বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

পঞ্চমী, ষষ্ঠীতে যখন মায়ের চোখ ফোটাতেন কুমার কাকা, তখন সেকি আনন্দ আর উচ্ছ্বাস। পাড়াজুড়ে উৎসবের রোল। ঠাকুরকর্তা মণ্ডপের ধারে–কাছে ভিড়তে চাইলে পরিষ্কার–পরিচ্ছন্নতা নিয়ে নানা প্রশ্ন তুলতেন। আমি থাকতাম এককাট্টা। মাঝেমধ্যে সুযোগ পেলেই নিয়মের বাধা পেরিয়ে মায়ের চরণ ছুঁয়ে দিতাম। আমার কাছে মনে হতো, ধুলো কাদা গায়ে মেখে যে মাকে আমি ছুঁতে পারি, সে-ই তো আমার মা। সব ঝেড়ে আমার এই মা-ই তো আমাকে কোলে তুলে নেন। আদর করেন।

দিন গড়ায়। পাঁচ দিনের পাঁচ পর্ব সাঙ্গ হতে সময় নেয় না খুব একটা। মায়ের বাপের বাড়ি আসা আর নানান পর্ব শেষ হয়ে যায় ঝড়ের বেগে। ষষ্ঠী শেষে দিন গড়িয়ে আসে সপ্তমী। তারপরে হুট করে চলে মহাঅষ্টমী। রামকৃষ্ণ মিশনে কুমারীকে মাতৃজ্ঞানে পূজা। চলে দেশজুড়ে হইহল্লা। কিন্তু দিন তো বাকি আর দুই। মাকে আর বেশি দিন পাব এমন শক্তি বা দিব্যি কই। নবমীতে বেজে ওঠে মায়ের যাওয়ার সুর। সান্ধ্য পূজায় বাজে মায়ের বিদায়ের সুর। পরদিন সকালে দশমীবিহিত পূজায় মাকে দেওয়া হয় দর্পণ বিসর্জন। ভোর থেকেই চলে প্রস্তুতি। আনুষ্ঠানিক বিদায়ে বেজে ওঠে বিদায়ের বিউগল। মা কথা দেন, আবারও ফিরবেন সন্তানের মঙ্গল কামনায়। রাতে কাঠামো বিসর্জনে মায়ের সব উপচার সমাপ্ত হয়। এরপর শান্তিজল বিসর্জন। এ তো কেবল নিয়মনীতি। কিন্তু মা কি কেবল পাঁচ দিনের জন্য? মা কি কেবল প্রতিমাতেই থাকেন? মা কি শুধুই পূজারির অর্ঘ্য নেন?

না—তা তো নয়। মাকে আমরা দেখি সবখানে বিরাজিত। মা ধনী–গরিব সবার বাড়িতেই পুজা নেন। তা ব্রাহ্মণ কি চণ্ডালে। মা আছেন সর্বত্র। মা সবাইকে তাঁর সন্তান বলে কোলে তুলে নেন। সবার খোঁজ নেন। সবার বাড়িতেই পূজা নেন। মা যে সবার। এখানেই মায়ের সর্বজনীন প্রকাশ। আমরা ছোটবেলায় রামকৃষ্ণ মিশনে যেমন পূজা দেখেছি। তেমন বাড়ির পাশেই মেথর পট্টির পূজাতেও ছুটে গেছি। সবার মধ্যে মাকে দেখেছি তিনি অধিষ্ঠিত, বিরাজিত। তিনি ভালোবাসা আর মায়ের স্নেহসুধা বিলিয়ে দেন প্রকৃতির সব সন্তানকে, অবিরত।

হিন্দুরা মূর্তিপূজা করে, এ নিয়ে অনেকেই প্রশ্ন তোলেন। জানতে চান? জিজ্ঞাসা করেন? কিন্তু আসলে কি তাই? সনাতন ধর্মাবলম্বীরা কি কেবলই মূর্তি পূজা করেন? স্বামী বিবেকানন্দ এর উত্তর দিয়েছেন এভাবেই, ‘পুতুল পূজা করে না হিন্দু/ কাঠ মাটি দিয়ে গড়া/ মৃণ্ময়ী মাঝে চিন্ময়ী হেরি/ হয়ে যাই আত্মহারা।’

স্বামী বিবেকানন্দের এই কথাই ধ্রুব সত্য। যখনই সনাতন হিন্দুরা দেবীর সামনে পূজার নৈবেদ্য নিয়ে বসেন, তখন তা আর কাঠ মাটি দিয়ে গড়া মূর্তি থাকে না। এর মাঝে সঞ্চার হয় প্রাণের।

বইয়ের ভাষায় বললে, মূর্তি কথাটি এসেছে মূর্ত শব্দ থেকে। যার মানে প্রকাশিত হওয়া। সুতরাং যা–ই মূর্ত বা প্রকাশিত, তা–ই মূর্তি। আর প্রতিটি মূর্তিই একটি বিশেষ ভাব বা শক্তির প্রতীক।

রাবণ বধে শ্রীরামচন্দ্র অকালে দেবীকে বোধন করেছিলেন বলে প্রচলিত আছে অকালবোধন। তখন থেকেই বাঙালির ঘরে ঘরে মা পূজিত হয়ে আসছেন। কালে কালে মা যে সবার, তা বেশি মাত্রায় প্রকাশিত হচ্ছে নানান রূপে। বদলাচ্ছে পূজার প্রচলিত রীতি আচারও। দীর্ঘদিন কলকাতার সোনাগাছিতে বারবনিতাদের পাড়ায় পূজার অনুমতি ছিল না। অনেক আন্দোলন আর আইনি লড়াই শেষে এখন তারাও মায়ের পূজা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে শরৎ এলেই। পূজার উৎসবে যখন দুনিয়া মাতোয়ারা, তখন সোনাগাছির এই বারবনিতারাও শামিল হন উৎসবের সেই আলোর মিছিলে। নতুন রূপে সবার ভিড়ে নিজেদের মিলিয়ে দেন। মায়ের কাছে প্রার্থনা করেন, পূজা দেন এক সমৃদ্ধতর জীবন কামনায়।

এবার থেকে কলকাতায় মায়ের পূজাতে পূজারি হবেন তিন নারী। প্রথা ভাঙার এই দিনগুলো মাকে আরও বেশি সর্বজনীন করে তুলেছে। আরও প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে তিনি আমাদের মাঝে বিরাজিত ও বিকশিত হয়ে আছেন সর্বত্র।

কাজল ঘোষ, সাংবাদিক ও অনুষ্ঠান নির্মাতা

হিন্দু থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন