগত মতামত কারো ওপর জোর করে চাপিয়ে দিতে পারি না। প্রত্যেকেরই মত প্রকাশের স্বাধীনতা রয়েছে। ভিন্ন ধর্ম ও পথের মানুষের সহাবস্থান সুনিশ্চিত করাই মানবিকতা।

এই দেশটিতে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান ছাড়াও নানা নৃ-তাত্ত্বিক জাতিগোষ্ঠী রয়েছে, যাদের প্রত্যেকের আলাদা সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য আছে। সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম সম্প্রদায়ের পাশাপাশি সংখ্যালঘু এসব সম্প্রদায় প্রাচীনকাল থেকেই মিলেমিশে বসবাস করে আসছে।

মসজিদ, মন্দির, বিহার ও গির্জার পাশাপাশি অবস্থান এই ভূখণ্ডের সম্প্রীতির পরিচয় দেয়। মন্দিরের শঙ্খধ্বনি কিংবা আজানের ধ্বনি কখনো অন্য ধর্মের মানুষের কাছে বিকট ঠেকেনি। বৌদ্ধদের বন্দনাগীতি কিংবা খ্রিষ্টানদের প্রার্থনা আমাদের ঐতিহ্যের অংশ।

যখন এই ঐক্যতানে ছেদ পড়ে, তখন আমরা বিপন্ন বোধ করি। আমাদের মনে রাখা উচিত, ধর্মীয় বিভক্তির চেয়ে আমাদের পূর্বপুরুষদের উত্তরাধিকার এবং সংস্কৃতির বন্ধন অনেক বেশি দৃঢ়।

আরও পড়ুন
অন্যকে দোষারোপ করে কটূ বাক্য বা দম্ভোক্তি করলে হিংসা ও সংঘাতের সৃষ্টি হয়। তাই অন্যের ছিদ্র অন্বেষণ না করে নিজের কাজ বিচার করা উচিত।

ধম্মপদে বুদ্ধের উপদেশ হলো, ‘যে কেউ সন্ত্রাসের মাধ্যমে কোনো বিরোধ মীমাংসা করলে সেটি অন্যায় হবে। জ্ঞানীরা ভালো-মন্দ শান্তভাবে বিবেচনা করেন। যিনি অহিংস উপায়ে সুন্দর পথে অন্যদের পরিচালিত করেন, তিনিই সত্য ও ন্যায়ের অভিভাবক।’ (ধম্মপদ: ২৫৬-৫৭)

মৌমাছি যেভাবে ফুলের রং ও সুগন্ধের কোনো ক্ষতি না করে মধু আহরণ করে, জ্ঞানী ব্যক্তিরাও সেভাবে অপরের অনিষ্ট না করে পারিপার্শ্বিক পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে চলেন। (ধম্মপদ: ৪৯)

এমনকি বুদ্ধ বৃক্ষরোপণ, সেতু নির্মাণ ও মানুষের বাসস্থানের ব্যবস্থা করাকে মেধা বিকাশের উপায় হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

বুদ্ধ বলেন, ‘তারা আমাকে অপমান করেছে, আহত করেছে বা ঠকিয়েছে—এই চিন্তা যারা মনে স্থান দেয়, তাদের মন থেকে কখনো বিদ্বেষ দূর হয় না। ঘৃণা দিয়ে কখনো ঘৃণা জয় করা যায় না, মৈত্রী দিয়েই কেবল ঘৃণা উপশম হয়। এটাই শাশ্বত নিয়ম।’

অন্যকে দোষারোপ করে কটূ বাক্য বা দম্ভোক্তি করলে হিংসা ও সংঘাতের সৃষ্টি হয়। তাই অন্যের ছিদ্র অন্বেষণ না করে নিজের কাজ বিচার করা উচিত।

বুদ্ধ একসময় বিত্তশালী উপালিকে বলেছিলেন (যিনি ভিন্ন ধর্মের অনুসারী ছিলেন), যেন তিনি সকল মানুষের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করেন। সারা জীবন বুদ্ধ মানুষকে ভিন্ন মত ও পথ সত্ত্বেও পারস্পরিক শ্রদ্ধা বজায় রাখার শিক্ষা দিয়েছেন।

বুদ্ধপূর্ণিমার এই মহিমান্বিত দিনে আমাদের প্রার্থনা হোক— জগতের সকল প্রাণী সুখী হোক, পৃথিবী শান্তিময় হোক।

  • ভিক্ষু সুনন্দপ্রিয়: সম্পাদক, ‘সৌগত’ এবং সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ বুদ্ধিস্ট ফেডারেশন

আরও পড়ুন